“আমার অবস্থা ভালো নয়,” সে বিড়বিড় করে বলল। তার বিশীর্ণ হয়ে যাওয়া ফুসফুস হতে একটা অদ্ভুত কর্কশ শব্দ বেরিয়ে আসছিল। যখনই সে কথা বলার চেষ্টা করছিল। রিও তাকে কথা বলতে নিষেধ করল। এবং প্রতিজ্ঞা করল যে, সে ফিরে আসবে। রুগ্ন মানুষটির ওষ্ঠ সামান্য ফাঁক হলো এবং সেখানে একটা উৎসুক মৃদুহাসি দেখা গেল। তার বুড়ো হয়ে যাওয়া মুখের ওপরে একটা অদ্ভুত কৌতুক খেলে গেল। মুহূর্তের জন্যে।“আমি যদি বেঁচে যাই, ডাক্তার, তাহলে তোমাকে সালাম।“ এক মুহূর্ত পরেই সে আবার চরম অবসাদের ভেতরে ডুবে গেল।
কয়েক ঘণ্টা পর আবার যখন তারা তাকে দেখতে এলো, তখন তারা দেখতে পেল যে, সে বিছানার ওপরে অর্ধ বসা অবস্থায় শুয়ে আছে। তার মুখের পরিবর্তন দেখে রিও আতংকিত অনুভব করল। মুখটি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছে গ্রাসকারী রোগের আগুন দিয়ে। যাইহোক, তাকে দেখে নম্র মনে হচ্ছিল। প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে সে অনুরোধ করল টেবিলের ড্রয়ার হতে তার হাতে লেখা পান্ডুলিপিটি তাকে দিতে। ত্যারু বের করে দিতেই সে সেটিকে নিজের বুকের ওপরে চেপে ধরল। তাদের দিকে না তাকিয়েই। তারপর সেটি ডাক্তারের দিকে মেলে ধরে তাকে ইশারা করল পড়ার জন্যে। সেটি ছিল প্রায় পঞ্চাশ পৃষ্ঠার একটা পান্ডুলিপি। চোখ বুলিয়ে রিও দেখল যে, পান্ডুলিপির বেশির ভাগ লেখাই সামান্য পরিবর্তন, সরলীকরন ও ব্যাখ্যা করে কেবলমাত্র একটি বাক্যকে বারবার লেখা হয়েছে।
.png)
সেটিতে অবিরত মে মাস, ঘোড়ার পিঠে সমাসীন এক যুবতী, বইস এভিন্যু- এগুলোই বিভিন্ন ধরণে বারবার ফিরে এসেছে ও পুনঃসংগঠিত হয়েছে। কিছু খুবই লম্বা ব্যাখ্যামূলক টীকার বাইরে সেখানে বেশকিছু বিকল্প বাক্যও ছিল। কিন্তু শেষ পাতার নীচের দিকে স্পষ্ট ও মনোযোগী হাতে লেখা ছিলঃ
“আমার প্রাণের জেনি, আজ হলো খ্রিস্টমাসের দিন এবং ……।” মাত্র আটটি শব্দ ছিল সেখানে। এর ওপরে গোলগোল ও বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল একটা পরিচিত বিখ্যাত বাক্য।
“পড়ো,” গ্র্যান্ড ফিসফিস করে বলল।
এবং রিও পড়লঃ
“মে মাসের এক চমৎকার সকালে, বইস এভিন্যু দিয়ে একটি শীর্ণকায়া যুবতী ঘোড়সওয়ারীকে দেখা যেতে পারত একটা পিঙ্গল রঙের ঘোড়ায় চড়ে, ফুলের মধ্যদিয়ে ……”
“আসলেই কি তাই?” গ্র্যান্ডের বৃদ্ধ কন্ঠস্বরে একটি জ্বরাক্রান্ত কাঁপুনি দেখা গেল। রিও তার দিকে তাকানো থেকে বিরত রইল।এবং গ্র্যান্ড বিছানাতে শুয়েই মাথা দোলাতে লাগল।
“হ্যা, আমি জানি। আমি জানি তুমি কী ভাবছ। ‘চমৎকার’ শব্দটা ঠিক হয়নি। তাই না?”
রিও বিছানার চাদরের নীচ দিয়ে তার আঁকড়ে ধরল।
“না, ডাক্তার। খুব দেরি হয়ে গেছে, আর সময় নেই……” ব্যাথার সাথে তার বুক ফুলে উঠল। তারপর সে হঠাৎ করে উঁচু ও তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল,” ওটা পুড়ে ফেলো!”
ডাক্তার ইতস্তত করল, কিন্তু গ্র্যান্ড খুবই বেদনা নিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে এমনভাবে তার আদেশ পুনরাবৃত্তি করল যে, রিও ফায়ারপ্লেসের কাছে গিয়ে সেটির নিভন্ত আগুনে কাগজগুলো ফেলে দিলো। সেগুলো জ্বলে উঠল, এবং সেই আগুনে সারা ঘর উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কক্ষটিও গরম হয়ে উঠল। ডাক্তার যখন বিছানার কাছে ফিরে এলো, তখন গ্র্যান্ড পিঠ ঘুরিয়ে নিলো, এবং তার মুখ প্রায় দেয়াল স্পর্শ করল। তাকে সিরাম ইনজেকশন দিয়ে সে ত্যারুকে বলল যে, রাত শেষ পর্যন্ত গ্র্যান্ড টিকবে না। ত্যারু বলল যে আজ রাতে সে তার সাথে থাকতে চায়। ডাক্তার তাকে অনুমতি দিলো থাকার।
রাতে গ্র্যান্ডের আসন্ন মৃত্যুর বিষয়টি রিওকে খুবই ভাবালো। কিন্তু পরদিন সকালে সে দেখতে পেল যে, রোগী বিছানায় বসে আছে এবং ত্যারুর সাথে কথা বলছে। তার শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক পাওয়া গেল এবং সাধারণ অবসাদ ছাড়া তার মধ্যে রোগের কোনো লক্ষণ পাওয়া গেল না।
“হ্যা, ডাক্তার,” গ্র্যান্ড বলল, “আমি খুবই তাড়াহুড়ো করছিলাম। কিন্তু আমি আবার শুরু করব। তুমি দেখবে যে, আমি প্রতিটা শব্দই মনে করতে পারি।”
রিও সন্দেহের চোখে ত্যারুর দিকে তাকালো। “আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে,” বলল সে। কিন্তু দুপুরের দিকে গ্র্যান্ডের অবস্থার কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। রাতে তাকে মনে হলো সে বিপদমুক্ত হয়ে গেছে। রিও এই ‘পুনরুজ্জীবন’ দেখে সম্পূর্ণ হতবুদ্ধি হয়ে গেল।
তার জন্যে আরও কিছু বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। প্রায় একই সময়ে হাসপাতালে একটা মেয়েকে নিয়ে আসা হয়েছিল, যাকে রিও শনাক্ত করেছিল আশাহীন হিসেবে, এবং তাৎক্ষণিকভাবে সে তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দিয়েছিল। সে প্রলাপ বকছিল এবং নিউমোনিক প্লেগের সকল লক্ষণ তার মধ্যে ছিল। পরদিন সকালে দেখা গেল তার শরীরের তাপমাত্রাও নেমে গেছে। গ্র্যান্ডের কেসের মতো ডাক্তার তার পূর্ব অভিজ্ঞতা হতে ভেবেছিল যে, এটিও একটি সকালের সাধারণ তাপমাত্রার পতন, যা মূলত একটি খারাপ লক্ষ্মণ। কিন্তু দুপুরেও তার তাপমাত্রা বাড়ল না এবং রাতে সেটি মাত্র কয়েক ডিগ্রি বাড়ল।
পরেরদিন সকালে মেয়েটির তাপমাত্রা নেমে স্বাভাবিক হয়ে গেল। যদিও ক্লান্ত, তবুও সে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছিল মুক্তভাবেই। রিও ত্যারুর কাছে মন্তব্য করল যে, মেয়েটির আরোগ্যলাভ ‘সম্পূর্ণভাবে সকল নিয়ম-কানুনের বাইরে’ হয়েছে।
কিন্তু পরের সপ্তাহে এই ধরণের আরো চারটা কেইস দেখা গেল। সপ্তাহের শেষেরদিকে রিও ও ত্যারু যখন সেই বৃদ্ধ এজমা রোগীটিকে দেখতে গেল, তখন সে উত্তেজিত হয়ে বিড়বিড় করে কথা বলছিল।
“তুমি কি বিশ্বাস করবে যে, সেগুলো আবার বেরিয়ে আসছে!” বৃদ্ধ লোকটি বলল।
“কে?”
“কেন, সেই ইঁদুরগুলো?”
এপ্রিল মাসের অর হতে শহরে কেউ জীবিত বা মৃত ইঁদুর দেখেনি।
“এর মানে কি এই যে, ওটা সব জায়গাতেই আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে?
বৃদ্ধ লোকটি তার হাত কচলাচ্ছিল।
“তোমাদের উচিৎ হবে সেগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়া, ডাক্তার! সেটাই একমাত্র চিকিৎসা!”
সে তাদেরকে জানাল যে, সে নিজ চোখে দুটো ইঁদুরকে রাস্তা হতে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখেছে। এছাড়াও কয়েকজন প্রতিবেশিও তাকে বলেছে যে, তারা তাদের বাড়ির বেজমেন্টের ভেতরে ইঁদুর দেখেছে। কোনো কোনো বাসায় লোকজন সেগুলোকে কাঠের আসবাপত্রের পেছনে আঁচড়ের খসখস শব্দ করতে শুনেছে বলে জানিয়েছে।
রিও আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করে প্রতি সোমবারে যে মৃত্যুর সংখ্যা ঘোষণা করা হয়, তা শুনল। সেগুলো আসলেই কমছিল।
চলবে....