হ্যা, প্লেগ আসলেই আত্ম-অনুসন্ধানের একটি অবকাশ তাদেরকে দিয়েছিল। এবং এরপর তারা আবার কাজে নেমে পড়েছিল।
পুরো ডিসেম্বর মাসজুড়ে শশ্মানের আগুন শহরের মানুষদের বুকে ধিকিধিকি করে জ্বলল। ক্যাম্পগুলোতে আগের মতোই জনসমাগম হতে লাগল। সংক্ষেপে, মহামারি তার বৈশিষ্টগত ঝাঁকুনি নিয়ে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চলল। কর্তৃপক্ষ আশা করেছিল যে, এই শীতে প্লেগের প্রকোপ কিছুটা হলেও থামবে। কিন্তু পুরো শীতে সেরকম কিছুই হলো না। প্লেগ একটুও থামল না। সুতরাং অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার রইল না। ফলে অনেকদিন অপেক্ষা করার পর যেমন করে কোনো মানুষ অপেক্ষা করা ছেড়ে দেয়, ঠিক তেমনিভাবে পুরো শহর বাস করতে লাগল। যেন কোনো ভবিষ্যতই নেই।
.png)
ডাক্তার রিও ও ত্যারুর মধ্যে সংক্ষিপ্ত সময়ের যে, বন্ধুত্ব হয়েছিল, সেটির কোনো চর্চাও করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব হলো না। বরং তাদেরকে আরেকটা হাসপাতাল খুলতে হলো। সেখানে রিও’র কেবলমাত্র রোগীদের সাথেই আলাপচারিতা সীমাবদ্ধ হয়ে রইল।
যাই হোক, এই পর্যায়ে রিও মহামারির প্রকারে একটা পরিবর্তন লক্ষ করল। প্লেগ উত্তরোত্তরভাবে নিউমোনিক প্লেগে রূপ নিতে শুরু করল। তবে রিও’র কাছে মনে হলো রোগীরা তার সাথে আগের চেয়ে বেশি সহযোগিতা করছে। আগের সময়ের মতো তারা হতাশা ও উন্মত্ততা প্রদর্শন করছে না। পরিবর্তে মনে হলো তারা নিজেদের স্বার্থের বিষয়ে অধিকতর পরিষ্কার সচেতনতা অর্জন করেছে। এবং নিজ উদ্যোগেই তারা নিজেদের জন্যে যা বেশি উপকারী হবে, সেই জিনিসগুলো চাইতে লাগল। সব সময়েই চিৎকার করে তারা তাদেরকে পানীয় সরবরাহ করার অনুরোধ করতে লাগল, যাতে তাদের শরীর গরম থাকে। যদিও রিও’র ওপরে এই চাহিদাগুলো আগের মতোই চাপ সৃষ্টি করছিল, তবুও রিও’র এবারে মনে হলো যে, তার একাকী যুদ্ধের সাথে রোগীরা এখন তাকে সহযোগিতা করছে।
ডিসেম্বর মাসের শেষেরদিকে রিও মিঃ ওথোনের কাছ থেকে একটা চিঠি পেল। তিনি তখনো কোয়ারেনটাইনে ছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট তার চিঠিতে লিখেছেন যে, তার কোয়ারেনটাইনের সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু অফিস ক্যাম্পে তার ভর্তির তারিখ ভুল লিপিবদ্ধ করায় তাকে এখনো ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি আরো লিখেছেন যে, তার স্ত্রী যিনি সম্প্রতি কোয়ারেনটাইন থেকে ছাড়া পেয়ে নগর কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছিলেন বিষয়টির প্রতিবাদ জানানোর জন্যে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তারা তার সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেছে, এবং বলেছে যে, অফিস কখনোই ভুল করেনি। রিও র্যাম্বার্টকে বলল বিষয়টা দেখার জন্যে।
কয়েকদিন পর মিঃ ওথোন রিও’র সাথে দেখা করতে আসলেন। রিও দেখল যে, আসলেই ক্যাম্পে মিঃ ওথোনের ভর্তির তারিখ ভুল লেখা হয়েছিল। এ বিষয়ে রিও কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করতেই মিঃ ওথোন (যিনি শারিরীকভাবে যথেষ্টই শুকিয়ে গিয়েছিলেন) তার খোঁড়া ও দুর্বল হাত তুলে বিনয়ের সাথে জানালেন যে, এরকম ভুল যে কেউই করতে পারে। মিঃ ওথোনের এই আচরণ রিও’কে যথেষ্টই অবাক করল। মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করল কী এমন বিষয়, যা মিঃ ওথোনের মধ্যে এমন বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে?
“আপনি এখন কী করবেন, মিঃ ওথোন?” রিও জিগ্যেস করল। “আমার তো মনে হয় যে, আপনার অনেক কাজ জমে আছে।”
“আসলে আমি ছুটির জন্যে দরখাস্ত করছি।”
“আমি বুঝতে পেরেছি। আসলেই আপনার একটা অবসর দরকার।”
“ব্যাপারটা সেরকম নয়। আমি ক্যাম্পে আবার ফিরে যেতে চাই।”
“রিও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। “কিন্তু আপনি তো মাত্র সেটি হতে বেরিয়ে আসলেন!”
“সম্ভবত আমি তোমাকে বোঝাতে পারিনি। আমাকে বলা হয়েছে যে, আমার সেই ক্যাম্পে সরকারী অফিস থেকে কিছুসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছে।“ম্যাজিস্ট্রেট তার গোল চোখকে একটু ঘুরালেন এবং মাথার চুলের গুচ্ছকে হাত দিয়ে মসৃণ করার চেষ্টা করলেন। “দেখো, আমি নিশ্চিত যে, এই কাজ আমাকে ব্যস্ত রাখবে। এছাড়া যদিও শুনতে অদ্ভুত লাগবে তোমার, তবুও আমি মনে করি যে, এই কাজটির মধ্যদিয়ে আমি আমার ছোট্ট ছেলের সাথে আমি কম আলাদা হবো।”
রিও অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মিঃ ওথোনের কঠিন ও ভাবলেশহীন চোখে আজ সে কেমন ধরণের কোমলতা দেখতে পাচ্ছে? সে দেখতে পেল সেগুলো কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আছে, এবং আগের সেই ইস্পাত-কঠিন উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলেছে।
“অবশ্যই,” রিও বলল, “যেহেতু এটাই আপনার ইচ্ছা, সেহেতু আমি আপনার জন্যে ব্যবস্থা করে দেবো।”
ডাক্তার রিও তার কথা রেখেছিল।
প্লেগ আক্রান্ত শহরের জীবন এভাবেই খ্রিস্টমাস পর্যন্ত এগিয়ে গেল। ত্যারু চেষ্টা করল তাদের কাজের প্রতিটা সমস্যার জায়গাগুলোতে দক্ষতা নিয়ে আসার। র্যাম্বার্ট দুই যুবক প্রহরীদের সাথে যোগসাজস করে তার স্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠালো এবং সেগুলোর একটা উত্তরও পেল। ডাক্তারকে সে বলল যে, সেও চাইলে তার মতো এই গোপন পথ অনুসরণ করে তার স্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠাতে পারে। রিও তার কথায় রাজী হলো। এবং অনেক মাসের মধ্যে প্রথমবার সে স্ত্রীকে চিঠি লিখতে বসল। লিখতে গিয়ে অনুভব করল যে, চিঠি লেখা আসলেই একটি শ্রমসাধ্য কাজ হয়ে গেছে। মনে হলো সে ভাষাকে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করা ভুলে গেছে। তবুও চিঠিটাকে সে স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দিলো।
চলবে....