দ্য প্লেগ (পর্ব ৪৬)
সত্যিকার অর্থে সেটিই ছিল আমার জীবনের শুরু। জীবনে সেই প্রথম আমি দরিদ্রতার সংস্পর্শে এসেছিলাম। আঠারো বছর বয়সে। এর আগে আমার জীবন যথেষ্টই সহজ ছিল। সুতরাং আমি সব ধরনের কাজই চেষ্টা করেছিলাম, এবং কোনোটাতেই আমি খুব খারাপ করিনি। কিন্তু আমার জীবনের সত্যিকারের আগ্রহ ছিল মৃত্যু দণ্ডাদেশ বিষয়ে। আমি কাঠগড়ার মধ্যের সেই অন্ধ প্যাঁচার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চাইতাম।
সুতরাং লোকজন বলত যে, আমি একজন আন্দোলনকারী; তবে আমি অন্যদের মতো সংক্রামক নই, এই যা। আমার ধারণায় আমার চারপাশের সামাজিক আদেশ গড়ে উঠেছিল মৃত্যুদণ্ডকে কেন্দ্র করে এবং এই প্রতিষ্ঠিত আদেশকে ঠিক করার প্রচেষ্টার মধ্যদিয়ে আমি মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়তে চাইতাম। অন্যদের মতেও এটাই ছিল আমার দৃষ্টিভঙ্গি।আমিও মনে করতাম যে আমার এই বিশ্বাস আসলেই সত্য ছিল। আমি একদল মানুষের সাথে যোগ দিয়েছিলাম, যাদেরকে আমি পছন্দ করতাম। তাদের সাথে আমি অনেক বছর নিবিড় সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলাম, এবং ইউরোপের এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে আমি ভূমিকা রাখিনি। কিন্তু সেটা হলো অন্য গল্প।
“বলার প্রয়োজন পড়ে না যে, কিছু কিছু সময়ে আমরাও মৃত্যুদন্ডাদেশ দিতাম। তবে আমাকে বলা হতো যে, এই মৃত্যুগুলো অত্যাবশ্যকীয় ছিল একটা নতুন পৃথিবী গড়ার জন্যে, যেখানে হত্যা বলে কিছুই থাকবে না। এটা হয়তো আসলেই সত্য ছিল একটা নির্দিষ্ট বিন্দু পর্যন্ত, তবে আমি এই বিশ্বাসে অবিচলিত থাকতে পারতাম না।”
.png)
ব্যাখ্যা যাই দেওয়া হোক না কেন, আমি ইতস্তত করতাম। কাঠগড়ার ভেতরের সেই বিধ্বস্ত প্যাঁচার মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত এবং অন্যকিছুকে ছাপিয়ে সেটাই আমার সত্তাকে জাগিয়ে রাখত। একদিন হাঙ্গেরীতে একটা মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকরী করার সময়ে আমি উপস্থিত ছিলাম। সেদিন আমি আবার আমার শৈশবের সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম।
“তুমি কি কখনো কোনো মানূষকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করতে দেখেছ? আমি নিশ্চিত যে, তুমি দেখো নাই। সেখানে নির্দিষ্ট সংখ্যক নির্বাচিত দর্শক থাকে। অনুষ্ঠানটি হয়ে থাকে কোনো ব্যক্তিগত পার্টির মতো, যেখানে তোমাকে আমন্ত্রিত হতে হয়। তুমি হয়ত বই ও ছবি হতে এ সম্পর্কে কিছু ধারণা পেয়ে থাকবে যে, সেখানে একটা ফায়ারিং পোস্ট, একজন চোখবাঁধা মানুষ এবং কয়েকজন সৈনিক থাকে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই সেরকম নয়। তুমি কি জানো যে, ফায়ারিং স্কোয়াড দন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত মানুষ থেকে মাত্র দেড় গজ দূরে থাকে? তুমি কি জানো, আসামী যদি দুই’পা এগোয়, তাহলে তার বুক রাইফেল স্পর্শ করবে? তুমি কি জানো যে, সেই সল্প দূরত্ব থেকে সৈনিকেরা তার বুকের ওপরে তাক করে এবং গুলিগুলো বুকের ভেতরে একটা গর্ত করে বেরিয়ে যায়, যেটার মধ্যে তুমি তোমার হাতের মুঠি পর্যন্ত ঢোকাতে পারো? না, এগুলোর কিছুই তুমি জানো না। কারণ, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে কখনোই বলা হয় না।”
সেই ঘটনার পর থেকে আমি কখনোই ভালো ঘুমাতে পারতাম না। একটা বিস্বাদ সারাক্ষণ আমার মুখে লেগে থাকত। এবং আমি সেগুলোর খুঁটিনাটি নিয়ে লম্বা সময় ধরে গভীরভাবে চিন্তা করতাম।
“এবং এভাবেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, সেই দীর্ঘ বছরগুলোতে আমি প্লেগে আক্রান্ত হয়েছিলাম, এবং আমার আত্মা আপাত বৈপরীত্য নিয়ে সেই প্লেগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর পেছনে আমার পরোক্ষ হাত ছিল, এমনকি আমি তাদের মৃত্যুকে ডেকে এনেছিলাম মৃত্যদন্ডাদেশের নিয়ম ও কার্যবিধি অনুমোদন করে। তবে এই ধরণের চিন্তা নিয়ে আমার সঙ্গীরা বিব্রত হতো বলে আমার মনে হয়নি। অন্তত আমি তাদের কাউকেই দেখিনি এবিষয়ে কোনো কথা বলতে।”
কিন্তু আমি ছিলাম অন্যধরণের। কষ্টে আমার কণ্ঠনালী রোধ হয়ে আসত। ফলে সবার সাথে থেকেও আমি ছিলাম একাকী। আমি যখন তাদের সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতাম, তখন তারা আমাকে খুঁতখুঁতে হতে নিষেধ করত। বলত যে, আমার মনে রাখা উচিৎ তারা বড় বিষয় নিয়ে কাজ করছে। ক্ষুদ্র বিষয়ে তাদের মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই। এমনকি তারা যখন তাদের যুক্তিগুলো উপস্থাপন করত, সেগুলো প্রায়ই আকর্ষনীয় হতো। তবে হজম করার জন্যে আমি সেগুলোকে আমার পাকস্থলীতে নিতে পারতাম না।
আমি তাদেরকে বলতাম যে, লাল পোশাক পরা অসুস্থ প্লেগ রোগীও নিজের কাজের সপক্ষে অসাধারণ যুক্তি দাঁড় করাতে পারে। একবার আমি তাদেরকে বলেছিলাম যে, দরকার ও পরিস্থিতির সাপেক্ষে কম প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে আমরা বাদ দিতে পারি, তবে কখনোই জীবনের মতো দরকারী জিনিসকে নয়। তখন তারা আমাকে বলত যে, ধর্মযাজকরাও মনে করেন যে, দোষীদেরকে একচেটিয়াভাবে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া উচিৎ। আমার তখন মনে হতো যে, পৃথিবী জুড়ে একটা প্রতিযোগিতা চলছে কে সবচেয়ে বেশি হত্যা করতে পারে। সবাই পাগল হয়ে আছে খুন করার জন্যে এবং চাইলেও তারা তা বন্ধ করতে সক্ষম নয়।
তবে কোনো ক্ষেত্রেই আমি বিতর্ক বা যুক্তি নিয়ে চিন্তিত থাকতাম না। আমি চিন্তিত থাকতাম সেই হতভাগা প্যাঁচাকে নিয়ে, যাকে একটা জঘন্য পদ্ধতি অনুসরন করে শৃঙ্খলিত করে বলা হয়েছিল যে, তাকে মরতে হবে। তারপর রাতের পর রাত তাকে মানসিক অত্যাচার করা হয়েছিল, যখন সে নিশ্চিত মৃত্যুর অপেক্ষা করছিল এবং অবশেষে ঠান্ডা মাথায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। আমি চিন্তিত থাকতাম তার বুকের সেই গর্ত নিয়ে। নিজেকে বলতাম যে, পৃথিবীর কোনো যুক্তিই আমাকে এমন নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডকে যথাযথ বলে মেনে নিতে বাধ্য করতে পারবে না। হ্যা, নিজ থেকেই আমি ক্রমশ জেদী ও একগুঁয়ে রূপ ধারণ করেছিলাম। কারণ, আমি আমার চলার পথকে আরো পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম।
“আমি এখনো একইরকম চিন্তা করি। বহু বছর ধরে একজন হত্যাকারী হবার লজ্জায় আমি লজ্জিত হয়ে আছি। সময় পার হবার সাথে সাথে আমি শিখেছি যে, আমাদের মধ্যে যারা অন্যদের চেয়ে ভালো ছিল, তারাও এখন আর হত্যা করা বা অন্যদেরকে হত্যা করতে দেওয়া ছাড়া চলতে পারে না। কারণ, যে যুক্তি দ্বারা তারা পরিচালিত হয়, তার মধ্যদিয়ে তারা অন্যদের মৃত্যু ছাড়া পৃথিবীতে চলাচল করতে পারে না। হ্যা, আমি সেই দিন থেকেই লজ্জিত হয়েছিলাম, যেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমরা সবাই প্লেগে আক্রান্ত। সেদিন হতেই আমার সকল শান্তি হারিয়ে গিয়েছিল।”
“আমি এখনো সেই শান্তি খুঁজে ফিরছি। এখনো আমি অন্যদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, আমি কারুরই শত্রু হতে চাই না। আমি শুধু চাই সবাই প্লেগমুক্ত হোক। আমার মতে সেটিই একমাত্র পথ, যার মাধ্যমে আমরা শান্তি অর্জন করতে পারব। এমনকি এটা করতে গিয়ে আমরা যদি ব্যর্থও হই, তবুও আমরা একটা মানবিক মৃত্যুকে বরণ করতে সক্ষম হব। শুধুমাত্র এটাই আমাদেরকে না বাঁচাতে পারলেও মুক্তির পথ দেখাতে পারবে। এটাই তাদের ক্ষতি কমাতে পারবে। এমনকি আমাদের জন্যে কিছুটা হলেও মঙ্গলও বয়ে আনতে পারবে। সুতরাং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি এমন কিছুই করব না, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কারো জন্যে মৃত্যু বয়ে আনে, অথবা অন্যদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়াকে যুক্তিসঙ্গতা দেয়।”
“একারণেই মহামারি আমাকে নতুন কিছু না শিখালেও অন্তত একটা জিনিস শিখিয়েছে। তা হলো আমাকে যুদ্ধ করতে হবে তোমার পক্ষ হয়ে। আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে, এই পৃথিবীর সবাই প্লেগে আক্রান্ত। কেউই এর থেকে মুক্ত নয়। এবং আমি এটাও জানি যে, আমাদেরকে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনো অসতর্ক মুহূর্তে অন্যদের মুখে নিঃশ্বাস ফেলে আমরা অন্যদের সংক্রমনের কারণ না হই। এভাবেই জীবানুরা ছড়িয়ে পড়ে। এর বাইরে স্বাস্থ্য, সততা, পবিত্রতা- কখনোই এগুলো হতে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। একজন মানুষ যে কাউকেই সংক্রামিত করে না, সেই হলো মনোযোগী মানুষ। এমন মানুষ হবার জন্যে প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি ও সার্বক্ষণিক চিন্তার প্রয়োজন হয়।”
হ্যা রিও, প্লেগ রোগী হওয়া খুবই ক্লান্তিকর বিষয়। কিন্তু তার চেয়েও ক্লান্তিকর হলো সেটিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করা। একারণেই পৃথিবীর সবাইকে আজ খুব ক্লান্ত দেখায়, যারা সবাই কোনো না কোনোভাবে প্লেগে আক্রান্ত। একারণেই আমাদের মধ্যে কেউ কেউ চায় যে, পৃথিবী হতে প্লেগ চিরতরে নির্বাসিত হোক। এটা তাদের এমন এক চরম উদ্বিগ্নতা, যা থেকে মুক্তি মৃত্যু ছাড়া সম্ভব নয়।
চলবে....