ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]
মূলঃ আলবেয়ার কামু ( উপন্যাস - দ্য প্লেগ)

দ্য প্লেগ (পর্ব ৪৭)

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ 
প্রকাশিত: ০৯:১১, ১৩ অক্টোবর ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৪৭)
ছবিঃ অন্তর্জাল (শিল্পীর তুলিতে জ্যাঁ ত্যারু)

“আমি জানি যে, পৃথিবীর মানুষদের মধ্যে আমার কোনো জায়গা নেই। কারণ, অন্য সবার বিপক্ষে গিয়ে হত্যাকে অস্বীকার করে আমি স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছি। আমার এই নির্বাসন অন্তহীন। কাজেই আমি চাই যে, আমার বদলে অন্যকেউ প্রতিরোধ গড়ে তুলুক; নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করুক। আমি এটাও জানি যে, অন্যদের কাজের ওপরে মন্তব্য করার যোগ্যতা আমার নেই। আমার মানসিক গঠনেই অন্তর্গত কিছু ঘাটতি আছে, যা আমাকে যৌক্তিক খুনি হওয়া থেকে বিরত রাখে। আমি বুঝতে পারি যে, এটা আমার সীমাবদ্ধতা, কখনোই শ্রেষ্ঠত্ব নয়। তবে কখনোই আমি অন্যভাবে বাঁচতে চাই না। আমি যেমন ছিলাম, তেমনই থাকতে চাই। বাঁচতে চাই নিজের অর্জিত একান্ত শিষ্ঠতা নিয়ে।’’

আমি মনে করি যে, এই পৃথিবীতে মহামারি ও মহামারির শিকার দুটোই আছে, এবং যতটুকু সম্ভব, আমাদের উচিৎ নয় মহামারির পক্ষের শক্তির সাথে যোগ দেওয়া। এটাকে ছেলেমিপনার মতো সরলতা বলেও মনে হতে পারে, কিন্তু আমি জানি এটাই সত্যি। এই ধরণের এতো যুক্তি আমি শুনেছি যে, মাঝেমধ্যেই নিজেকে আমার পাগল বলে মনে হতো। একই যুক্তি অন্যদের মাথাও এতোটাই ঘুরিয়ে দিয়েছিল যে, তারা হত্যাকে অনুমোদন দিয়েছিল। এটা থেকে আমি বুঝতে শিখেছিলাম যে, আমাদের সমস্যাগুলোর সৃষ্টি মূলত সহজ ও স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করার ব্যর্থতা থেকে। সুতরাং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম স্পষ্টভাবে কথা বলতে ও কাজ করতে। কারণ, এটাই একমাত্র পথ নিজেকে সঠিক পথে রাখার। একারণেই আমি বলে থাকি যে, পৃথিবীতে কেবল মহামারি ও মহামারির শিকার -এই দুটোই আছে; এগুলোর বাইরে আর কিছুই নেই। এই বিবৃতি দেওয়ার মধ্যদিয়ে আমি যদি প্লেগের জীবানুর বাহকও হই, তাহলেও আমি মনে করি যে, আমার দোষ   ইচ্ছাকৃত নয়। আমি চেষ্টা করেছি একজন নির্দোষ খুনি হতে। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে, আমার নিজের কোনো উচ্চাশা নেই। আমি মনে করি যে, মানুষের মধ্যে আরেকটি শ্রেণির মানুষ থাকা উচিৎ, যাদের নাম হবে ‘আসল আরোগ্যকারী’। কিন্তু যেহেতু এই ধরণের মানুষের সংখ্যা বেশি নয় এবং তাদেরকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, সেহেতু প্রতিটা দুর্দশার সময়েই অন্তত কিছু মানুষ থাকা উচিৎ যারা সব সময়ে ভুক্তভোগীদের পক্ষে থাকবে, যাতে সার্বিক ক্ষতির পরিমান কম হয়। এদের মধ্য হতেই আমরা আবিষ্কার করার চেষ্টা করতে পারি সেই তৃতীয় ধরণের মানুষদেরকে খুঁজে পেতে, যারা  পৃথিবীর বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। 

কথা শেষ করার পর ত্যারু পা নাড়াচ্ছিল এবং হালকাভাবে গোড়ালি দিয়ে উঠোনের ওপরে আঘাত করছিল। একটা ছোট নীরবতার পর ডাক্তার চেয়ারে বসে থাকা অবস্থাতেই নিজেকে একটু উঁচু করল এবং ত্যারুকে জিগ্যেস করল যে, শান্তি অর্জনের জন্যে কোনো পথ সম্পর্কে তার ধারণা আছে কিনা।

Advertisement

“হ্যা, আছে,” ত্যারু উত্তর করল। “সেটি হলো সহানূভূতির পথ।’’

এই সময়ে দূরে দুটো এম্বুলেন্সের শব্দ শোনা গেল। এতক্ষণ তারা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত যে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনছিল, সেটি শহরের সীমানায় এসে একত্রিত হলো। সেই পাথরের পাহাড়ের কাছে। এর পরমুহূর্তেই বন্দুকের গুলির মতো শব্দ শোনা গেল। তারপর আবার নীরবতা নেমে এলো।

রিও বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকা দুটো আলোর ঝলকানি দেখতে পেল। বাতাস সতেজ হয়ে উঠল এবং সাগর থেকে আসা বাতাসের দমকা হাওয়া লবনের গন্ধে ভরে গেল।

একই সময়ে তারা পাহাড়ের পাদদেশে বাতাসের ঢেঊয়ের ধাক্কার মৃদু শব্দ শুনতে পেল।

ত্যারু হঠাৎ করে বলল,” মাঝে মধ্যে আমার মনে হয় আমি সন্ন্যাসী হয়ে যাই।’’

“কিন্তু তুমি তো ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না।’’

“তাই তো! ঈশ্বরে বিশ্বাস ছাড়া কি সন্ন্যাসী হওয়া যায়? এটাই তাহলে আসল সমস্যা। আজকের দিনের একমাত্র সমস্যা।’’

যে জায়গাটি থেকে চিৎকারের শব্দ ভেসে আসছিল, সেখানে একটা আলোর ঝলকানি দেখা গেল। পরমুহূর্তেই বায়ুপ্রবাহের সাথে অনেকগুলো কন্ঠের ধ্বনি ভেসে এলো।তার মুহূর্ত পরেই সেই আলোর ঝলকানি নিভে গেল। রয়ে গেল শুধু একটা নিস্তেজ আভা। এর একটু পরেই তারা চিৎকারের উচ্চ শব্দ ও বন্দুকের গুলির শব্দ শুনতে পেল। সাথে ভেসে আসলো অনেক উত্তেজিত জনতার গর্জন। ত্যারু দাঁড়িয়ে শোনার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুই বোঝা গেল না। 

“মনে হচ্ছে ফটকের কাছে আরেকটি মারামারি হচ্ছে।’’

“যাই হোক, ওটা এখন শেষ হয়ে গেছে,’’ রিও বলল। 

ত্যারু নিচু স্বরে বলল যে, ওটা আদৌ শেষ হয়ে যায়নি। এরপর আরো লোকজন ভোগান্তির শিকার হবে। কারণ এভাবেই এই ধরণের ঘটনার সূত্রপাত হয়ে থাকে।

“সম্ভবত তুমিই ঠিক,” ডাক্তার উত্তর দিলো। “কিন্তু তুমি তো জানো যে, আমি সন্ন্যাসীদের চেয়ে পরাজিতদের সাহচর্য অনুভব করি। বীরত্ব ও পবিত্রতা আমার মধ্যে তেমন কোনো আকর্ষণের সৃষ্টি করে না। মানুষ হবার বিষয়েই আমার আগ্রহ বেশি।

“হ্যা, আমরা দুজনেই একই ধরণের, তবে আমি তোমার চেয়ে কম উচ্চাভিলাষী।’’

রিও ভাবল ত্যারু তার সাথে কৌতুক করছে। মৃদু হেসে সে তারদিকে ফিরল। কিন্তু আকাশ থেকে পড়া আবছায়া আলোতে সে দেখতে পেল যে, তারুর মুখ বিষন্ন ও উৎসুক হয়ে আছে। পরমুহূর্তেই আরেকটা দমকা বাতাস বয়ে গেলে রিও তার পিঠের ওপরে তার উষ্ণতা অনুভব করল। ত্যারুও নিজের শরীরকে মৃদু নাড়া দিলো।        

চলবে....

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
ট্যাগ: দ্য প্লেগ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!