ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

দ্য প্লেগ (পর্ব ৫৬)

মূলঃ আলবেয়ার কামু (উপন্যাস - দ্য প্লেগ)
অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১১:১৮, ৩০ অক্টোবর ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৫৬)
ছবিঃ অন্তর্জাল

জানুয়ারির প্রথম তিন সপ্তাহে কটার্ডের মেজাজের হঠাৎ এই পরিবর্তন সবাইকে অবাক করল। যদিও প্রতিবেশী ও পরিচিতদের কাছে প্রিয় হবার বিষয়ে তার চেষ্টার অন্ত ছিল না, কিন্তু এই সময় থেকে সারাদিনমান সে সবার সাথে ইচ্ছাকৃতভাবে নিরুত্তাপ আচরণ করতে লাগল। ত্যারু আবিষ্কার করল যে, বাইরের লোকজনের সাথে সে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে এবং এক ধরনের অনুশোচনাবোধ নিয়ে নিজের ঘরেই অবস্থান করছে। তাকে আর রেস্টুরেন্ট, থিয়েটার অথবা তার প্রিয় ক্যাফেগুলোতে দেখা গেল না। তবে প্লেগের আগের সেই নীরস গতানুগতিক জীবনযাপন করছিল না। রুমে অবস্থান করলেও পার্শ্ববর্তী রেস্টুরেন্ট থেকে তার জন্যে খাবার আসতে লাগল।

শুধুমাত্র রাতেই ছোটখাট কিছু কেনার জন্যে সে বাইরে যেত এবং কেনাকাটার পর তাকে দেখা যেত চোরের মতো অন্ধকার জায়গা ও নির্জন রাস্তাগুলোতে হাঁটতে। দুই-একবার ত্যারু তার দেখা পেয়েছিল। কিন্তু তার মুখ থেকে গালির মতো একস্বরা কিছু শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায়নি। অবশ্য এরপর আস্তে আস্তে সে আবার সামাজিক হয়ে উঠেছিল। নিজ থেকে প্লেগ নিয়ে কথা বলা শুরু করেছিল। সবার কাছ থেকে এটি সম্পর্কে তাদের মতামত জানতে চাইছিল এবং আনন্দিতভাবে লোকজনের ভিড়ে গিয়ে মিশছিল।

Advertisement

২৫ জানুয়ারি তারিখে, যেদিন প্লেগ সম্পর্কে সরকারি ঘোষণা দেওয়া হলো, সেদিন কটার্ড আবার আড়ালে চলে গেল। দুইদিন পর ত্যারু তাকে দেখতে পেল একটা পার্শ্ব রাস্তায় চলাফেরা করতে। কটার্ড ত্যারুকে তার বাড়ি পর্যন্ত তার সাথে যাবার জন্যে অনুরোধ করল। কিন্তু ত্যারু বিনয়ের সাথে যেতে অস্বীকার করল। কারণ, দিনটি ছিল তার জন্যে খুবই ক্লান্তিকর। কিন্তু কটার্ড মানতে চাইল না। মনে হচ্ছিল সে খুবই  উত্তেজিত হয়ে আছে, মুক্তভাবে অঙ্গভঙ্গি করছে এবং উচ্চস্বরে দ্রুত কথা বলছে। সে ত্যারুকে জিগ্যেস করা শুরু করল যে, সরকারি ঘোষণার অর্থ আসলেই প্লেগের সমাপ্তি কিনা। ত্যারু তাকে বলল যে, শুধু সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে প্লেগকে থামানো সম্ভব নয়, তবে তার কাছে নিশ্চিতভাবে মনে হচ্ছে যে, কোনোরকম দুর্ঘটনা না ঘটলে এটা দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে।

“হ্যা,” কটার্ড বলল। “দুর্ঘটনা না ঘটলে। দুর্ঘটনা তো ঘটতেই পারে, তাই না?” 
ত্যারু তাকে ব্যাখ্যা করল যে, একারণেই কর্তৃপক্ষ আরও পনেরদিনের আগে শহরের ফটক না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 
‘হ্যা, তারা আসলেই খুব জ্ঞানী!” কটার্ড আগের মতো উত্তেজিত স্বরেই বলল। “তবে ঘটনা যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে মনে হয় না যে,তারা তাদের মুখরক্ষা করতে পারবে।“
ত্যারু বলল যে, সেটাও সম্ভব হতে পারে, তবুও সে নিজে  ভাবে যে, ফটক খুলে দেওয়াই অধিকতর যুক্তিযুক্ত হবে এবং এর মধ্যদিয়ে অদূর ভবিষ্যতে মানুষজন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবে।“
“ঠিক আছে!” কটার্ড উত্তর করল। “কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া বলতে তুমি কী বোঝাতে চাইছ?”
ত্যারু মৃদু হাসল। “সিনেমাহলগুলোতে নতুন ছবি।“

কিন্তু কটার্ড হাসলো না। সে জিগ্যেস করল যে, এমনকি হতে পারে না যে, প্লেগ শেষ হবে না এবং শহরের মানুষেরা আগের মতোই চলতে থাকবে, ঠিক যেন কখনোই কিছু ঘটেনি? ত্যারু ভাবল যে, প্লেগ হয়ত অনেককিছুই বদলে দেবে, কিন্তু মানুষদেরকে বদলাতে পারবে না, এবং তাদের সবচেয়ে সবচেয়ে বড় আকাঙ্খা এটাই। তারা চায় যে, তারা এমনভাবে আচরণ করবে, যেন কিছুই বদলায়নি এবং বদলাবেও না। তবে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তারা  সবকিছু ভুলতেও পারবে না, যতই ইচ্ছা পোষণ করুক না কেন। তার মতে প্লেগ অবশ্যই শহরের মানুষদের মনে গভীর  ছাপ রেখে যাবে।
কটার্ড কাঠখোট্টাভাবে উত্তর দিলো যে, মানুষের মন  বিষয়ে সে আগ্রহী নয়। সত্যি বলতে কী এটাই হলো সর্বশেষ জিনিস যা নিয়ে সে চিন্তা করে থাকে। যে বিষয়ে সে সত্যিই আগ্রহী তা হলো যে পুরো প্রশাসন যাতে বদলে না যায়, ফটক বন্ধ রাখা, খাদ্য ও তেল মজুত করা, পাবলিক সার্ভিস সবকিছুই যাতে আগের মতো থাকে।

ত্যারু স্বীকার করল যে, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কে সে জানে না, তবে ব্যক্তিগতভাবে সে মনে করে যে, সার্ভিসগুলো চালাতে কিছুটা দেরী হতে পারে। এমনও হতে পারে যে, নতুন সমস্যার উদ্ভব হবে এবং এগুলোকে ঠিকঠাক করতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতে  কিছু পুনর্গঠন  দরকারি হতে পারে। কটার্ড মাথা নাড়ল। “হ্যা, এটা সম্ভব। আসলে সবাইকে তো আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করতে হবে।“

তারা কটার্ডের বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়ল। এই সময়ে  তাকে দেখতে আরও উৎফুল্ল মনে হচ্ছিল। ভবিষ্যতকে সে আনন্দময় দেখার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ  ছিল। স্পষ্টতই সে কল্পনা করছিল যে, শহর একটা অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে সবার অতীত মুছে যাবে এবং তারা পরিষ্কার কাগজের মতো আবার নতুন জীবন শুরু করবে। 

চলবে....
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেডআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!