ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

দ্য প্লেগ (পর্ব ৫৫)

মূলঃ আলবেয়ার কামু (উপন্যাস- দ্য প্লেগ)
অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ 
প্রকাশিত: ০৯:৫৫, ২৯ অক্টোবর ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৫৫)
ছবিঃ অন্তর্জাল, প্রতীকী (শিল্পীর চোখে কটার্ড)

সেই সময়গুলোতে যখন প্লেগকে মনে হচ্ছিল পিছু হটে তার অস্পষ্ট গুহাতে ফিরে যাচ্ছিল, যেখান থেকে সে চুপি চুপি এসেছিল, তখন শহরে অন্তত একজন মানুষ ছিল, যার দৃষ্টিতে এই পিছু হটা ছিল আতঙ্কের। ত্যারুর নোটকে আমরা যদি বিশ্বাস করি, তাহলে এই মানুষটি ছিল কটার্ড।

সত্য বলতে গেলে, ত্যারুর ডায়রির নোটগুলোতে একটা অদ্ভুত ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, যেদিন হতে মৃত্যুর সংখ্যা  কমতে শুরু করেছিল। এই সময়ে তার হাতের লেখা বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। সম্ভবত তার ক্লান্তির কারণে। এবং সে কোনোরূপ বিরতি না দিয়ে এক বিষয় হতে অন্য বিষয়ে লাফিয়ে যাচ্ছিল। আরও উল্লেখ্য হলো, এই নোটগুলোর বস্তুনিষ্ঠতা আগেরগুলোর চেয়ে কম ছিল এবং এগুলোতে তার ব্যক্তিগত বিবেচনা ঢুকে যাচ্ছিল।

সুতরাং কটার্ডকে নিয়ে তার দীর্ঘ বর্ণনার মাঝে মাঝে আমরা সেই বৃদ্ধ লোক ও বিড়ালের প্রসঙ্গের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা খুঁজে পাই। ত্যারুর নোট থেকে আমরা জানতে পারি যে, প্লেগের কারণে বৃদ্ধ লোকটির প্রতি তার মুগ্ধতা কখনোই কমেনি, এমনকি প্লেগ চলমান থাকার সময়েও নয়। দুর্ভাগ্যক্রমে যদিও বৃদ্ধটির সাথে দেখা হওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার, কিন্তু এতে তার ইচ্ছার কমতি ছিল না।

Advertisement

সে সর্বোতভাবে চেষ্টা করেছিল তার দেখা পাওয়ার জন্যে। স্মৃতিময় ২৫ জানুয়ারি তারিখের কয়েকদিন পর সে সেই ছোট্ট রাস্তাটির কোণে অবস্থান নিলো। দেখতে পেল যে, বিড়ালগুলো তাদের আগের জায়গায় ফিরে এসেছে, এবং রোদ পোহাচ্ছে।  কিন্তু ধর্মীয় আচারনুষ্ঠানের কারণে সেই  দরজার কপাটগুলো বন্ধ থাকায় এবং বৃদ্ধ লোকটিকে দেখতে না পাওয়ায় সে উপসংহারে আসলো যে, বৃদ্ধ লোকটি বিরক্ত হয়ে অন্যকোথাও চলে গেছে অথবা মরে গেছে। যদি সে বিরক্ত হয়ে থাকে, তাহলে তার অর্থ  হলো যে, প্লেগের কারণে সে ভুল মানুষে পরিণত হয়েছিল। আর যদি সে মরে গিয়ে থাকে, তবে তার জিগ্যাস্য ছিল (সেই বৃদ্ধ এজমা রোগীর মতো) সে কি কোনো সাধু বা সন্ন্যাসী ছিল? ত্যারু লোকটির মৃত্যুর বিষয়ে চিন্তা না করলেও তার অনুপস্থিতির  বিষয়টি বৃদ্ধ লোকটি সম্পর্কে তাকে একটি ইঙ্গিত দিলো।

“সম্ভবত,” সে লিখল, “সাধুত্ব সম্পর্কে আমরা কেবল অনুমান করতে পারি। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে সামান্য কল্যাণময় যাদুতে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে।”

কটার্ডের বিষয়ে তার নোট করা পর্যবেক্ষণগুলোর মধ্যে ইতস্ততভাবে এখানে সেখানে ছড়িয়েছিল গ্র্যান্ড ও রিও’র মা সম্পর্কে তার লিপিবদ্ধ করা মন্তব্যগুলো।

গ্র্যান্ড রোগমুক্ত হয়ে কাজে ফিরে গিয়েছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যে, তার কখনোই কিছু হয়নি। একসাথে থাকার সময়ে রিও’র মায়ের সাথে বিভিন্ন সময়ে তার আলাপচারিতা, তার মনোভাব, প্লেগ সম্পর্কে তার মতামত সবকিছুই বিস্তারিতভাবে তার ডায়রিতে লেখা ছিল। মোটের ওপরে ত্যারু তার ডায়রিতে মাদাম রিও’র নিঃস্বার্থতা, সবচেয়ে সরল শব্দ ব্যবহার করে কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করা, যে জানালার পাশে তিনি প্রতিদিন ভোরে বসতেন সেটির প্রতি তার পক্ষপাতমূলক ভালোবাসা, জানালার হাতলে হাত রেখে সোজা হয়ে বসে নীচের শান্ত রাস্তার ওপরে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে স্থির কালো অবয়বে পরিণত হয়ে অন্ধকারের সাথে মিশে যাওয়া –এগুলো সবকিছুরই নিখুঁত বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছিল। সে লিখেছিল  যে, তিনি ঘরের ভেতরে সহজভাবে চলাফেরা করতেন, সবার সাথে দয়াশীল আচরণ করতেন, আপাতভাবে চিন্তা না করেই সবকিছু সম্পর্কে সত্য বুঝতে পারতেন, সারাক্ষণ নীরবতা বজায় রাখতেন এবং অন্ধকার বা আড়ম্বরপূর্ণ আলোতেও ভয় পেতেন। এগুলোই  ছিল তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট।

এই পর্যায়ে ত্যারু’র হাতের লেখা ভীষণভাবে খারাপ হয়ে গিয়েছিল এবং সেগুলো নীচের পড়ার অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। একইসাথে সে নিজের ওপরেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। তার নিয়ন্ত্রনহীনতার নিশ্চিতি হিসেবে আমরা দেখতে পাই যে ত্যারু তার লেখার শেষ লাইনে প্রথমবারের মতো নিজের জীবন সম্পর্কিত ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করেছিল- “তিনি আমাকে আমার মায়ের কথা মনে করিয়ে দেন। আমার মায়ের যে জিনিসটা আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতাম তা হলো নিজের সম্পর্কে কোনো চিন্তা না করা ও তার নিষ্প্রভতা। আট বছর আগে তিনি মারা গেছেন, কিন্তু আমি কখনোই ভাবি না যে, তিনি মৃত। যখন আমি তাকে দেখি না, তখন আমার মনে হয় যে, অন্য সময়ের তুলনায় তিনি কেবল নিস্প্রভ হয়ে আছেন।”
 
কটার্ডের বিষয়ে ফিরে আসি এবার। যখন সাপ্তাহিক পরিসংখ্যানে মৃত্যুর সংখ্যা কম দেখানো শুরু হলো, তখন সে বিভিন্ন অজুহাতে রিও’র সাথে কয়েকবার দেখা করেছিল। তবে তার আসল উদ্দেশ্য ছিল মহামারির সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে  রিও’র মতামত সম্পর্কে জানা।

“তুমি কি আসলেই মনে করো যে, হঠাৎ করে মহামারি থেমে যাবে?” বিষয়টা নিয়ে তার সন্দেহ ছিল অথবা সন্দেহের ভান করত। কিন্তু এমনভাবে সে  প্রশ্নটা করত, যাতে মনে হতো যে, সত্যি সত্যি সে বিষয়টা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে।  জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি সময় হতে রিও তাকে মোটামুটি আশাব্যঞ্জক উত্তর দেওয়া শুরু করেছিল। কিন্তু এই উত্তরগুলো কটার্ডের পছন্দ হতো না। এগুলোর বিপরীতেবিভিন্ন সময়ে সে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করত- বিরক্তি প্রকাশ হতে শুরু করে হতাশা ব্যক্ত করা পর্যন্ত।

একদিন ডাক্তার আবেগপ্রবণ হয়ে তাকে বলল, “যদিও পরিসংখ্যান খুবই ইতিবাচক দেখা যাচ্ছে, তবুও এখনই  নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে, আমরা আসলেই কবে মুক্ত হবো।”

“অন্যভাবে বলতে গেলে,” কটার্ড সাথে সাথে বলল, “এ সম্পর্কে জানা নেই। যেকোনো মুহূর্তে এটা আবার শুরু হতে পারে।”

“হ্যা, তাই। ঠিক একইভাবে দ্রুততার সাথে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যাবার সম্ভাবনাও যথেষ্ট।”

সার্বিকভাবে অন্য সবার জন্যে পীড়াদায়ক হলেও এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি কটার্ডের জন্যে স্বস্তিকর ছিল। এই সময়ে ত্যারু শহরের তার অংশের দোকানদারদের সাথে কথা বলতে মনস্থ করল। প্লেগ সম্পর্কে রিও’র মতামতগুলো  নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করার জন্যে। এটা করতে তার কোনো অসুবিধা ছিল না। কারণ, প্লেগ কমে যাওয়ার ঘোষণার উচ্ছ্বাস কমে যেতেই শহরের অধিকাংশ জনগণের মধ্যে সন্দেহ ফিরে এসেছিল।

শহরের মানুষদের উদ্বিগ্নতা কটার্ডকে আশ্বস্ত করল। অন্য সময়ের মতো সে হতাশার স্বপক্ষে নিজের মত প্রকাশ করল।

“হ্যা,” সে বিষন্ন মুখে ত্যারুকে বলল,” কিছুদিন পর শহরের ফটক খুলে দেওয়া হবে। তখন  তুমি দেখবে যে, তারা আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রজ্জ্বলিত কয়লার মতো ছুঁড়ে ফেলে দেবে।”

চলবে...

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!