‘তুমি মা চো’কে খুজছ?’ তারা বুঝতে পারল যে ছেঁড়া জামা পরা ভারতীয় বালকটি কাকে খোঁজ করছে। সে মাঝেমধ্যেই ভারতীয় ছুটকোদেরকে তার দোকানে কাজ করার জন্যে নিয়ে থাকে।
‘ঐ যে সে, শুকনা মহিলাটি।’
মা চো ছিল ছোট আকৃতির ও কিছুটা উত্তেজিত মুখের এক নারী। তার কপালের ওপর দিয়ে কুণ্ডলী করা তারের মতো চুল ঝুলছিল- শামিয়ানার ঝালরের মতো। বয়স মধ্য তিরিশ। দেখতে যতটা ভারতীয় মনে হয়, তার চেয়ে বেশি মনে হয় বার্মিজ। সবজী ভাজছিল সে। এবং নিজের ওপরের দিকে প্রসারিত বাহুর নীচ দিয়ে উড়ে যাওয়া ধুঁয়ার দিকে আড়চোখে তাকিয়েছিল।
.png)
সন্দেহের দৃষ্টিতে সে রাজকুমারের দিকে তাকালঃ
‘কী চাও তুমি?’
রাজকুমার তাদের নৌকার মেরামতের কথা বলল এবং জানাল যে মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্যে তার একটা চাকুরী দরকার। তার বর্ণনা শেষ হবার আগেই মা চো তাকে থামিয়ে দিলো। তারপর চোখ বন্ধ করে উচ্চস্বরে চিৎকার করতে শুরু করল।
‘কী ভেবেছ তুমি? আমার বগলের নীচে কি চাকুরী আছে নাকি যে আমি সেটাকে ছিড়ে নিয়ে তোমাকে দিয়ে দেবো? গত সপ্তাহেই একটা ছেলে আমার দুটো পাতিল নিয়ে পালিয়ে গেছে। তুমিও যে তা করবে না, সেটা আমাকে কে বলবে?’ এবং এই ধরণের কথাবার্তা।
রাজকুমার বুঝতে পারল যে, এই চিৎকারের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু সে নয়। এর আসল কারণ হলো ধুলা, ছ্যাড়ছ্যাড় করে ছড়িয়ে যাওয়া তেল এবং সবজির দাম। তার উপস্থিতি বা কথা নয়। মাথা নীচু করে সে স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে পা দিয়ে ধুলা ছুঁড়তে লাগল। মা চো’র কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত।
কিছুক্ষণ পর হাঁপাতে হাঁপাতে রাজকুমারের দিকে তাকাল। ‘তোমার বাপ-মা কোথায়?’ শেষপর্যন্ত সে বলল তার ময়লা বাহুর ওপরের জামা দিয়ে ঘেমে যাওয়া কপাল মুছতে মুছতে।
‘বাপ-মা নেই। মরে গেছে।’
ঠোঁটে কামড় দিয়ে মা চো বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করল।
‘ঠিক আছে। কাজ শুরু করো। কিন্তু মনে রেখো তিনবেলা খাবার, আর ঘুমানোর জায়গা ছাড়া আর কিছুই পাবে না।’
রাজকুমার মৃদু হাসল ও বল,‘এটুকুই আমার দরকার।’
মা চো’র দোকানটিতে মাত্র কয়েকটা বেঞ্চ ছিল। সেগুলো স্থাপন করা হয়েছিল বাঁশ দিয়ে তৈরি কুটিরের লম্বা থামগুলোর নীচে। সে রান্না করত খোলা জায়গায় স্থাপন করা একটা আগুনের চুলায়, ছোট্ট একটা পিড়িতে বসে। ফ্রাইড বায়া-গিয়াও ছাড়াও সে তার ক্রেতাদেরকে কাছে নুডুলুস ও স্যুপ বিক্রি করত। রাজকুমারের কাজ হলো স্যুপের গামলা ও নুডুলসগুলোকে ক্রেতাদের কাছে নিয়ে যাওয়া। অন্য সময়গুলোতে সে বাসনকোসন পরিষ্কার করত, চুলায় আগুন জ্বালাত এবং স্যুপের পাতিলের জন্যে সবজীগুলোকে কুটিকুটি করে কেটে দিত। মাছ ও মাংশ নিয়ে মা চো তাকে বিশ্বাস করত না। ছোট একটা দা দিয়ে হাসতে হাসতে সে নিজেই এগুলোকে টুকরা করত। বিকেলের দিকে রাজকুমার দুর্গের জলাশয়ে বালতিতে সকল বাসনকোসন নিয়ে যেত এবং সেগুলো ধোয়ার কাজ করত।
মা চো’র দোকান ও জলাশয়ের মাঝখানে একটা প্রশস্ত ময়লাযুক্ত রাস্তা ছিল, যেটি দুর্গের চারদিকে ঘুরে গিয়ে একটা বিশাল চতুর্ভূজের সৃষ্টি করেছিল। জলাশয়ে যাওয়ার জন্যে রাজকুমারকে শুধু এইটুকু খোলা জায়গাকে অতিক্রম করতে হতো। মা চো’র দোকানের সরাসরি বিপরীতদিকে একটা সেতু ছিল। সেটি দিয়ে দুর্গের ছোট প্রবেশপথগুলোর একটি দিয়ে ফিউনারেল গেইটে যাওয়া যেত। রাজকুমার এই সেতুর নীচের পানির ওপরের পদ্মপাতাগুলোকে সরিয়ে একটা পরিষ্কার জায়গা তৈরি করে নিয়েছিল। এখানে স্থাপিত একটা কাঠের তক্তার ওপরে সে বাসনকোসন ধোয়া ও নিজের গোসলের কাজ সারতো।
সেতুর দূরবর্তী প্রান্তে ছিল দুর্গের দেয়ালগুলো। বাইরে থেকে দেয়ালের ভেতরের শুধুমাত্র একটি নয় ছাঁদ বিশিষ্ট চূড়া দৃশ্যমান ছিল। সেটির শীর্ষে ছিল উজ্জ্বল ভাসমান সোনালী রঙের একটি ছাতা। এটি ছিল বার্মার রাজাদের প্রতীক চিহ্ন (hti)। চূড়াটির নীচে ছিল রাজপ্রাসাদের থ্রোন রুম। এখানে বার্মার রাজা থেবাও বিচারের কাজ করতেন। তার সাথে থাকতেন তার প্রধান সঙ্গিনী রানী সুপাইয়ালাত।
দুর্গ সম্পর্কে রাজকুমারের ঔৎসুক্য ছিল, তবে জানত যে তার মতো মানুষদের জন্যে এটি ছিল নিষিদ্ধ এলাকা। ‘তুমি কি কখনো ভেতরে গিয়েছ?’ একদিন মা চো’কে সে জিগ্যেস করল। ‘আমি দুর্গের কথা বলছি।’
‘হ্যাঁ, আমি গিয়েছি,’ মা চো বিজ্ঞ মানুষের জন্যে মাথা নাড়াল। ‘অন্তত তিনবার।’
‘দেখতে কেমন?’
‘খুবই বিশাল, দেখতে যতটুকু মনে হয় তার চেয়েও বড়। নিজেই একটা শহর, যেখানে লম্বা রাস্তা, খাল ও বাগান আছে। ভেতরে যাবার পর প্রথমেই তুমি কর্মকর্তা ও আমির-ওমরাদের বাড়িগুলো দেখতে পাবে। তারপর তুমি নিজেকে খুঁজে পাবে প্রতিরক্ষা চৌকিগুলোর সামনে। বিশাল সেগুণ কাঠ দিয়ে সেগুলো তৈরি করা হয়েছে। তারপরেই আছে রাজপরিবারের সদস্যদের ও তাদের ভৃত্যদের এপার্টমেন্টগুলো। এগুলোতে শত শত রুম আছে। প্রতিটাতেই আছে মসৃণ স্তম্ভ ও মেঝে। দুর্গের ঠিক কেন্দ্রে আছে একটা বিশাল হলরুম। এটাকে মনে হয় আলোর তীরের মতো। উজ্জ্বল স্ফটিকের দেয়াল ও আয়নাযুক্ত ছাঁদের নীচের পিঠের কারণে। লোকজন একে গ্লাস প্যালেস নামে ডেকে থাকে।’
‘রাজা কি কখনো রাজপ্রাসাদ ছেড়ে অন্যকোথাও যান?’
‘গত সাতবছরে যাননি। তবে রাণী ও তার পরিচারিকারা কখনো কখনো দেয়ালের পাশ দিয়ে হাঁটাহাঁটি করে থাকেন। যারা তাদেরকে দেখেছে, তারা বলেছে যে তার পরিচারিকারা এই দেশের নারীদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী।’
‘এই পরিচারিকারা কারা?’
‘এতিম যুবতী মেয়ে, অনেকেই শিশু। বলা হয় যে, এদেরকে দূরের পর্বত হতে রাজপ্রাসাদে আনা হয়। রানী তাদেরকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ ও লালনপালন করেন এবং তারা তার গৃহপরিচারিকা হিসেবে নিয়োজিত হয়। এটাও বলা হয় যে, রানী নিজের ও সন্তানদের পরিচারিকা হিসেবে এদের ছাড়া অন্যকাউকে বিশ্বাস করেন না।
‘এই মেয়েরা দুর্গের গেইটে কখন আসে?’ রাজকুমার বলল। ‘তাদেরকে কীভাবে দেখতে পাওয়া যাবে?’
তার চোখগুলো জ্বলজ্বল করছিল ও সারামুখ ঔৎসুক্যে পরিপূর্ণ ছিল। মা চো তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো। ‘তুমি কি ওখানে যাওয়ার চিন্তা করছ বোকা ভারতীয়, কয়লা-কালো কালা? তারা তোমাকে একমাইল দূর থেকেই দেখে ফেলবে এবং তোমার মুন্ডু কেটে ফেলবে।’
সেই রাতে মাদুরের ওপরে চিৎ হয়ে শুয়ে তার দুই পায়ের মাঝের ফাঁক দিয়ে তাকাল এবং ভাসমান ছাতাটাকে দেখতে পেল, যেটি রাজপ্রাসাদকে চিহ্নিত করছিল। চাঁদের আলোতে সেটিকে একটি বাতিঘরের মতো মনে হচ্ছিল। মা চো যাই বলুক না কেন, সে সিদ্ধান্ত নিলো মান্দালয় ছেড়ে যাবার আগে সে অবশ্যই জলাশয়টি পার হবে এবং ভেতরে কী আছে তা দেখবে।
চলবে...