গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, মোহাস্মদপুর থেকে ঝিগাতলা হয়ে গুলিস্তানের দিকে যাচ্ছিল মিডওয়ে পরিবহনের একটি বাস। বাসটির দরজায় টিকিট কাটার পজ মেশিন গলায় ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় কন্ডাক্টরকে। কিছু সময় পর তিনি ১০-১২ জন যাত্রীর টিকিট কেটে আবারও দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর কন্ডাক্টর যাত্রীদের কাছ থেকে হাতে হাতে ভাড়া আদায় শুরু করেন।
একই দিন ধানমন্ডির ১৯ নম্বর নগর পরিবহন গাড়ির কাউন্টার থেকে টিকিটি কেটে বাসে উঠেছেন যাত্রী রুহুল আমিন। তিনি পল্টনে যাবেন। তার টিকিটের গায়ে ২০ টাকা ভাড়া লেখা থাকলেও দূরত্ব কত কিলোমিটার, তার উল্লেখ নেই। শুধু তারই নয়, কোনো টিকিটেই দূরত্ব উল্লেখ নেই।
.png)
শুধু ই-টিকেটিং নয়, ভাড়া আদায়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নির্ধারিত তালিকাও মানা হচ্ছে না। ওয়েবিল প্রথা বাতিল করা হলেও তা চলছে। অথচ বাসমালিক সমিতি বলেছিল, ই-টিকিটিং চালু হলে বাসের ভেতরে যাত্রীদের থেকে ভাড়া আদায় করা যাবে না। প্রতিটি বাসের নির্দিষ্ট দূরত্বে কাউন্টার থাকবে। সেখান থেকে যাত্রীরা পয়েন্ট অব সেলস বা পিওএস মেশিনের মাধ্যমে টিকিট কেটে বাসে উঠবেন। কিন্তু তার কিছুই এখন নেই। অথচ গণপরিবহনে স্বস্তি ফেরাতে ৪৫টি কোম্পানির বাসে ই-টিকেটিং পদ্ধতি চলছে।
গত তিনদিন রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ১৫, ঝিগাতলা, সিটি কলেজ, শাহবাগসহ বেশকিছু এলাকার বিভিন্ন বাসে সরেজমিন এসব চিত্র দেখা যায়। যাত্রীদের অভিযোগ, ই-টিকেটিং ব্যবস্থা বাস মালিকদের যাত্রী ঠকানোর এক নতুন ফাঁদ।
গত বুধবার মোহাম্মদপুর থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার রুটের রমজান পরিবহনের বাসে (ঢাকা মেট্রো ব-১৩-২২৫৮) পুরোনো ওয়েবিল পদ্ধতিই দেখা যায়। চেকার ছক কাটা ক্লিপ বোর্ডে বাসের যাত্রীর সংখ্যা গুনে লিখে হেলপারকে ফেরত দেন। এরপর হেলপার চেকারকে ৩০ টাকা দিয়ে দেন।
ধানমন্ডির ১৫ নম্বরে মোহাম্মদপুর-দয়াগঞ্জ রুটের মালঞ্চ পরিবহনের দুটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৫৭৫২ এবং ঢাকা মেট্রো ব-১৫-২২৪০) দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এরপর বাস দুটিতে চেকার উঠে যাত্রী গুনছিলেন। হেলপারকে যাত্রী সংখ্যা লিখে দিচ্ছিলেন।
মেশিন কোথায়- এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে চেকার বলেন, মেশিনগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ঠিক করতে সমিতিকে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বাস মালিক সমিতির দফতর সম্পাদক সামদানি খন্দকার ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, কোনো বাস থেকে মেশিন নেয়া হয়নি। সব মেশিন বাস কোম্পানির কাছে রয়েছে।
ই-টিকিটিং ব্যবস্থায় কিলোমিটার অনুযায়ী দূরত্ব উল্লেখ নেই কেন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা বিআরটিএকে জানিয়েছি। শিগগিরই ডিভাইসে কিলোমিটার উল্লেখ করে দেওয়া হবে।’
টিকিটে দূরত্বের বিষয়টি কেন উল্লেখ নেই জানতে চাইলে সমতির দফতর সম্পাদক সামদানি খন্দকার আরো বলেন, টিকিটের গায়ে দূরত্ব উল্লেখ না থাকায় ভাড়া নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে। তা হালনাগাদ করা হবে। কিন্তু এজন্য কোনো মেশিন সমিতি এখনো নেয়নি। টিকিটে প্রতি কিলোমিটার ভাড়ায় পয়সা (দুই টাকা ৪৫ পয়সা) যুক্ত রয়েছে। মোট দূরত্ব দিয়ে হিসাব করলে ভাড়ায় টাকার সঙ্গে পয়সা চলে আসবে। ঐ ঝামেলা এড়াতেই কিলোমিটার উল্লেখ করা হয়নি।
শাহবাগে শিকড় পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৮৯৫৬) দেখা যায় কন্ডাক্টার পজ মেশিন পকেটে রেখে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, মেশিনেই টিকিট দিচ্ছেন। তবে যাত্রীরা জানান, হাতে ভাড়া তোলা হচ্ছে এবং ভাড়াও বেশি নেয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার জিগাতলায় দেখা যায়, তরঙ্গ বাসে কিছু সময় টিকিটে ভাড়া কাটা হয়। পরে মেশিন গলায় ঝুলিয়ে রেখে কন্ডাক্টার হাতে হাতে ভাড়া কাটা শুরু করেন।
বিআরটিএর তালিকা অনুযায়ী, জিগাতলা থেকে মৎস্য ভবনের ভাড়া ১০ টাকা। কিন্তু যাত্রীদের কাছ থেকে ১৫ টাকা নেয়া হচ্ছে। মোহাম্মদপুর থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের দূরত্ব ৭ কিলোমিটার। ভাড়া ১৫ টাকা। অথচ ভাড়া নেয়া হচ্ছে ২৫ টাকা। একইভাবে ধানমন্ডি ১৯ নম্বর থেকে প্রেসক্লাবের বাড়া ১০ টাকা। অথচ নেয়া হচ্ছে ২০ টাকা।
যাত্রাবাড়ী-শাহবাগ হয়ে মিরপুর রুটে চলাচলকারী শিকড় পরিবহনের সহকারী রবিউল ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ই-টিকিট নেয়ার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু যাত্রীর চাপে সবাইকে টিকিট দেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া, সব স্টপেজ অনুযায়ী ভাড়ার অঙ্কও পিওএস মেশিনে উল্লেখ নেই। বাস মালিকরাও ওয়েবিল পদ্ধতির মাধ্যমে বাস থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। তাই আমরা টিকিট দেই বা না দেই- তাতে কিছু যায় আসে না।
মিডওয়ে, তরঙ্গ ও রমজান বাসের হেলপাররা বলেন, বাড়তি ভাড়া বলেন আর যাই বলেন আমাদের কিছু করার নেই। ওয়েবিল পদ্ধতিতে আমাদের গাড়ি চলে। চেকারদের সিস্টেম অনুায়ী ভাড়া কাটতে হয়। প্রতি স্টপেজে চেকারদেরও টাকা দিতে হচ্ছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে মোহাম্মদপুরে অনেক বাস শ্রমিক জানান, তারা দৈনিক ৪০০ এবং চালকরা ৬০০ টাকা মজুরি পান। মাসে ২০ থেকে ২২ দিনের বেশি কাজ পান না। এতে মাসে আয় হয় ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা। এ টাকায় ঢাকা শহরে সংসার চলে না। হাতে ভাড়া তুললে দিনে ৪০০-৫০০ টাকা উপরি আয় করতে পারেন। কিন্তু ই-টিকিটং থাকলে তা হয় না।
বাস মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, ই-টিকেটিংয়ের মেশিন বানিয়েছে যাত্রী সার্ভিসেস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মেশিন বাস মালিক সমিতিতে হস্তান্তর করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আরো চার হাজার মেশিন পাইপলাইনে রয়েছে।
গত ১৩ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ৪৫টি কোম্পানির অধীনে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর অঞ্চলের ৩০টি কোম্পানির ১ হাজার ৬৪৩টি বাসে চালু হয় ই-টিকিটং। এছাড়া উত্তরা, মোহাম্মদপুর, গাবতলী ও আজিমপুর রুটের ১৫টি কোম্পানির ৭১১টি বাসে ই-টিকিটং চালু রয়েছে।
বাস মালিক সমিতির কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা শহরের ৬০টি প্রতিষ্ঠানের সব বাস ই-টিকিটের আওতায় আনা হবে। ঢাকা ও আশপাশের জেলায় প্রায় পাঁচ হাজার ৬৫০টি বাস চলাচল করে। আর শুধু ঢাকা মহানগরে চলে তিন হাজার ১৪টি বাস। আগামীতে ঢাকাসহ আশপাশের ৯৭টি প্রতিষ্ঠানের বাস ই-টিকিটের আওতায় আনার চিন্তা রয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমতি সূত্রে জানা যায়, আগে চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রতিদিন বাসপ্রতি ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা বা এর কাছাকাছি ভাড়া পেতেন মালিকরা। ই-টিকিটিংয়ে এখন ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা বা এর কাছাকছি পান। আগে প্রতি ট্রিপে চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপার ৩৫০ টাকা করে পেতেন। আর এখন তিন ট্রিপে ১৬০০ থেকে ১৯০০ টাকা পাচ্ছেন তারা। ফলে অনেক বাস মালিক আগের অবস্থায় ফিরে গেছেন। অর্থাৎ অনেক বাস মালিকরাও চুক্তিতে বাস চালাতে দিচ্ছেন।
ই-টিকিটং ব্যবস্থা কার্যকর সম্পর্কে খন্দকার এনায়েত উল্যাহ আরো বলেন, শতভাগ ই-টিকিটিং সিস্টেম চালু করতে পেরেছি সেটি বলব না। ৪৫টি কোম্পানির ৭০ থেকে ৭৭ শতাংশ বাসে ই-টিকেটং কার্যকর হয়েছে। এখনো কিছু অনিয়ম রয়েছে।
তিনি বলেন, অনিয়ম মনিটরিংয়ের জন্য ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির ৯টি ভিজিল্যান্স টিম প্রতিদিন সড়কে কাজ করছে। এছাড়া সমিতির পক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া ৯ জন স্পেশাল চেকার প্রতিদিন সড়কে মনিটরিং করছে। আরো ১০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু বাস এখনো চুক্তিতে চলছে- এমন তথ্য পাচ্ছি। যে অনিয়ম বহু বছর ধরে চলছে, তা রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে সময় লাগবে। তারপরও চেষ্টা অব্যাহত আছে। ই-টিকেটিং নিয়ে সব অনিয়ম আমরা দূর করবো। এজন্য যাত্রীদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। তাদেরকে সমমূল্যের টিকিট চেয়ে নিতে হবে।
ই-টিকিটিং বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ই-টিকিটিং পদ্ধতি চালুর আগে মালিকদের তেমন প্রস্তুতি ছিল না। যে কারণে এখনো শৃঙ্খলা আসেনি। অনেক বাসে ওয়েবিলই চলছে। আবার চুক্তিতেও অনেক বাস চলছে। ই-টিকিটিংয়ে ভোগান্তি কমাতে হবে।
দিশারী বাসের মালিক বোরহান হোসেন বলেন, শ্রমিকরা মেশিন ব্যবহার করতে চায় না। বাধ্য হয়ে মেশিন বাদ দিতে হয়েছে। আবার মেশিন না থাকলে ভাড়ার টাকা চুরি হয়, সেটি ঠেকাতে পুরনো ওয়েবিল চালু রাখতে হচ্ছে।