খাঁচায় বন্দি রাজউকের আইন
‘তুমি, আমি এবং আমরা’—এই তিন শব্দের সমারোহ যেন রাজউক, পরিচালক, অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকদের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নিয়ম আছে। আছে আইন। আছে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও। কিন্তু এসবের প্রয়োগ নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। অনেকটা এমন—চোর চুরি করবে, পুলিশ পাহারা দেবে। চোর পণ্য নিয়ে যাবে। আর পাহারাদার নীরব থাকবে। রাজউকের ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
ভবন মালিক অনুমোদনহীন বা নকশাবহির্ভূত নির্মাণ করবেন। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা চিঠি দেবেন। পরে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হবে। কিন্তু নির্মাণ থামবে না। এরপর কোনো এক সময় হবে মোবাইল কোর্ট। ভবন মালিক ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দেবেন। সেখানে বলা হবে, নকশাবহির্ভূত অংশ নিজেরাই ভেঙে ফেলবেন। দেওয়া হবে সামান্য জরিমানা। এরপর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা চলে যাবেন। পরবর্তী সময়ে কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে প্রকল্পে যাবেন। চা-পানি খাবেন। পরিদর্শন শেষে ফিরে আসবেন। এভাবেই একসময় ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাবে। সবাই যেন একসঙ্গে বলবেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ’। এরপর স্বস্তির নিশ্বাস। এভাবেই কি শেষ হচ্ছে রাজউকের আইন ও নির্মাণ বিধিমালার প্রয়োগ?
.png)
এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মানিকগঞ্জ টাওয়ারে। ২০২৪ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। নভেম্বর মাসে রাজউকের অথরাইজড অফিসার সাইদা ইসলাম (৭/২) স্বাক্ষরিত একটি চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে মানিকগঞ্জ টাওয়ার, সাবান ফ্যাক্টরি রোড, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ভবনটির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
নোটিশে ভবন মালিকের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কেন তার স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে না।কিন্তু এরপর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে ভবনটি একতলা থেকে দশতলা হয়েছে। সেখানে মানুষ বসবাসও শুরু করেছেন। অথচ সংশ্লিষ্ট ইমারত পরিদর্শক বা অথরাইজড অফিসারের বক্তব্যে মনে হয়েছে, ভবনটির বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না।
ইমারত পরিদর্শক মো. জয়নাল আবেদিনের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি প্রথমে প্রকল্পটি চেনেন না—এমনটাই জানান। পরে তাকে চূড়ান্ত নোটিশটি দেখানো হয়। নোটিশ দেখার পর তিনি বলেন, এটি একটি ‘সাইড এলাকা’। পরবর্তীতে মোবাইল কোর্ট হলে ভবনটি ভেঙে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। ভবনে বসবাসও শুরু হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই পর্যায়ে এসে ভবনটি কেন ভাঙা হবে? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন—অনুমোদনহীন বা নকশাবহির্ভূত নির্মাণ চলার সময় ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বিষয়টি দেখেছেন কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়। ভবনটি গড়ে ওঠার পেছনে কারও কোনো অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে তারও তদন্ত প্রয়োজন। কারণ আইন থাকলেই হবে না। আইনের প্রয়োগও থাকতে হবে। থাকতে হবে জবাবদিহি।
রাজউকের অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াসের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে কিছুই জানেন না বলে জানান। পরে তিনি ইমারত পরিদর্শক মো. জয়নাল আবেদিনকে ডেকে আনেন। জয়নাল আবেদিন আগের বক্তব্যই পুনরায় জানান। বলেন, পরবর্তীতে মোবাইল কোর্ট হলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আসলে বিষয়টি জানতাম না। জানলে আগেই পদক্ষেপ নিতাম।’
অন্যদিকে পরিচালক মো. মইনুল আবেদিনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনিও বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানান। তিনি অথরাইজড অফিসারের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানাবেন বলে জানান। এ সময় তিনি চূড়ান্ত নোটিশের একটি কপি চান। কপি দেওয়ার পর তিনি বলেন, দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন।
ভবন মালিক মো. মোশাররফ হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, রাজউকের অনুমোদিত নকশা ছাড়া তিনি কীভাবে ভবনটি নির্মাণ করলেন। জবাবে তিনি বলেন, প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমোদন নিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করেন। পরে রাজউক আসার পর তাদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্মাণকাজ শেষ করেন। এখন প্রশ্ন উঠছে—রাজউকের কর্মকর্তারা তাকে কী পরামর্শ দিয়েছিলেন?কোন বিশেষ সুবিধায় অনুমোদনহীন একটি ভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হলো?
মানিকগঞ্জ টাওয়ারের ঘটনা সামনে আসার পর আরও অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাজউকের আওতাধীন এলাকায় অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন? চিঠি দেওয়া হয়। নোটিশ দেওয়া হয়। চূড়ান্ত নোটিশও দেওয়া হয়। এরপরও নির্মাণ চলতে থাকে কীভাবে?মোবাইল কোর্ট হয়। জরিমানা হয়। অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়। তারপরও নির্মাণকাজ বন্ধ হয় না কেন?
এমন প্রশ্ন শুধু একটি ভবনকে ঘিরে নয়। অনুমোদিত ও অনুমোদনহীন—বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরেই রয়েছে এমন অভিযোগ। নকশাবহির্ভূত নির্মাণ এবং নীরবতার অভিযোগ যেন অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত চিত্র হয়ে উঠেছে। প্রকল্প পরিদর্শনের নামে কর্মকর্তাদের যাতায়াত নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। একদিকে তিলে তিলে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। অন্যদিকে আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। আইন আছে। নির্মাণ বিধিমালা আছে। আছে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও। তবে প্রশ্ন একটাই—আইনের প্রয়োগ ও জবাবদিহি থাকবে কি?