ভুল চিকিৎসায় মারা যাওয়া ঐ নারীর নাম রফিকুন্নাহার ডাকনাম পলি খাতুন (৬০)। এ ঘটনায় এরই মধ্যে হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার সিরাজী শফিকুল ইসলামকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল, স্বাস্থ্য অধিদফতর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীর ছেলে।
রুহুল আমিন অভিযোগ করে বলেন, আম্মুর অপারেশন থেকে শুরু করে সামগ্রিক চিকিৎসায় গাফিলতি ছিল চিকিৎসকদের। তাদের বারবার কাকুতি মিনতি করেও আম্মুর সংজ্ঞাহীন হয়ে যাওয়ার কারণ জানতে পারিনি। চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসার কারণেই আম্মু মারা যান।
.png)
তিনি বলেন, আমার আম্মা স্ট্রোক করলে তাকে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করি। ভর্তির ১৩ দিন পর্যন্ত আম্মা সুস্থ ছিলেন; তার চিকিৎসা চলছিল। তখন কেবল তীব্র মাথাব্যথা ছিল তার। এরমধ্যে চিকিৎসকরা তার অপারেশনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। গত ২৮ ডিসেম্বর আম্মুকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। ৪ ঘণ্টার অপারেশন শেষে আম্মুকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হলেও তিনি আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেননি। এভাবেই ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় থাকার পর মারা যান।
এর আগে, গত ১৩ই ডিসেম্বর পাবনার ঈশ্বরদীতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে রোগ শনাক্তে বিলম্ব হলে পরদিন স্থানীয় একটা ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকেরা তার মায়ের ব্রেন স্ট্রোক শনাক্ত করে ঢাকায় নিয়ে আসার পরামর্শ দেন।
এরপর ১৫ ডিসেম্বর ভোররাতে পলি খাতুনকে আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ডাক্তার রাজিব নারায়ণ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা শুরু হয়।
তার অভিযোগের পর হাসপাতাল থেকে ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. কাজী মহিবুর রহমানকে সভাপতি করে একটা তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
ডা. কাজী মহিবুর রহমান বলেন, যেহেতু এটা সেন্সেটিভ বিষয় তাই আমি কোনো মন্তব্য করতে পারবো না। আমরা তদন্ত রিপোর্ট হাসপাতালের পরিচালক বরাবর জমা দিয়েছি।
নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে রফিকুন্নাহারের অপারেশন হয় ২৮ ডিসেম্বর। তার পরিবারের দাবি অপারেশন কক্ষে নেয়া পর্যন্ত রফিকুন্নাহার স্বাভাবিক ছিলেন। এমনকি খাবার গ্রহণ থেকে শুরু করে হাঁটাচলা ও কথাবার্তা স্বাভাবিক ছিল। তিনি তাদের সঙ্গে গল্প করতেন। তবে মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা ছিল।
এদিকে মৃত রফিকুন্নাহারের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ২৩ ডিসেম্বর ডাক্তার সিরাজী তাদের বলেন রফিকুন্নাহারের অপারেশনের জন্য ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লাগবে। যদিও একটু পর ডাক্তার সিরাজী বলেন অপারেশনে ৩-৫ লাখ টাকা খরচ হবে। এই টাকা জমা দিলে পরদিন তার অপারেশন করা হবে। এ সময় তারা প্রশ্ন করেন, আগে হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছিল এই অপারেশনে খরচ হবে ২ লাখ টাকা এবং সেই টাকাই তারা সংগ্রহ করেছেন। এখন হঠাৎ করে কেনো টাকা বেশি লাগছে। এ প্রশ্ন শুনে ডাক্তার সিরাজী তাদের বলেন, এই টাকা ছাড়া অপারেশন হবে না এবং তার এক সহকর্মীকে রোগীকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দিতে বলেন। ফলে তারা বাধ্য হয়ে ২৪ ডিসেম্বর ৩ লাখ টাকা জমা দেন। এ টাকার বিনিময়ে তাদের একটা সাদা কাগজে মানি রিসিট দেওয়া হয় এবং জানানো হয় অপারেশনের পর পূর্ণাঙ্গ খরচ হিসেব করে সরকারি রিসিট দেওয়া হবে।
টাকা জমা দেওয়া হলেও ২৪ তারিখ রফিকুন্নাহারের অপারেশন করা হয়নি এবং নতুন তারিখ দেওয়া হয় ২৭ ডিসেম্বর। যদিও সেদিন অপারেশন না করে ২৮ ডিসেম্বর তার অপারেশন শুরু হয়।
হাসপাতালের মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ডা. জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, চিকিৎসকরা সবসময় চেষ্টা করেন রোগীকে সুস্থ করার। হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিবেদন নিয়ে কখনো প্রশ্ন উঠেনি। তাদের অভিযোগের বিপরীতে যে কমিটি গঠন হয়েছিল তারা তাদের কাজ করেছেন। এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।