নিউগিনি প্রপার্টিজে ভাঙচুর: সাবেক সেনা কর্মকর্তা গ্রেফতার
রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে গত শনিবার রাতে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় করা মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
আজ বুধবার দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে রমনা থানাধীন সেগুনবাগিচা এলাকার ২০ নম্বর সড়কের ২/এ নম্বর বাসা থেকে ডিবির গুলশান বিভাগের একটি দল তাকে গ্রেফতার করে। তিনি এ মামলার এজাহারভুক্ত চার নম্বর আসামি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
.png)
ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মামলার তদন্তকালে গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাকে আইনানুগভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখন জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। এ মামলায় এরই মধ্যে আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রায় ৫০ থেকে ২০০ জন লোক পাঁচটি পিকআপ ভ্যানে করে প্রকল্প এলাকায় আসে। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, দা, ছুরি ও লাঠি ছিল। তারা গুলি করতে করতে প্রকল্পের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ সময় প্রায় ৫০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলাকারীরা প্রকল্পের কার্যালয়, লকার এবং আশপাশের স্থাপনায় হামলা চালায়। লকার থেকে নগদ প্রায় ২৫ লাখ টাকা, ২৩ টন রড, বৈদ্যুতিক তার, ওয়াটার পাম্পসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, এতে প্রায় এক কোটি ৪২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং আরও এক কোটি ৫০ লাখ টাকার মালামাল চুরি হয়েছে।
একই সময়ে প্রকল্প এলাকায় অবস্থিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতেও হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। স্টুডিওটির যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র এবং অন্যান্য মালামাল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়রা জানায়, হামলার সময় বেশ কয়েকজন কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দা আতঙ্কে পালিয়ে যান। এসময় সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. পারভেজসহ কয়েকজন আহত হন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর হামলাকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় এবং কিছুক্ষণ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পরদিন ২৭ সেপ্টেম্বর নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৪৪৭, ৪৪৮, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৩৭৯, ৩৮০, ৪২৭, ১১৪ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। এজাহারে মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। তাদের মধ্যে শাহরিয়ার মাহমুদকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। অন্যান্য নাম উল্লেখিত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আবুল কাশেম, বাবুল হোসেন, মোহাম্মদ শাহিনুজ্জামান, মতিউর রহমান, মজিবুর রহমান, নুরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, এমকে আজাদ, মামুন, আসলাম ও মুন্না। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
পুলিশের তদন্ত সূত্র জানায়, হামলার পেছনে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। নিউগিনি প্রপার্টিজ কর্তৃপক্ষের দাবি, গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রায় ২৩ কাঠা জমি ছিল প্রকল্প এলাকায়। এর মধ্যে ১৫ কাঠা কয়েক বছর আগে তিনি নিউগিনির কাছে বিক্রি করেন। বাকি আট কাঠা তার নামে রয়েছে। পাশে অন্যদের আরও ১২ কাঠা জমি আছে। এই জমির মালিকরাও মহিউদ্দিনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন বলে অভিযোগ। তারা দাবি করেন, বিক্রি করা জমি পুনরুদ্ধার এবং প্রকল্পের ভেতর দিয়ে রাস্তা পাওয়ার জন্যই হামলার পরিকল্পনা করা হয়। অন্যদিকে তদন্ত সূত্র বলছে, মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে এক নম্বর আসামি শাহরিয়ার মাহমুদের পূর্বপরিচয় রয়েছে। সেই সূত্রেই শাহরিয়ার হামলার দায়িত্ব নেন বলে অভিযোগ।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, নিউগিনি প্রপার্টিজের মালিকের ভাই সাইফুল বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত একজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এই ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরও জানান, হামলাকারীরা অস্ত্র নিয়ে প্রকল্পে ঢুকে গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং ব্যাপক লুটপাট চালায়।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রথমে ঘটনাস্থল থেকে মো. মামুন ও মো. আসলামকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ধারালো ছুরি উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুন্না ও মূল পরিকল্পনাকারী শাহরিয়ার মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয়। শাহরিয়ার পল্লবী এলাকার বাসিন্দা এবং এক মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। এরপর মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুল গফুরের জামাতা। মিজানুর এজাহারভুক্ত নয় নম্বর আসামি। এছাড়া শাহ আলম অনিকসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনিক মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক বলে জানা গেছে। এ পর্যন্ত অন্তত সাত থেকে আটজনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, হামলাটি সমন্বিত ছিল এবং জমি দখলের উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়। তবে কোনো সরাসরি রাজনৈতিক সংযোগ পাওয়া যায়নি বলে পুলিশের দাবি। তদন্ত কর্মকর্তা ক্যান্টনমেন্ট থানার উপপরিদর্শক সুব্রত দেবনাথ বলেন, এই মামলায় মোট ছয়জনের বেশি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেছেন। তদন্ত চলমান এবং আরও আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা মো. পল্লব আলী বলেন, হামলাকারীরা পাঁচটি পিকআপে করে এসেছিল। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। তারা গুলি করতে করতে হাউজিংয়ের ভেতরে প্রবেশ করে। সিসি ক্যামেরাগুলোও ভেঙে ফেলা হয়। তিনি আরও জানান, হামলার পর প্রকল্প এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং কর্মচারীরা আতঙ্কে পালিয়ে যান।
এদিকে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার বিষয়েও পুলিশ তদন্ত করছে। স্টুডিওটি নিউগিনি প্রপার্টিজের মালিকানাধীন ভবনের এক তলায় ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। হামলার সময় স্টুডিওর অনেক মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ মামলায় এরই মধ্যে আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলছেন, ইসিবি চত্বরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় এ ধরনের সশস্ত্র হামলা উদ্বেগজনক। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে গ্রেফতারকৃত সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে ডিবির হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পুলিশ বলছে, তার বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে হামলার পূর্ণাঙ্গ চিত্র উন্মোচিত হবে। মামলার তদন্ত এখনো চলমান এবং আরও আসামিদের গ্রেফতার হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।