আজব এক রীতি! মানুষের সঙ্গে কবর দেয়া হত আস্ত জাহাজও
প্রত্নতাত্ত্বিকদের একেকটি গবেষণা যেন একেকটি দলিল। সারাবিশ্বই এসব আবিষ্কারের জন্য উন্মুখ থাকে সারা বছর। কমলালেবু আকৃতির এই পৃথিবীর বয়স ৫০০ কোটি বছর। প্রতি দশকে পাল্টেছে তার চিত্র। অনেক সভ্যতা, জাতি বিলুপ্ত হয়ে কিংবা ভেঙে ছড়িয়ে গিয়ে তৈরি করেছে নতুন নতুন জাতি ও সভ্যতা। তার কিছু কালের সাক্ষী হয়ে ধরা দেয় গবেষকদের কার্বন ডেটিংয়ে।
মাটি চাপা পরে থাকা এমন অনেক সভ্যতাই আমাদের চাক্ষুস হয়েছে এ পর্যন্ত। এভাবে বিশ্ব জেনেছে হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছু। তেমনই এক জাতির কথা বলছি। যারা অন্যদের থেকে খানিকটা আলাদাই ছিলেন বটে! বিভিন্ন জায়গায় খননের সময় পাওয়া গেছে সমাধি। এমন অনেক সমাধি পাওয়া গেছে,যেখানে শুধু মৃতব্যক্তিই নয়, সঙ্গে পাওয়া গেছে পোষ্য, গাড়ি, অলঙ্কার, হাড়ি- পাতিলসহ, অস্ত্রও বাদ যায়নি। জানেন কি? ভাইকিং জাতি মৃতদেহের সঙ্গে কবর দিতেন জাহাজ।
তেমনই মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে একটি জাহাজ। না, সেখানে সমুদ্র ছিল না কোনোদিন। নরওয়ের এক অতি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র থেকেই আস্ত একটি জাহাজ খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। অবশ্য তাদের দাবি প্রাচীন ভাইকিং উপজাতির মানুষরা সমাধির সময় একটি করে জাহাজ মৃতদেহের সঙ্গে মাটিতে কবর দিত। এটাই ছিল সামাজিক ক্ষমতার পরিচয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, বিগত এক শতাব্দীর বেশি সময় এমন কোনো জাহাজের সন্ধান পাননি প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
.png)
আরো পড়ুন: টয়লেট পেপার আবিষ্কারের আগে ব্যবহার হত কাঠি
১৯০৪ সালে শেষ সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল বিখ্যাত ওজবার্গের জাহাজ। তার নিচে শায়িত ছিলেন দুজন নারী। এরপর থেকে এমন কোনো জাহাজ পাওয়া যায়নি। অবশ্য ভাইকিং উপজাতির ইতিহাসের খুব সামান্য নমুনাই বিশেষজ্ঞরা খুঁজে পেয়েছেন। সেখানে আবারো এক জাহাজের সন্ধান পাওয়া সত্যিই ঐতিহাসিক ঘটনা। যদিও দীর্ঘদিনের অযত্নে তার অবস্থা এখন যথেষ্ট সঙ্গিন। অধিকাংশ কাঠই ছত্রাক নষ্ট করেছে। তারই মধ্যে অতি সাবধানে দুটি কিল সংগ্রহ করেছেন ইউনিভার্সিটি অফ অসলো’জ মিউজিয়াম অফ কালচারাল হিস্ট্রির প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
তবে এই আবিষ্কারের আরো একটি অবাক করা দিকের সন্ধান পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। জাহাজের সঙ্গে যে মরদেহটি শায়িত ছিল, সেটি দেখে তাদের বিশ্বাস, এটা মানুষের মৃতদেহ নয়। মানুষের হাড় এত বড়ো হয় না। এই হাড় নিঃসন্দেহে ঘোড়া বা অন্য কোনো গবাদি পশুর হাড়। তবে কি মানুষের মতোই পশুদের কবর দেয়ার সময়েও জাহাজ দেয়ার রীতি ছিল? নাকি এটা একধরনের সামাজিক আধিপত্যের দম্ভ? ভাইকিং ইতিহাসের নানা অজানা দিক নিয়ে গবেষণা চলবে। আর সেই গবেষণার দলিল হয়ে থেকে যাবে সাম্প্রতিক এই খননকার্য। আচ্ছা এবার চলুন এই জাতির অজানা আরো কিছু বিষয় জেনে নেয়া যাক-
আরো পড়ুন: বাংলার বধূর সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার পেছনে করুণ ইতিহাস
‘ভাইকিং’নামটির সঙ্গে আমরা অনেকই পরিচিত। কিন্তু জানেন কি? ভাইকিং কারা কিংবা তাদের কাজ কি ছিল? আমেরিকার ইতিহাসে তাদের অবদান কত অনেক। ৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১শতক পর্যন্ত ভাইকিংদের আধিপত্য ছিল। স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের একটি বিশাল সংখ্যালঘু গোষ্ঠী তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য মাতৃভূমি ত্যাগ করে এবং সমুদ্র তীরবর্তি অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। সমুদ্র সৈকতে বসতি স্থাপনকারী, জীবিকার তাগিদে অনবরতভাবে যুদ্ধে লিপ্ত এসব মানুষরাই ভাইকিং নামে পরিচিত ছিল।
উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষত অনির্ধারিত আশ্রম,মঠ, ব্রিটিশ দ্বীপ ইত্যাদি স্থানে ভাইকিংরা অভিযান চালাত। তিন শতাব্দী ধরে তারা ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় মহাদেশের উপর বিভিন্ন ভাবে আক্রমণ চালায়। যুদ্ধে পটু,আর জাহাজ চালানোর অসম্ভব দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রায় তিনশ’ বছর ধরে গোটা ইউরোপ, আমেরিকা দপিয়ে বেড়িয়েছে তারা।
আরো পড়ুন: নগ্ন এক জাতি, ৬০ হাজার বছর ধরে রয়েছে সবার অগোচরে!
ভাইকিং নামটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান থেকে এসেছে, পুরনো নরওয়েজিয়ান শব্দ "বিকা" (উপসাগর বা খাদ) থেকে। সভ্যতার মানদণ্ডে রীতিমতো অসভ্য আর বর্বর এই জাতি সাগরে অসম্ভব সব দূরত্ব পাড়ি দিয়েছে, নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার করেছে। আর এ সমস্ত কিছুই তারা করেছে একদম নিজেদের প্রচেষ্টায়। ভাইকিংরা জাহাজ বানাতে ছিল অসম্ভব রকমের পটু।
একটি জাহাজ কোন পথে যাবে বা কি পরিমাণ ভার বহন করতে হবে এসব বিবেচনা করে তারা জাহাজ নির্মাণ করতে পারতো। প্রতিটি অভিযান শেষে নিরাপদে ফেরত আসা নাবিকদের মুখে সমুদ্রযাত্রার বিবরণ শুনে সেই রুটের জাহাজের নকশা তৈরী করতো নির্মাতারা। সাধারণত তারা দুই ধরনের জাহাজ বানাতো, এর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল ‘ল্যাংস্কিপ’ যেটা ছিল আদতে যুদ্ধ জাহাজ। এই জাহাজগুলোতে চেপে তারা হামলা করতো বিভিন্ন দেশে।
ভাইকিংসরা কোনো বংশ বা ধর্মের মতাবলম্বী ছিল না। তাদেরকে ইউরোপীয়রা নিজেদের স্বজাতি হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। কারণ তারা একটি বিদেশী জাতি হিসেবে এসেছিল এবং তাদের কর্মকাণ্ড ছিল বর্বরোচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তারা খৃস্টান ছিল না। ভাইকিংদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল এখনকার সময়ের নরওয়ে সুইডেন এবং ডেনর্মাক হিসাবে পরিচিত এলাকাগুলোতে। এই দেশগুলো একত্রে স্ক্যান্ডিনেভিয়া হিসেবে পরিচিত। তারা যে দেশে বাস করত সেখানকার মাটি ছিল ভয়াবহ রুক্ষ আর অনুর্বর। সেই সঙ্গে ছিল তীব্র শীতের প্রকোপ। অনেকটা বাঁচার তাগিদেই প্রতি বছর জাহাজে চেপে বিভিন্ন দেশে অভিযানে বের হতো তারা। লুটের মাল যত বেশী হবে, তত আরামে কাটবে শীতের মৌসুম। তাই লুটপাট চালানোর ব্যাপারে তারা ছিল অসম্ভব নির্মম আর অসভ্য।
সমুদ্রচারী দস্যুরাই ইউরোপে পরিচিত হয়েছিল ‘ভাইকিং’ নামে। ভাইকিংদের জাহাজ দেখা আর আজরাইলকে দেখা–এই দুটোই ইউরোপের মানুষের কাছে ছিল সমান বিষয়। আজকে মার্ভেলের সুবাদে আমরা যে থর, ওডিন আর লোকিদের নিয়ে তৈরী মুভি দেখি, এরাই ছিল এসব নর্থমেনদের উপাস্য দেবতা। ৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে, উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় ইংল্যান্ডের নর্থমার ল্যান্ডের উপকূলে লিন্ডসফার্নে এক সন্ন্যাসীদের আশ্রমে আক্রমণের মধ্য দিয়ে ভাইকিং যুগের সূচনা হয়েছিল।
আরো পড়ুন: মৃত মানুষের মগজ খাওয়াই এই জাতির রীতি
অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় তারা ছিল অদ্ভুত রকমের আগ্রাসি। আশ্রমের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি তারা কোন শ্রদ্ধা দেখায়নি। এর দুই বছর পরে, তারা স্কি ও আইওনা এবং রাথলিন (আয়ারল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব উপকূলে বন্ধ) এর অনির্ধারিত দ্বীপ, আশ্রম ও মঠ গুলোতে আঘাত হানে। ৮৪০ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের ফ্রাইকা (আধুনিক দিনের ফ্রান্স ও জার্মান) -এর রাজা লুইসের মৃত্যুর পর তার পুত্র লোথর তার ভাইদের যুদ্ধে পরাজিত করার জন্য ভাইকিংদের কাছে এসেছিলেন সাহায্যের জন্য । সংগ্রামের অনেক আগেই ভাইকিংরা বুঝতে পেরেছিল যে ফ্র্যাঙ্কিশ শাসকরা তাদের অর্থ প্রদান করতে ইচ্ছুক। তাই তারা এ সুযোগর সৎব্যাবহার করেন। এর ফলে তাদের প্রভাব ইউরোপে আরো বিস্তৃত হয়।
ভাইকিংরা নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ইংল্যান্ড অভিযান পরিচালনা করে। নতুন কোনো জনপদ থেকে তাদের একজন অভিযাত্রী বেঁচে ফিরে আসতে পারলেই পরের মৌসুমে তারা সেই রুটে রওনা হয়ে যেতো ড্রাগন জাহাজের বিশাল বহর নিয়ে। আর আক্রান্ত দেশটি নিমেষে পরিণত হতো হাবিয়া দোজখে।
আরো পড়ুন: সোনায় মোড়ানো কফিনে আজও অক্ষত ২৫০০ বছরের পুরনো মমি
ইংল্যান্ড নামের দেশ নিয়ে ভাইকিংদের ভেতর অনেক কথা প্রচলিত ছিল। তারা জানতো সূর্যাস্তের দিকে সাতদিন একটানা জাহাজ চালালে একটা সবুজ দেশ দেখা যায়। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজেদের জন্য স্থায়ী বসবাস তৈরি করা । তারা "ওয়াইল্ডস স্কটল্যান্ডের" উত্তরাঞ্চল, হিব্রাইডস এবং স্কটল্যান্ডের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। তারাই আয়ারল্যান্ডের প্রথম বাণিজ্যিক শহরগুলোর প্রতিষ্ঠা করে।
ডাবলিন, ওয়াটারফোর্ড, ওয়েক্সফোর্ড, উইকলো এবং লিমেরিক ইত্যাদি স্থানগুলো ব্যবহার করে আয়ারল্যান্ড এবং আইরিশ সাগরে সারা ইংল্যান্ডের উপর হামলা চালান হত। আইরিশ উপকূলের উপর তাদের বেস ব্যবহার করে। ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে আক্রমণের মধ্যে দিয়ে ইংল্যান্ড আক্রমনের সূচনা ঘটে। রাজ্য-ওয়েসয়েক্স সফলভাবে প্রথম বারের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিল। ভাইকিং বাহিনী পূর্ব এঙ্গেলিয়া ও নর্থবারল্যান্ডের জয়লাভ করে। ৮৯৩ সালের কথা, সেবছরেই প্রথমবার সফলভাবে ইংল্যান্ডে পৌছে লুটপাট চালিয়েফেরত আসতে সক্ষম হয় তারা।
ইংল্যান্ডের ১১০৯ সালের ঘটনাগুলো কার্যকরভাবে ভাইকিংদের সমাপ্তি ঘটায়। তাদের সমাপ্তির পর স্ক্যান্ডিনেভিয়ানের সমস্ত রাজ্যেই খ্রিস্টান ছিল। এবং ভাইকিং সংস্কৃতিগুলো খ্রিস্টান ইউরোপের সংস্কৃতির রূপ নিয়ে ছিল। আজ, ভাইকিং বংশভুত কিছু মানুষ স্ক্যান্ডিনেভিয়ানের কয়েকটি স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। এছাড়াও উত্তর ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং রাশিয়া সহ আরো কিছু স্থানে তাদের পাওয়া যায়।