ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাতরং ]

নিউটনের সূত্রসহ কোয়ারেন্টাইনে বিখ্যাত যত আবিষ্কার 

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩:৫৫, ২২ মে ২০২১
নিউটনের সূত্রসহ কোয়ারেন্টাইনে বিখ্যাত যত আবিষ্কার 
কোয়ারেন্টাইনেই নিউটন তার মধ্যাকর্ষ সূত্রটির উদ্ভাবন ঘটান

পুরো বিশ্ব আক্রান্ত এক মহামারিতে। বর্তমানে মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ থেকে বাঁচতে লক ডাউনের মধ্যে রয়েছে অনেক দেশ। কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে সবাই আপাতত নিজের ঘরেই আশ্রয় নিয়েছেন। ওয়ার্ক ফ্রম হোম! কেউ রয়েছে কোয়ারেন্টাইনে কেউবা আইসোলেশনে। ঘরবন্দি জীবনে অনেকেই বিরক্ত হচ্ছেন। ভাবছেন ঘরে বসে কি করব। কাজ নেই, শুধু খাওয়া ঘুমে এতোদিন পার করা তো যায় না।  

তবে জানেন কি? কোয়ারেন্টাইনের সময়ই সৃষ্টি হয়েছে যুগান্তকারী বিভিন্ন আবিষ্কার। মহামারি থেকে বাঁচতে যখন শেক্সপিয়ার কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন তখন তিনি একটি উপন্যাস লিখে ফেলেন। আবার আইজাক নিউটন তার মহাকর্ষ সূত্রটির উদ্ভাবন ঘটান। শুধু এই দুইজনই নন এই তালিকায় রয়েছেন আরো কয়েকজন জনপ্রিয় সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব। আপনিও আপনার সুপ্ত প্রতিভাগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন এই সময়ে। চলুন এমন কিছু মানুষের উদাহরণ জেনে নেই- 

আইজ্যাক নিউটন

Advertisement

বুবোনিক প্লেগ মহামারির ঘরবন্দি সময়টা নিউটনের জীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ মুহূর্ত
আপেল গাছের নিচে বসে ছিলেন এক তরুণ। কিছু একটা ভাবনায় তখন তিনি মগ্ন। হঠাৎ মাথায় এসে পড়লো একটি আপেল। সেসময় আরো একটি ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেটে থাকলো তার। গাছ থেকে আপেল উপরের দিকে না গিয়ে নিচে পড়লো কেন? নিশ্চয় বুঝে গিয়েছেন কার কথা বলছি। হ্যাঁ, আইজ্যাক নিউটন আর তার সেই মধ্যাকর্ষণ সূত্র। 

আইজ্যাক নিউটন তখন ইংল্যান্ডে বসবাস করছেন। ঘটনাটি ১৬৬৫ সালের, নিউটনের বয়স তখন ২০ এর কোঠায়। তখনও বুবোনিক প্লেগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে এই সালটি অন্যতম কালো সাল। শুধু ইংল্যান্ড কেন, পৃথিবীর ইতিহাসেও। মানুষে-মানুষে যুদ্ধ নয়; এই লড়াই প্লেগের সঙ্গে। গোটা লন্ডন, ইংল্যান্ড ছারখার হয়ে গিয়েছিল এই রোগের আক্রমণে। ‘দ্য গ্রেট প্লেগ অফ লন্ডন’। মৃতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। চারিদিকে হাহাকার; বন্ধ হতে থাকে সমস্ত স্কুল, কলেজ, অফিস।

আইজ্যাক নিউটন তখন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজের ছাত্র। সদ্য স্নাতক পাশ করে আরও পড়ার কথা ভাবছেন। শুরুও করে দিয়েছিলেন। এমন সময় দেখা দিল মারণ প্লেগ। ছাত্র, শিক্ষকদের সুরক্ষার জন্য বন্ধ হল কেমব্রিজ, ট্রিনিটি। এতে নিউটন হয়ে পড়লেন ঘরবন্দি। নিউটন বাধ্য হয়ে শহর ছেড়ে প্রায় ৬০ মাইল দূরে তার পারিবারিক এস্টেটে ফিরে যান। তবে পড়া বা কাজ থামল না। সেও করছে ওয়ার্ক ফ্রম হোম! সেটাই শাপে বর হয়ে দাঁড়াল তার কাছে। ইতিহাস বলে, এই সময়টাই নিউটনের জীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ মুহূর্ত। একের পর এক তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। বিজ্ঞানের এক শাখা থেকে অন্য শাখায় গেছেন; ডুব দিয়েছেন আর তুলে এনেছেন যুগান্তকারী সব আবিষ্কার। মাধ্যাকর্ষণের ধারণা এবং তার সূত্রও এই সময়ই আবিষ্কার করেন তিনি। এছাড়াও অঙ্কের ক্যালকুলাস, আলোবিজ্ঞান বা অপটিকস-সহ একের পর এক জিনিস আমাদের সামনে আনেন। নিজেকে সর্বস্ব দিয়ে উজাড় করে দেন। এটাই তো অমর হওয়ার সময় তার!

তার এই ঘরবন্দি থাকার সময় যাবতীয় গবেষণা বাইরে আসার পর সবাই চমকে যান রীতিমতো। ফলস্বরূপ, কেমব্রিজে ফেরার পর তিনি নিজের কলেজেই অধ্যাপক হয়ে যান; ফেলোশিপও পান। আপনিও বাইরে একদম না বেরিয়ে, বাড়িতে থেকে কাজে মন দিন ভালো করে। মাধ্যাকর্ষণের সূত্র হয়তো হবে না; নিজের মতো করে সেরাটা তো দিতেই পারবেন। কে জানে, যদি কিছু হয়ে যায়!

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার

কোয়ারেন্টাইনে থাকাকালীন সময় উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ‘কিং লিয়ার’ লিখেছিলেন।
১৭ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লন্ডনে বুবোনিক প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। এমন সময় জনসমাগম এড়াতে থিয়েটারগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সে সময় প্লেগের কবলে পড়ে শেক্সপিয়রের কিং মেন থিয়েটার ট্রুপের একজন অভিনেতা এবং অংশীদার মারা যায়। মহামারি ছড়িয়ে পড়ার এক সপ্তাহ পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ এর কোঠায়। এসময় সরকার কর্তৃক বন্ধ হয়ে যায় জনবহুল এলাকাগুলো।

শহরবাসীরা রোগ থেকে বাঁচতে নিজ নিজ ঘরেবন্দি হয় অথবা শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। প্লেগ রোগের বিস্তার বাড়ায় থিয়েটার শিল্পে ধ্বস নামে তখন। ঠিক এই সময়টিই কাজে লাগান অসম্ভব মেধাসম্পন্ন একজন নাট্যকার, কবি ও অভিনেতা শেক্সপিয়ার। তিনিও অন্যান্যদের মতোই সেসময় গৃহবন্দী ছিলেন। সেসময় ঘরে বসে তিনি ‘কিং লিয়ার’ রচনা করেছিলেন। ১৬০৬ শেষ হওয়ার আগেই শেক্সপিয়ার ‘ম্যাকবেথ” এবং ‘অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা’ রচনা করেন।

অ্যাডভার্ড মুনচ

অ্যাডভার্ড মুনচ কোয়ারেন্টাইনে থেকে নিজের এই ছবিটি একেছিলেন, যা পরবর্তীতে বেশ প্রশংসা কুড়ায়  জনপ্রিয় চিত্রশিল্পী অ্যাডভার্ড মুনচের কথা জানেন নিশ্চয়ই। ‘দ্যা স্ক্রিম’ নামক চিত্রটি তার এক অনন্য সৃষ্টি। ১৯১৯ সালে যখন বিশ্বব্যাপী স্প্যানিশ ফ্লু ছড়িয়ে পড়ে তখন অ্যাডভার্ড মুনচ নরওয়েতে বসবাসরত ছিলেন। দেশব্যাপী তখন সবাই কোয়ারেন্টাইন মেনে গৃহবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। এর ব্যাতিক্রম হলেন না মুনচও। তিনিও এই সুযোগটি কাজে লাগালেন। তবে মহামারি এই রোগ যে তারও পিছু ছাড়ল না, ঠিকই জাপ্টে ধরল।

জনপ্রিয় চিত্রশিল্পী অ্যাডভার্ড মুনচতবে গৃহবন্দী থাকার সময়টুকু তিনি অবশ্য নষ্ট করেননি। যখনই সুস্থতা বোধ করেছেন ঠিক তখনই তুলির আঁচড়ে ক্যানভাস রাঙিয়েছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয়টি হলো, এই অসাধারণ চিত্রশিল্পী নিজেই নিজের ছবিটি এঁকেছিলেন সেসময়। ‘সেল্ফ পোট্রেট উইথ দ্য স্প্যানিশ ফ্লু’ নামক ছবিটিতে দেখা গেছে, অত্যন্ত রুগ্ন ও স্বল্প চুলের এক ব্যক্তি বসে আছেন তার বিছানায়।

থমাস নাসে

তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত নাট্যকার। যিনি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সমসাময়িক সময়েই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৫৯২ সালে যখন বুবোনিক প্লেগ লন্ডনে প্রাদুর্ভাব বিস্তার করে তখন সংক্রমণ এড়াতে নাসি ইংরেজ পল্লীতে পালিয়ে যান। তখনই গৃহবন্দী অবস্থায় তিনি লিখে ফেলেন ‘সমারস লাস্ট অ্যান্ড টেস্টামেন্ট’। মরণভয়ের কারণে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে গিয়ে তিনি সেসময় উপলব্ধি করেন মানুষের জীবন ও মরণ নিয়ে। যা তার এই লেখায় প্রকাশ পেয়েছে-

 থমাস নাসে ছিলেন শেক্সপিয়ারের সমসাময়িক সময়ের একজন বিখ্যাত নাট্যকারপৃথিবীতে আমাদের সময় খুব অল্প,
তবুও মোহের পিছনে ছুটে চলা,
মৃত্যু সত্য, নয় নিছক ভাবনা,
এই সত্য থেকে নেই পালানোর উপায়;
আমি আজ অসুস্থ, একদিন মরেও যাব:
প্রভু, আমাদের দয়া করুন।

জিওভান্নি বোকাচ্চিয়ো

জিওভান্নি বোকাচ্চিয়ো বুবোনিক প্লেগে আক্রান্ত হন, কোয়ারেন্টাইনে ‘দ্য ডেকামেরন’ নামক বিখ্যাত উপন্যাস লিখেছিলেনফ্লোরেনটাইন লেখক এবং বিখ্যাত কবিজিওভান্নি বোকাচ্চিয়ো বুবোনিক প্লেগে আক্রান্ত হন। ১৩৪৮ সালে এটি ফ্লোরেন্সে আঘাত হানলে তার বাবা এবং সৎ মা উভয়ই এই রোগে সংক্রামিত হন। এসময় বাধ্য হয়েই নির্জন স্থানে কোয়ারেন্টাইনে চলে যান জিওভান্নি। এসময় তিনি তুস্কান পল্লীতে গৃহবন্দি হয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন। তবে তার সময়টুকু অবশ্য বিফলে যায়নি। এসময় ‘দ্য ডেকামেরন’ নামক একটি উপন্যাস লিখে ফেলেন তিনি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!