ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাতরং ]

সাহিত্যের বাইরে রবীন্দ্রনাথ : আধুলি দান করেছিল ছাত্রও

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩:০৯, ১২ ডিসেম্বর ২০২১
সাহিত্যের বাইরে রবীন্দ্রনাথ : আধুলি দান করেছিল ছাত্রও
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবি : সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধুই বাংলা সাহিত্যেরে একজন দিকপালই ছিলেন না, ছিলেন বাঙালি সমাজের মস্ত এক বিপ্লবের উদাহরণও। তার জীবনের বেশ কিছু কর্মকাণ্ড সেই সাক্ষ্য দিয়েছে বারবার। উনিশ থেকে বিশ শতকের দিকে অনেকগুলো বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন ঠিক অগ্রদূতের মতোই।

সে সময় কলকাতা শহরে কংগ্রেসের অধিবেশন বসেছে। দূরের সব শহর থেকে অনেকেই এসেছিলেন। তারকনাথ পালিতের বাড়িতে নেতাদের রাতের ভোজ অনুষ্ঠান হচ্ছে। পরস্পরকে সাধুবাদ দেওয়া ছাড়া আর সেরকম কোনো কর্মকাণ্ড রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখে পড়েনি। জোড়াসাঁকোর বাড়ি থেকে তাঁর সঙ্গে সেদিন নিমন্ত্রণে গিয়েছিল গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ।

ইংরেজি ধরনের এই ডিনার পার্টিতে চার মূর্তিমান বাঙালি দস্তুরে ধুতি ও চাদর পরে হাজির হয়েছিলেন। এরপর যখন নেতাদের বিনোদনের জন্য গান গাওয়ার প্রস্তাব এল, তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গেয়েছিলেন,
 

Advertisement

‘এসেছি কি হেথা যশের কাঙালি কথা গেঁথে গেঁথে নিতে করতালি
আমায় বোলো না গাইতে বোলো না।’

এরপর স্তব্ধতা নেমে এসেছিল কংগ্রেস অধিবেশনে।

এমন কাণ্ড কারখানা রবীন্দ্রনাথ একাধিকবার করেছেন। এমন স্মৃতি রয়েছে শিলাইদহেও। পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ঠাকুরবাড়ির মস্ত জমিদারি দেখতে গিয়ে প্রজাদের সঙ্গে এক আশ্চর্য সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয় রবীন্দ্রনাথের। অন্য জমিদারদের মতো প্রজাদের থেকে দূরে থাকতেন না রবীন্দ্রনাথ। রবী ঠাকুরের লেখায় যে সহজ সরল মানুষদের খুঁজে পাওয়া যায়,তার অনেকেই ছিলেন রবী ঠাকুরের প্রজা। প্রজাবৎসল জমিদার তাদেরকে নিজের রচিত সাহিত্যে অমর করে রেখেছেন।

বছরের প্রথম যেদিন জমিদারি কাছারিতে খাজনা জমা দেওয়া হয়, সেই দিন ছিল ‘পুণ্যাহ’। শিলাইদহে পূণ্যাহের সময় তিনদিন ধরে উৎসব চলত। জমিদারের সিংহাসনের সামনে জাত অনুসারে আলাদা আলাদা আসনে প্রজারা বসতেন। পুরোহিত তাদের কপালে ছুঁইয়ে দিতেন মঙ্গল চিহ্ন। প্রজারা নজরানা দিতেন আর জমিদার ফুল, শোলার মালা দিয়ে প্রজাদের সঙ্গে ভাববিনিময় করতেন। তিনদিন ধরে চলত প্রজাদের খাওয়ানো, উৎসব, যাত্রা। রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছিলেন পূণ্যাহের আসন পাতার মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। ধনী, দরিদ্র, ব্রাহ্মণ, শূদ্র, হিন্দু মুসলমান ইত্যাদি বর্ণ, সামাজিক অবস্থান হিসেবে আলাদা আলাদা বর্ণ। রবীন্দ্রনাথ এই দেখে পূণ্যাহের আসরে প্রবেশই করলেন না। সবাই বিচলিত হলেন। প্রায় বিদ্রোহ লেগে যাওয়ার উপক্রম। তবে, জমিদার রবীন্দ্রনাথের একটাই দাবি, সবার আসন হতে হবে একসাথে, জাতপাত ভুলে। অনেক কাণ্ডের পর একটা বড় জাজিমে সবাইকে একরকম ভাবে বসানো হলো। সেদিন জয় হল জমিদারের আধুনিক মনের। ঠাকুরবাড়ির জমিদারিতে তিনি নতুন আমল নিয়ে এসেছিলেন।

চোখের সামনে কোনো প্রাণীর হত্যা সহ্য করতে পারতেন না রবীন্দ্রনাথ। ছোটবেলায় একবার বাবার সঙ্গে হিমালয়ে যাওয়ার আগে শান্তিনিকেতন এসেছিলেন। সেখানে মহর্ষির পরিচালক হরিশ মালি তাঁকে শিকারে নিয়ে গিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনের থেকে মাইল দুয়েক দূরে চিফ সাহেবের বাগানবাড়িতে শিকারে গিয়ে প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন কিশোর রবী। হঠাৎ হরিশ মালির একটি খরগোশ শিকারের দৃশ্য তাকে মানসিকভাবে ব্যাথা দেয়। শিকার ভীতি তৈরি হয়। পরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের ভয় ভাঙানোর জন্য বাঘ শিকার দেখাতে নিয়ে যায়। সেই শিকারও রবীন্দ্রনাথের ভাবনার বদল ঘটাতে পারেনি। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেই রবীন্দ্রনাথই শিলাইদহের চরে পাখি মারা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। ছেলে রথীন্দ্রনাথকেও পাখি শিকারের জন্য যথেষ্ট বাধা দিতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রকমারি খেয়াল খুশিতে চলতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রথীন্দ্রনাথ স্মৃতিচারণে লিখেছেন, পাটকিলে রঙের বুড়ো ঘোড়া আর পালকি গাড়ির কথা। বিকেল হলে বুড়ো ঘোড়ার গাড়িতে করে দিব্যি রওনা হতেন বালিগঞ্জে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। বুড়ো ঘোড়া সময় নিলেও তাকে পরিত্যাগ করার কথা ভাবেননি রবীন্দ্রনাথ। বঙ্গভঙ্গের সময়, রবীন্দ্রনাথ খুব মেতেছিলেন সভা সমিতি নিয়ে। এদিকে নাটোরের মহারাজার মেয়ের বিয়ে। যেতেই হবে। সব সামলে দেরি করে পৌঁছলেন রবীন্দ্রনাথ। সেদিন মহারাজা বলেছিলেন, ‘কবি আমার কন্যাদায়। কোথায় আপনি সকাল সকাল আসবেন, তা না, আপনি দেরিতে এলেন!’ রবীন্দ্রনাথ সেদিন উত্তর দিয়েছিলেন,‘আমারও মাতৃদায়, দুই জায়গায় সভা করে আসতে হলো।’ সেদিন ঠাকুর বুঝিয়ে দিলেন দেশকে মা ভাবতেন রবীন্দ্রনাথ।

সারাজীবনের বিচিত্র কর্মকাণ্ড ও এমনসব দার্শনিক কথার টুকরো ছড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের জীবন সম্পর্কে টুকরো কথাও অত সহজ নয়। সৈয়দ মুজতবা আলির শান্তিনিকেতন স্মৃতিচারণে এক মজার ঘটনা রয়েছে। তাদের আমলে শান্তিনিকেতন আশ্রমের এক মারাঠি ছাত্র ছিলেন। নাম ছিল ভাণ্ডারে। শালবীথির একপ্রান্তে লাইব্রেরি ছিল আর অন্যপ্রান্তে রবীন্দ্রনাথ থাকতেন দেহলি বাড়িতে। কালো জোব্বা, মাথায় টুপি পরে রবীন্দ্রনাথ ঘর থেকে বেরিয়েছেন। কিশোর বয়সের ভাণ্ডারে তখন সদ্য কয়েকমিনিট হল আশ্রমে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে জোর করে তাকে একটা কিছু দিয়ে হাসিমুখে ফিরে এলেন। প্রণাম ট্রণাম কিছুই করলেন না। রবীন্দ্রনাথের হাতে সে কি গুঁজে দিয়ে এল, সেটা জানতে সবাই ঘিরে ধরল ভাণ্ডারেকে।

ভাণ্ডারে জবাবে জানাল, ‘ক্যা গুরুদেব গুরুদেব করতা হৈ। হম্ উসকো এক অঠন্নী দিয়া।’ পরে জানা গেল ভাণ্ডারের ঠাকুমা তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন সন্ন্যাসী দরবেশ দেখলে তাকে দান করতে। সবাই অনেক বলাতেও সে বিশ্বাস করল না, দরবেশকে নয়, রবীন্দ্রনাথকেই তিনি আধুলি দান করেছেন। এরপর ভাণ্ডারের  আশ্রমজীবন গড়িয়েছে নিজের মতো। ভাণ্ডারের দুষ্টুমিতে ছাত্র শিক্ষক সবাই অতিষ্ট।

জগদানন্দবাবুর মতো দুঁদে শিক্ষকও রবীন্দ্রনাথের কাছে ভাণ্ডারের নামে নালিশ করলেন। বিশ্বজয়ী রবীন্দ্রনাথ তখন যেন ছাত্রের কাছে স্নেহময় শিক্ষক। মজা করে বললেন, ‘যখন প্রথম এলি তখন কী রকম ভালো ছেলে ছিলি? মনে নেই, তুই দান-খয়রাত পর্যন্ত করতিস। আমাকে পর্যন্ত তুই একটা পুরো আধুলি দিয়েছিলিস। আজ পর্যন্ত কত ছাত্র এল গেল কেউ আমাকে একটি পয়সা পর্যন্ত দেয়নি। সেই আধুলিটি আমি কত যত্নে তুলে রেখেছি। দেখবি?’

রবীন্দ্রজীবন দূর থেকে দেখে বারবার বিস্ময়ে হতবাক হই। একটি মানুষ তার কত আলো। কত রং টুকরো কথায় মন ভরে না। যেন হালকা তুলির ছোঁয়ায় আবছা অবয়ব। রবী ঠাকুরের গল্প চলতে থাকুক মনে মনে। তাকে জানার কোনো শেষ নেই।

সূত্র
গ্রন্থঃ রবীন্দ্রস্মৃতি, বিশ্বনাথ দে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!