থার্মোমিটার আবিষ্কারের ইতিহাস
থার্মোমিটার হলো তাপমাত্রা নির্ণয়ের একটি বিশেষ যন্ত্র। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্ম বাধাগ্রস্ত হলে শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটে। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরা হয় ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শরীরের তাপমাত্রা ৯৯ বা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট হয়ে গেলে আমরা অনেক সময় খুব বিচলিত হয়ে পড়ি। শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তনটা রোগ নয়, বরং রোগের উপসর্গ। রোগের কারণ শনাক্ত করার জন্য ডাক্তাররা আগে দেখে নেন শরীরের তাপমাত্রার কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়েছে কিনা।
হাজার হাজার বছর আগে মানুষ তাপ ও তাপমাত্রা মাপার চেষ্টা শুরু করেছিল। আজ থেকে ১৮৫০ বছর আগে অর্থাৎ ১৭০ খ্রিস্টাব্দে গ্রিক বিজ্ঞানী গ্যালেন সর্বপ্রথম থার্মোমিটার তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তখন কারো তাপ কী, কেন তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটে ইত্যাদি মৌলিক বিষয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছিল না। তার পরের প্রায় দেড় হাজার বছরে তাপমাত্রা মাপার ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। ১৫৯৩ সাল পর্যন্ত স্পর্শের মাধ্যমে তাপমাত্রার তারতম্য নির্ণয় করা গেলেও তাপমাত্রার সঠিক পরিমাপের কোনো কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কার করা যায়নি।
গ্যালিলিও গ্যালিলি সেসময় তাপমাত্রা বাড়লে বাতাসের আয়তন বেড়ে যাবার ধর্মকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করলেন এক ধরনের বাতাস-ভর্তি থার্মোস্কোপ। এটা দিয়ে শুধুমাত্র বাতাসের তাপমাত্রার বাড়াকমা পর্যবেক্ষণ করা যায়। তবে তাপমাত্রার সঠিক পরিমাপ করা যায় না। আসলে তখনো তাপমাত্রার কোনো একক নির্ধারিত হয়নি। আরেকজন ইতালিয়ান বিজ্ঞানী সান্তোরিও সান্তোরিও ১৬১২ সালে থার্মোস্কোপের সঙ্গে একটি আনুপাতিক স্কেল যোগ করে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এর প্রায় চল্লিশ বছর পর ১৬৫৪ সালে ইতালির তাসকানির গ্রান্ড ডিউক দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ প্রথম একটি থার্মোমিটার তৈরি করেন। এর মূল গঠন ও কার্যপ্রণালী আধুনিক থার্মোমিটারের মতো।
.png)
তাপ দিলে অ্যালকোহলের আয়তন বেড়ে যায়। অ্যালকোহলের এই ধর্মকে কাজে লাগান সান্তোরিও। একটি কাচের চোঙের মধ্যে অ্যালকোহল রেখে তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে অ্যালকোহলের আয়তনের পরিবর্তনের হারকে তাপমাত্রা মাপার কাজে লাগান। তিনি অ্যালকোহলের চোঙায় ৫০টি সমান দাগ দিয়ে তাপমাত্রার এককের নাম দেন 'ডিগ্রি'। তবে কোনো নির্দিষ্ট তাপমাত্রার সঙ্গে এই ডিগ্রির সমন্বয় না থাকার কারণে ফার্দিনান্দের থার্মোমিটারে তাপমাত্রার পরিমাপ ছিল অনুমান নির্ভর।
এর দশ বছর পর ১৬৬৪ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক থার্মোমিটারে শূন্য ডিগ্রির প্রচলন শুরু করেন। যে তাপমাত্রায় পানি জমাট বেঁধে বরফে পরিণত হয় সেই তাপমাত্রাকে শূন্য ডিগ্রি ধরে নিয়ে তিনি থার্মোমিটারের অ্যালকোহলের আয়তনকে সমান ৫০০ ভাগে ভাগ করে শূন্য থেকে ৫০০ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থা করেন। তবে তখনো ডিগ্রি বলতে ঠিক কতটুকু তাপমাত্রা তা নির্দিষ্ট করে বের করা যায়নি।
১৭০১ সালে স্যার আইজ্যাক নিউটন একটি থার্মোমিটার তৈরি করেন। সেটি ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে আধুনিক এবং সার্থক থার্মোমিটার। তিনি কাচের সরু নলের মধ্যে কিছু তেল প্রবেশ করিয়ে নলের বাকি অংশ থেকে বাতাস বের করে নলটির দুই মাথা বন্ধ করে দেন। তারপর তিনি থার্মোমিটারের স্কেল তৈরি করেন। পানির জমাটাঙ্ককে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আর মানুষের শরীরের তাপমাত্রাকে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ধরে নিয়ে এই দুই তাপমাত্রার পার্থক্যকে অনেকগুলো ভাগে ভাগ করেন। এটিকে বলা যায় প্রথম সার্থক থার্মোমিটার।
১৭০২ সালে ডেনমার্কের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ওলে রোমার তাপমাত্রা নির্ণয়ের প্রথম স্কেল চালু করেন। এরপর এটি 'রোমার স্কেল' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। রোমার গলন্ত বরফের তাপমাত্রাকে ৭.৫ ডিগ্রি আর ফুটন্ত পানির তাপমাত্রাকে ৬০ ডিগ্রি ধরে তার থার্মোমিটার তৈরি করেন। ১৭১৪ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল গাব্রিয়েল ফারেনহাইট নতুন স্কেলের প্রবর্তন করেন। সেটিই আমরা গত ৩০০ বছর ধরে ব্যবহার করছি। আর সেটির নাম 'ফারেনহাইট স্কেল'।
ফারেনহাইট বরফ, লবণ ও পানির মিশ্রণের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি ফারেনহাইট ধরেন। পানির জমাটাঙ্কের তাপমাত্রা ধরেন ৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। আর পানির ফুটনাঙ্কের তাপমাত্রা ধরেন ২১২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। রোমারের স্কেলের এক ডিগ্রিকে প্রায় চার ভাগ করে ফারেনহাইট স্কেলের এক ডিগ্রি হিসেব করা হয়েছে। এই ফারেনহাইট স্কেল এখন আর তাপমাত্রা মাপার আন্তর্জাতিক স্কেল না হলেও আমেরিকায় এখনো ফারেনহাইট স্কেল ব্যবহৃত হয়।
আমরাও জ্বর মাপার জন্য এখনো ফারেনহাইট স্কেল ব্যবহার করছি। বিজ্ঞানী ফারেনহাইট সর্বপ্রথম থার্মোমিটারে পারদ ব্যবহার করেন। পারদ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে। তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনে পারদের আয়তনের পরিবর্তন ঘটে। তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতার কারণে কাচের নলের ভেতর দিয়ে পারদের ওঠানামা পরিষ্কারভাবে দেখা যায় বলে থার্মোমিটারের জন্য পারদ খুবই উপযোগী।
তবে ফারেনহাইট স্কেল ব্যবহারকারীদের জন্য পারদ খুব একটা সহজবোধ্য নয়। আবার খুব একটা যুক্তিগ্রাহ্যও নয়। ১৭৪২ সালে সুইডেনের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস ফারেনহাইটের স্কেলকে সহজ করার ব্যবস্থা করেন। তিনি পানির জমাটাঙ্ককে ১০০ ডিগ্রি এবং ফুটনাঙ্ককে শূন্য ডিগ্রি ধরে একটি স্কেল চালু করলেন।
এই সেলসিয়াস স্কেল ঠিক সহজ হলেও কেমন যেন উল্টো মনে হলো সবার কাছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিগ্রির পরিমাণ বাড়া উচিত। সেলসিয়াস তার স্কেলের ভুল সংশোধন করার আগেই মাত্র ৪৩ বছর বয়সে ১৭৪৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। সেলসিয়াসের মৃত্যুর পর উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস সেলসিয়াস স্কেলের ভুল সংশোধন করে দেন।
নতুন স্কেলে শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি জমে বরফ হয়ে যায়। আর ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি ফুটতে শুরু করে। তখন এটিকে 'ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড' বলা হতো। তবে কোণের পরিমাণও ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হিসেবে মাপা হয় বলে ১৯৪৭ সালে তাপমাত্রা মাপার একককে 'ডিগ্রি সেলসিয়াস' হিসেবে প্রচলন করা হয়।
উনবিংশ শতাব্দীতে পদার্থবিজ্ঞানের অনেক উন্নতি ঘটে। বিজ্ঞানীরা গ্যাসের আয়তনের উপর তাপ ও চাপের প্রভাব এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজে বের করতে সক্ষম হন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস জুল তাপগতিবিদ্যার আলোকে তাপমাত্রার আধুনিক সংজ্ঞা দেন। তাপমাত্রা হলো পদার্থের মধ্যস্থিত কণাগুলোর গড় গতিশক্তির পরিমাপ। কণাগুলোর গতিশক্তি যত বেশি, তার তাপমাত্রাও তত বেশি।
অর্থাৎ বস্তু তাপ শোষণ করে গরম হওয়ার অর্থ হলো বস্তুর কণাগুলোর গতি বেড়ে যাওয়া। আবার ঠান্ডা হওয়ার অর্থ হলো কণাগুলোর গতি কমে যাওয়া। যেমন পানি স্বাভাবিক তাপমাত্রায় তরল। পানিকে ঠান্ডা করতে থাকলে পানির অভ্যন্তরীণ কণাগুলোর গতি ক্রমশ কমে যায় এবং পানি জমে বরফ হয়ে যায়। আবার যখন অনেক বেশি গরম করা হয়, তখন কণাগুলোর গতি বেড়ে জলীয় বাষ্প হয়ে গ্যাসে পরিণত হয়।
১৮৬২ সালে স্কটিশ পদার্থবিজ্ঞানী উইলিয়াম থমসন, ১ম ব্যারন কেলভিন 'পরম শূন্য' তাপমাত্রার ধারণা দেন। তিনি দেখান যে, -২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পদার্থের কণাগুলোর গতি একেবারে থেমে যায়। গতিশক্তি শূন্য হয়ে যাওয়ার কারণে তখন পদার্থের চাপও শূন্য হয়ে যায়। এই তাপমাত্রাকে পরম শূন্য তাপমাত্রা ধরে তাপমাত্রার নতুন একটি স্কেল চালু হয়। যা 'কেলভিন স্কেল' নামে পরিচিত। পরম শূন্য তাপমাত্রাকে শূন্য ডিগ্রি কেলভিন ধরা হয়। এই তাপমাত্রায় পদার্থের তাপ, চাপ, পারমাণবিক গতি সব শূন্য হয়ে যায়।
সাধারণ পারদ থার্মোমিটার দিয়ে আমরা শরীরের তাপমাত্রা মাপি। কিন্তু পারদ থার্মোমিটার ব্যবহারে অনেক বিপদও আছে। মুখের ভেতর থার্মোমিটার ঢুকিয়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করার সময় যদি থার্মোমিটার ভেঙে যায় তবে খুব বড় বিপদ হতে পারে। তাই আস্তে আস্তে থার্মোমিটারের অনেক বিবর্তন ঘটেছে।
বর্তমানে প্রায় সব জায়গায়ই ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার করা হচ্ছে। ডিজিটাল থার্মোমিটারে কোনো পারদ থাকে না। তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পদার্থের রেজিস্ট্যান্সের পরিবর্তন ঘটে। ডিজিটাল থার্মোমিটারে রেজিস্ট্যান্সের পরিবর্তনে বিদ্যুৎ প্রবাহের যে পরিবর্তন ঘটে তার মাধ্যমে তাপমাত্রার পরিমাণ করা হয়।
আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় ডিজিটাল থার্মোমিটার ছাড়াও ইনফ্রারেড বা অবলোহিত থার্মোমিটার ব্যবহৃত হয়। ছোট শিশুদের তাপমাত্রা সহজে নির্ণয় করার জন্য এই থার্মোমিটার খুব উপযোগী। কানের ছিদ্রে এই থার্মোমিটার প্রবেশ করিয়ে শরীরের তাপমাত্রা মাপা যায়। আবার কপালে স্পর্শ করিয়েও তাপমাত্রা মাপা যায়।
উত্তপ্ত বস্তু তাপ বিকিরণ করে। আমাদের শরীরে তাপ আছে এবং তা বিকিরণ হচ্ছে। ইনফ্রারেড থার্মোমিটার শরীরের বিকিরণ নির্ধারণ করে। এই বিকিরণের মাত্রা ডিজিটাল সিগন্যালে পরিণত হয় এবং এই সিগন্যাল উপযুক্ত ইলেকট্রনিক্সের মাধ্যমে তাপমাত্রায় রূপান্তরিত হয়। যেখানে পারদ থার্মোমিটারে তাপমাত্রা মাপতে এক মিনিট সময় লাগে, সেখানে মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপা যায়।
ইনফ্রারেড থার্মোমিটারের সাহায্যে মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনও নির্ধারণ করা যায়। অদূর ভবিষ্যতে তাপমাত্রার পরিবর্তন লক্ষ্য করে আমাদের কোষের সামান্য অস্বাভাবিক পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা যাবে। বিজ্ঞানের কল্যাণে সুস্থ থাকা আরো অনেক বেশি সহজ হয়ে যাবে।