ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাতরং ]

যুগে যুগে যুদ্ধের সাক্ষী হয়েছে যেসব ক্ষুরধার তরোয়ার

সাতরং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬:১০, ২৯ মে ২০২২
যুগে যুগে যুদ্ধের সাক্ষী হয়েছে যেসব ক্ষুরধার তরোয়ার
তরোয়ার। ছবি: প্রতীকী

সেই প্রাচীনকাল থেকেই ধারালো তরোয়ার ও ছুরি ব্যবহার হয়েছে নানা যুদ্ধ-বিগ্রহে। তরোয়ার ছিল রাজা-বাদশা খুব পছন্দের একটি দব্য। সেকেলে যোদ্ধাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল তরোয়ার। যুগে যুগে দেশে দেশান্তরের কামারশালার বানানো এ সমস্ত ক্ষুরধার ব্লেড রাজা, সেনাপতি আর যোদ্ধাদের মনে স্বপ্ন ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। 

এমনই কিছু ধারালো অস্ত্র রয়েছে, যা পৃথিবীর বুকে ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। এই ধারালো অস্ত্রগুলো কয়েকটা উদাহরণ তুলে ধরা হলো আজকের লেখায়। 

Advertisement

খোপেশ

ব্রোঞ্জ যুগের প্রথম দিকের তরোয়ারগুলোর মধ্যে অন্যতম খোপেশ। প্রাচীন মিসরীয় কাস্তে আকৃতির অস্ত্র খোপেশ। এ অস্ত্র মিসরে জন্ম নিলেও ব্যাপ্তি ছড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত। অবশ্য ভারত ভূখণ্ডে এর দেখা মেলেনি। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন বিশ্বজুড়ে মাথা চাড়া দিচ্ছে, তখন এই ধারালো অস্ত্র ফারাওদের সেনাবাহিনীকে সুসজ্জিত করে।

খোপেশ। ছবি: সংগৃহীত
তখনকার শিল্পীরা খোপেশে কারুকার্য করে ফারাওদের পিরামিড সাজাত। তুতেন খামেনের পিরামিডে দুটো দুই আকারের খোপেশ পাওয়া গেছে। এগুলো ‘সিঙ্গল পিস’ ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি। এর প্রথম অংশ বা হাতলের অংশটি কালো রঙের, আর দ্বিতীয় অংশটি হাতলের ওপরে— তাতে একটা পদ্মফুল খোদাই করা। তৃতীয় অংশ কাস্তের আকারে বাঁকানো। পরবর্তীতে আরো ভালো ধাতুবিদ্যা আর অস্ত্র তৈরির কৌশল আবিষ্কার হলে খোপেশকে স্বাভাবিকভাবেই রাস্তা ছেড়ে দিতে হয়। তবুও ইতিহাস একে মনে রেখেছে সভ্যতার শুরুর দিনে তার অনবদ্য অবদানের জন্য।

ফালকাটা

ফালকাটা হচ্ছে লম্বায় দুই ফুট একটি তরোয়ার। প্রাচীন স্পেনে সেল্টবেরিয়ান যোদ্ধারা এই ছুরি ব্যবহার করত। ধাতুবিদ্যা উন্নত হওয়ার ফলে স্টিল বা লোহা নিয়ে চলতে থাকা নিরীক্ষার প্রাথমিক ফল এই অস্ত্র। হাতলের কাছে একদিকে ধার, কিন্তু মাথার দিকে দুদিকে ধারালো হয়ে থাকে ফালকাটা। একটু বাঁকা এই তরোয়ার একসঙ্গে কুঠারের চিরে দেওয়া, আর ধারালো তরোয়ারের কেটে ফেলার কাজ করত।

আরো পড়ুন : মানুষের রক্তে লেখা শয়তানের বই, কী আছে এতে?

ফালকাটা ছিল কার্থেজের সেনাপতি হ্যানিবলের প্রিয় অস্ত্র। তিনি রোমের বিরুদ্ধে পিউনিক যুদ্ধ চলাকালে আফ্রিকান সেনাদের এই অস্ত্রে সজ্জিত করেছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, হাতাহাতি যুদ্ধে তরোয়ারটির কার্যকারিতা হানিবল সেনার রোমানদের বিরুদ্ধে জয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

বোলো ছুরি

‘বোলো’ মূলত ঘাস, বাঁশ বা ফসল কাটার কাজে ব্যবহৃত ফিলিপাইনের একটি ‘মাল্টিপারপাস’ অস্ত্র। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিপ্লবীদের হাতে এটি যুদ্ধের এক দুর্দান্ত অস্ত্রে পরিণত হয়।

১৮৯৬ সালে ফিলিপাইন বিপ্লব, স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ, আর ফিলিপাইন-আমেরিকান যুদ্ধে ফিলিপাইনের দেশীয় গেরিলারা মূল অস্ত্র হিসেবে এ বোলোকে ব্যবহার করে। গেরিলা যুদ্ধে রাইফেল-গুলি ফুরিয়ে গেলেও এই ‘বোলোমেন’ প্রায়ই তাদের ছুরি নিয়ে যুদ্ধের মাঠে হারজিতের লড়াইয়ে মারাত্মক প্রভাব ফেলত।

বোলো ছুরি। ছবি: সংগৃহীত

এক আমেরিকান সেনা লিখেছেন, ‘তারা মানুষের জীবন নেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ এবং গর্বিত। তাদের গর্বের কারণ হলো এক কোপে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করা!’ এই ভয়ংকর ব্লেড পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আবার অ্যাকশনে এসেছিল। বর্তমানে ফিলিপিনো মার্শাল আর্টে এটি একটি সাধারণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়।

উলফবার্ট

উলফবার্ট হচ্ছে ভাইকিং তরোয়ার। অষ্টম শতাব্দীর শুরু থেকে ভাইকিং নৌ-যোদ্ধারা ইউরোপের সমুদ্র উপকূলীয় জনবসতিতে তাদের বর্বর আক্রমণ চালিয়ে সমগ্র এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায়।

পৃথিবীতে ১৭০টি প্রাচীন উলফবার্ট তরোয়ার পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে ৪৪টি নরওয়ে, আর ৩১টি ফিনল্যান্ড থেকে পাওয়া গেছে। পাগান সভ্যতার রীতি অনুযায়ী এগুলো বেশিরভাগ কবরস্থান থেকে পাওয়া। এ ছাড়া কিছু ইংল্যান্ডের মরা নদীর বুঁজে যাওয়া খাত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

আরো পড়ুন : একে একে পাঁচ ভাইকে বিয়ে তরুণীর, রাত কাটে ভিন্ন নিয়মে

উদ্ধার করা প্রতিটি তরোয়ারের হাতলে লেড বা দস্তার কাজ করা, আর এর ধারালো ব্লেডের অংশ হাই কার্বন স্টিল দিয়ে তৈরি। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের আগে কীভাবে এই উন্নত স্টিল এল, সেটাও একটা জিজ্ঞাসার বিষয়। অবশ্য কেউ বলেন, জার্মানির এক খনি থেকে, আবার কেউ বলেন আরব-পারস্য থেকে রপ্তানি করা হয়েছিল এই উন্নত স্টিল। তবে যেখান থেকেই আসুক, এই তরোয়ার কয়েকশ বছর পৃথিবীর একটা বিশাল অংশের মেরুদণ্ড দিয়ে শিরশিরে হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল।

কাতানা

জাপানের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের আইকোনিক অস্ত্র এটি। কয়েক শতাব্দী ধরে এই বাঁকা, এক ধারযুক্ত ব্লেডগুলো সামুরাই যোদ্ধাদের পছন্দের অস্ত্র ছিল। জাপানের বীর যোদ্ধারা তাদের রাজাদের দেশ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেছিল এই তরোয়ার দিয়ে। ৮০০ বছর আগে সেরা সামুরাই তার কাতানা তরোয়ারের হালকা-ক্ষিপ্র আঘাতে শত্রুর মুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা করার দক্ষতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল।

কাতানা। ছবি: সংগৃহীত

কিংবদন্তি ‘হোনজো মাসামুনে’কে শ্রেষ্ঠ কাতানা তরোয়ার বলে মনে করা হয়। সম্ভবত ১৩ শতকে এর সৃষ্টি। এরপর অনেক বীরের হাত ঘুরে এই তরোয়ার ১৬ শতকে বীর যোদ্ধা হনজো শিগেনাগার হাতে আসে। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে অদৃশ্য হয়ে যায়। সম্ভবত কোনো আমেরিকান সেনা অফিসার এটিকে চুরি করে নিয়ে যায় বা নষ্ট করে ফেলে। প্রচুর অনুসন্ধান করেও জাপানের এই মূল্যবান জাতীয় নিদর্শনটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বুয়ি নাইফ

জিম বুয়ি এক আমেরিকান-ইউরোপিয়ান দাস ব্যবসায়ী এবং মারপিটের জন্য বিখ্যাত মানুষ। তার নামে এই চাকুও বিখ্যাত। জিম বুয়ি এ ধরনের একটা চাকু দিয়েই ডুয়েল বা হাতাহাতি লড়াইয় জেতেন।

‘বুয়ি নাইফ’ খবরের কাগজ আর বিজ্ঞাপনের দৌলতে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠে। আসলে এটা ‘বুচার নাইফ’ বা আমাদের কসাইদের হাতে যেমন ছুরি দেখি, সেই জিনিস। তবে এর একটি ‘স্পেশাল ডিজাইন’ বুয়ি নিজে এক কামারশালায় অর্ডার দিয়ে বানিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, সেখান থেকেই এই নাম।

আরো পড়ুন : শেষমেশ কী হয়েছিল লায়লা-মজনুর?

টেক্সাস দখল করতে আমেরিকানরা যে যুদ্ধ করে, তাতে এই চাকুর বহুল ব্যবহার হয়। বুয়ি নিজেও টেক্সাস রেভ্যুলিউশনে যোগ দেন এবং নিহত হন। এরপরও ম্যাক্সিকান যুদ্ধ, ক্যালিফোর্নিয়ার সোনার খোঁজে ‘গোল্ডরাশ’, কানসাসে জনযুদ্ধ, পরে আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে ঝামেলা—এসবেও বুয়ি নাইফ কাজে লাগে। মজার ব্যাপার হলো, আব্রাহাম লিঙ্কনকে হত্যা করার সময় হত্যাকারী জন উইলকিস বুথ পালানোর সময় একটা বুয়ি নাইফ ফেলে পালিয়েছিল। পিস্তল বা রিভলবার সহজলভ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত এ চাকু ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।

খুকরি

যুদ্ধের ইতিহাসে নেপালের এক ঐতিহ্যবাহী গোর্খা সেনা হাতিয়ার খুকরি। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে ইউরোপীয়রা প্রথম ছোট্ট, একটু বাঁকা খুকরির প্রেমে পড়ে। এক যুদ্ধে নেপালি যোদ্ধাদের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্য বাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তখন নেপালিদের খুকরি চালানোর দক্ষতা দেখে ব্রিটিশ কমান্ডার অকটারলোনি গোর্খাদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ইউনিটে পরিণত করেন।

খুকরি। ছবি: সংগৃহীত

খুকরি বর্তমান ব্রিটিশ ও ভারতীয় আর্মিতে ‘স্ট্যান্ডার্ড ইস্যু’ অস্ত্র হিসেবে গোর্খাদের দেওয়া হয়। রয়্যাল গোর্খা বা ভারতীয় গোর্খা রেজিমেন্টের লোগো এই খুকরি। 

জাইফোস (ক্ষিপোস)

এটি দুদিকে ধারালো গ্রিক তরোয়ার। দৈর্ঘ্য দেড় থেকে দুই ফুট, সোজা, ওজন এক কেজির কম। আলেক্সান্ডার তার ম্যাসিডনের আর্মি নিয়ে সারা মধ্যপ্রাচ্য লুট করে ভারত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন এই তরোয়ার হাতে নিয়েই। আসলে গ্রিকদের কাছে এটা ছিল সাহায্যকারী অস্ত্র। 

স্পিয়ার বা বল্লম ওদের প্রধান অস্ত্র ছিল। কিন্তু কোনোভাবে বল্লম ভেঙে গেলে বা হাত থেকে ছিটকে গেলে, তখন কোমরে ঝোলানো জাইফোস বের করে, হা রে! রে! রে! করে শত্রুর ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ত তারা।

আরো পড়ুন : পঙ্গু স্ত্রীর ইচ্ছেপূরণে রিকশা আবিষ্কার, যেভাবে এলো ঢাকায়

এই অস্ত্র ব্রোঞ্জ যুগের ডিজাইন। মাঝখানটা মোটা আর দুই ধার সরু। ভারতীয় যুদ্ধ শাস্ত্রে এ ধরনের অস্ত্র দেখা যায় না। এর কারণ হয়তো ভারতবর্ষের উন্নত ধাতুবিদ্যা। অবশ্য এখানকার খড়গ বা খাঁড়া দেখতে অনেকটা এর কাছাকাছি। 

স্পার্টার যোদ্ধারা যে গ্লডিয়াস ব্যবহার করত, তা এরই বিবর্তিত রূপ! যে কয়েকটি জাইফোস উদ্ধার হয়েছে, তা প্রায় সবই কবরখানা থেকে। তার মানে যোদ্ধাদের সমাধিতে জাইফোস রাখা হতো।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!