২০১৭ সালের অক্টোবরে আচমকাই গায়েব হয়ে যান তিনি। তার পর থেকে হন্যে হয়ে খুঁজেও তাকে ধরতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে এফবিআইয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড ১০ জন অপরাধীর তালিকায় ঢুকে পড়েছেন তিনি।
কে এই ‘ক্রিপ্টোকুইন’?
.png)
এফবিআইয়ের খাতায় ‘ক্রিপ্টোকুইন’ নামে পরিচিত এই মহিলার পোশাকি নাম রুজা ইগনাতোভা। বুলগেরিয়ার পাশাপাশি জার্মানিরও নাগরিক রুজার বিরুদ্ধে কোটি কোটি ডলার ‘লুট’ করার অভিযোগ তুলেছে এফবিআই।
৪২ বছরের রুজার জন্ম হয়েছিল বুলগেরিয়ার সোফিয়ায়। তবে ১০ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে জার্মানির স্রামবার্গ শহরে চলে যান তিনি। সেখানেই বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা করা। গোয়েন্দাদের দাবি, আর পাঁচটা ঝানু অপরাধীর মতো নন রুজা। বরং তিনি উচ্চশিক্ষিত। আইনের মারপ্যাঁচ সম্পর্কেও যথেষ্ট অভিজ্ঞ।
এক সময়ে উরসুলায় একটি সালোঁতে বিনিয়োগও করেছিলেন রুজা। সেটা ছিল ২০১১ সালে নভেম্বর। রুজার অপরাধের কাহিনি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০১২ সালে। সঙ্গে ছিলেন তার বাবা প্লামেন ইগনাতোভও। সে বছর জার্মানির একটি সংস্থার অধিগ্রহণের মামলায় প্রতারণার অভিযোগে দু’জনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। ওই মামলায় ১৪ মাসের কারাবন্দি ছিলেন রুজা।

জেলে থাকাকালীনই সম্ভবত অপরাধজগতে পাকাপাকিভাবে প্রবেশ করে ফেলেছিলেন রুজা। ২০১৩ সালে বিটকয়েন নামে একটি ক্রিপ্টোকারেন্সির মার্কেটিং সংক্রান্ত প্রতারণায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
কী কারণে এত আলোচনায়
এফবিআইয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় গোয়েন্দাদের নজরে রয়েছেন রুজা। মে মাসে তাকে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত করে ইউরোপোল। সঙ্গে গ্রেফতারিতে সাহায্য হয়, এমন তথ্য দিতে পারলে চার লাখ ডলারেরও বেশি পুরস্কারমূল্যের ঘোষণা করে। তবে ইউরোপ হোক বা আমেরিকা, কোনো দেশের গোয়েন্দারাই রুজাকে পাকড়াও করতে পারেননি। তার সম্পর্কে কেউ কোনো তথ্য দিতে পারলে এক লাখ ডলারের পুরস্কারও ঘোষণা করেছে এফবিআই।
এফবিআই-র দাবি, ২০০৫ সালে জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট ইন্টারন্যাশনাল ল’ নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন রুজা। যদিও অনেকের দাবি, অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে তার। উচ্চশিক্ষা শেষে ম্যাকিনসে-র মতো বহুজাতিক সংস্থায় নাকি চাকরিও করেছেন।
এফবিআইয়ের দাবি, ২০১৪ সাল থেকে লোকঠকানোর ব্যবসা ও জি স্কিমের কারবারে ঢুকে পড়েন রুজা। সে বছরের অক্টোবরে ওয়ানকয়েন নামে ক্রিপ্টোকারেন্সির শুরু করেন বলে অভিযোগ। গোয়েন্দাদের দাবি, বিশ্ব জুড়ে সে কারবারের জাল ছড়াতে ইউটিউব-সহ একাধিক মাধ্যমের সাহায্য নিয়েছিলেন রুজা। ওয়ানকয়েনে বিনিয়োগ করলে প্রচুর মুনাফা হবে বলেও চাউর করতে থাকেন রুজা। বিনিয়োগকারীরা যত লোককে এই ক্রিপ্টোকারেন্সি সংস্থায় টেনে আনতে পারবেন, তাদের তত লাভ হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি।
এফবিআইয়ের মতে, ওয়ানকয়েন নামের ক্রিপ্টোকারেন্সির (ইন্টারনেটের মাধ্যমে লেনদেনের ডিজিটাল মুদ্রা) আসলে শেয়ারবাজারে কোনো মূল্যই ছিল না। এমনকি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্লকচেইন নামে যে আন্তর্জাল ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ হয় এবং যার মাধ্যমে গেলে বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকে, সেই সুরক্ষাও ছিল না ওয়ানকয়েনের।
২০১৪ সালের অর্থবর্ষের চতুর্থ ত্রৈমাসিক থেকে ২০১৬ সালে তৃতীয় ত্রৈমাসিকের মধ্যে ওয়ানকয়েন ৩৭৮ কোটি ডলারের মুনাফা করেছিল বলে দাবি এফবিআইয়ের আইনজীবীদের। বিশ্বজুড়ে ৩০ লাখ বিনিয়োগকারীকে শুধুমাত্র মোটা অঙ্কের কমিশনের লোভ দেখিয়ে তার ভুয়া সংস্থায় টেনে এনেছিলেন রুজা।
বিশ্ব জুড়ে রুজার নাম ছড়িয়ে পড়ে ২০১৯ সালে। সে বছর বিবিসি-র তদন্তমূলক পডকাস্টে জায়গা করে নেন তিনি। ‘মিসিং ক্রিপ্টোকুইন’ নামে ওই পডকাস্টটির সাংবাদিক জেমি বার্টলেট দীর্ঘ দিন ধরে রুজার বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছেন।