এলিয়েন দ্বীপ সুকাত্রা
আরব সাগরের মাঝে এমন এক দ্বীপ রয়েছে যেখানে এলিয়েনদের দেখা না মিললেও ভৌগলিক পরিবেশ এবং গাছপালার ভিন্নতার কারণে একে এলিয়েন দ্বীপ বলা হয়। অদ্ভূত এবং অপার্থিব সুকাত্রা দ্বীপের আদ্যোপন্ত জেনে নিতে পারবেন এই লেখায়।
পৃথিবীর অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে মিল নেই এই দ্বীপের। যেমন অদ্ভূত চেহারার গাছপালা এখানে, তেমনি অদ্ভূত এখানকার পশুপাখি। এই দ্বীপকে ভীনগ্রহের কোন জায়গা বললেও ভুল হবে না!
.png)
আরব সাগরের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুকাত্রা দ্বীপ। যদিও সুকাত্রাকে শুধু দ্বীপ বললে ভুল হবে। এটি চারটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এদের মধ্যে সুকাত্রা সব থেকে বড়। বাকী তিনটি হলো, আব্দ আল কুরি, দার্সা এবং সামহা। ৩,৭৯৬ বর্গ কিলোমিটার ভূমি বিশিষ্ট এ দ্বীপপুঞ্জ দৈর্ঘ্যে ১৩২ কিলোমিটার এবং প্রস্থে ৫০ কিলোমিটার। প্রদেশটির রাজধানীর নাম হাদিবু।
রাজনৈতিকভাবে দ্বীপটি ইয়েমেনের অংশ। কিন্তু সুকাত্রাসহ অন্য দ্বীপগুলো ভৌগলিকভাবে আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। যে কারণে ইযেমেন দেশটি দুটি মহাদেশের মধ্যে অবস্থিত একটি দেশ হিসেবে গণ্য হয়। ২০০৮সালে ইউনেষ্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে সুকাত্রা দ্বীপকে।
এই দ্বীপ এক সময় গণ্ডোয়ানা নামের সুপার কন্টিনেন্টের অংশ ছিল। কয়েকটি প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যিক রুটের পাশে অবস্থিত হওয়াই এই দ্বীপের গুরুত্ব অনেক বেশি। ২০১৩সালে সুকাত্রাকে একটি প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে ইয়েমেন।
সুকাত্রার রাজধানীর নাম হাদিবু। এটি এই অঞ্চলের সব চেয়ে বড় শহর। বর্তমান এই দ্বীপে প্রায় ৬০হাজার মানুষের বসবাস। সুকাত্রা দ্বীপের নামকরণ নিয়ে কিছুটা বিতর্ক আছে। গবেষকদের মতে, সুকাত্রা শব্দটি গ্রীক শব্দ থেকে যা একটি প্রাচীন আরবি ভাষা থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
কেউ কেউ মনে করেন এটি গ্রীক শব্দ নয় বরং সংস্কৃত শব্দ সুখাদ্রা থেকে এর উৎপত্তি। যার অর্থ সুখ প্রদান কারক। এই দ্বীপে ১৭লাখ বছর আগের মানুষের হাড়-অস্থমজ্জা খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্বিকরা। প্রাচীন যুগে এই দ্বীপটি ব্যাবসা বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। এই দ্বীপ থেকে প্রাপ্ত প্রস্থরখন্ডের বেশিরভাগ লেখায় ভারতীয় ব্রাক্ষীলিপিতে রচিত।
এই দ্বীপের গড় তাপমাত্রা ২০ডিগ্রী সেলসিয়াস। এখানে বছরের খুব কম পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়। তা কোন নির্দিষ্ট সময় না হয়ে বছর জুড়েই হয়ে থাকে। সুকাত্রা দ্বীপে ৮২৫ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে ৩০৭টি প্রজাতিই স্থানীয়, অর্থাৎ প্রায় ৩৭ শতাংশ উদ্ভিদ পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখতে পাওয়া যাবে না।
ড্রাগন ব্লাক ট্রি-এই দ্বীপের অদ্ভূত গাছগুলোর একটি। দূর থেকে দেখলে বিশাল আকৃতির ব্যাঙের ছাতা মনে হবে। দ্বীপের শুকনো মাটিতে জন্মানো এই গাছটি বত্রিশ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। গাছের কাণ্ড উপরের দিকে বৃদ্ধি পেতে পেতে অসংখ্য ডালপালায় ভাগ হযে যায়। এই গাছের ছাল থেকে লাল আঁঠা বের হয়, কথিত আছে বহুকাল আগে ড্রাগনের রক্ত থেকে এই গাছের উৎপত্তি হয়েছিল। এই গাছের আঠা রং তৈরি আর বার্নিশের কাছে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীনকালে এই গাছে আঠা ওষুধ এবং প্রসাধনী হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। বছরে একবার এই গাছে ফুল ফোটে উপযুক্ত পরিবেশে এই গাছ বেঁচে থাকতে পারে কয়েকশো বছর।
আরেকটি বিশেষ উদ্ভিদ হলো ডেন্ড্রোসসিয়াস নামক এক প্রকারের শশা গাছ। বিভিন্ন আকৃতির কাণ্ডটি লম্বা হয়ে চূড়া তৈরি করে, যেখানে হলুদ, গোলাপী ফুল ফোটে। উভলিঙ্গ এই গাছের জন্ম এই দ্বীপের বয়সের দ্বিগুণ আগে বলে গবেষকদের ধারণা। ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এদের বংশবিস্তারের অনুকূল।

এছাড়াও রয়েছে পোমেগ্র্যানেট নামক ফুলেল উদ্ভিদ। এটি আড়াই থেকে চার ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে সাধারণত ফুল এবং ফল হয়। ফুলগুলো সাধারণত গোলাপি বা লালের কাছাকাছি রঙের হয় আর ফল পাকলে তা হলদে-সবুজ রঙ ধারণ করে। এই গাছের কাঠ খুব শক্ত হয় এবং ছোটখাট আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহৃতও হয়। এই গাছটি সুকাত্রার বিশেষ উদ্ভিদ হলেও হাওয়াইতে এর চাষের চেষ্টা চলছে।
এই দ্বীপটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পরিবেশে বিপর্যয় ঘটলে দ্বীপের অনেক উদ্ভিত বিলুপ্ত হয়ে যাবার আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা। মানুষের বসবাস শুরু হওয়ায় গৃহপালিত পশুপাখি পালন বেড়েছে, এতে স্থানীয় প্রাণী ও উদ্ভিদ পড়েছে হুমকির মুখে। মোট ৩১ প্রজাতির প্রাণির দেখা মিলবে এই দ্বীপে, যার ৯৪ শতাংশ অর্থাৎ ২৯টি প্রজাতিই স্থানীয়। স্কিংস, পা-বিহীন টিকটিকি, নানা প্রকারের মাকড়শা এবং তিন প্রকারের বিশুদ্ধ পানির কাঁকড়ার দেখা মেলে এ দ্বীপে।
প্রথম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত দ্বীপটিতে স্থানীয় ধর্ম প্রচলিত ছিল। তারপর এখানে খিষ্টান ধর্মের প্রচার ঘটে। বর্তমানে এই দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম।
১৯৯৯সালে এই দ্বীপে একটি বিমানবন্দর স্থাপন হয়। এর আগ পর্যন্ত কার্গো জাহাজ ছাড়া দ্বীপে পৌঁছানোর আর কোনো মাধ্যম ছিল না। বর্তমানে বিমানযোগে যাওয়া যায়। তবে দ্বীপটিতে যাওয়ার আদর্শ সময় অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস। বছরের অন্যান্য সময়ে ভারি বৃষ্টির কারণে ভ্রমণ বিঘ্নিত হবে।
সুকাত্রা বিমানবন্দরটি এর প্রধান শহর থেকে ১২ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। পর্যটকদের জন্য এখানে কয়েকটি গেস্ট হাউজ আছে তবে উন্নতমানের হোটেল নেই। এই এলাকার বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেমের কারণে সুকাত্রার অভ্যন্তরে গণপরিবহনের পরিমাণ খুবই কম। পায়ে হেঁটে দ্বীপটি ঘুরে দেখা সব থেকে উত্তম, এতে কোন সন্দেহ নেই।