২০১৭সালে ইউনেষ্কো অভিযোগ তুলেছিলো, গ্রেট ব্যরিয়ার রিফ বিপদাপন্ন। ২০১৮সালে প্রবাল প্রাচীরটি রক্ষায় ৩৭ কোটি নব্বই লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া সরকার। ২০২১সালে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফকে বিপদাপন্ন ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছিলো সংস্থাটি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কূটনৈতিক চাপে তা ভেস্তে যায়। ২০২২ সালে এসে বিপর্যয় আদৌ সামাল দেওয়া যাবে কিনা, সেই হিসাব কষতে বসেছেন বিজ্ঞানীরা।

.png)
২৯০০ এর বেশি একক রিফের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। কোরাল বা প্রবাল হচ্ছে এক ধরণের সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডি প্রাণী। একই রকম রকম বৈশিষ্ট্য যুক্ত অসংখ্য পলিপ যুক্ত হয়ে গড়ে ওঠে প্রবালের কলোনি। মাত্র কয়েক মিলিমিটার ব্যাসের এই পলিপগুলো কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা হয়। সমুদ্র উপকূলের পাথর কিংবা ভূখণ্ডকে আকরে থাকা এসব পলিপের শরীর থেকে নিঃসৃত হয় ক্যালসিয়াম কার্বোনেট। যা জমাট বেঁধে এদের শরীরের বাইরে তৈরি হয় কঠিন বহিঃকঙ্কাল।
এভাবে পলিপের বহিঃকঙ্কালগুলো পরষ্পরের সঙ্গে যুক্ত হতে হতে কলোনির পরিসর বৃদ্ধি পেতে থাকে। বেশ কয়েক প্রজন্ম পরে এরকম একটি কলোনির আয়োতন কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এভাবে বছরের পর বছর ধরে প্রবাল কলোনির সংখ্যাগুলো যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হতে থাকে কোরাল দ্বীপ বা প্রবাল প্রাচীর।
তবে প্রবাল প্রাচীর তৈরিতে কোরাল’ই একমাত্র ভূমিকা রাখে না। শৈবাল,সামুদ্রিক আগাছা এবং মৃত প্রাণীর দেহাবশেষও প্রবাল প্রাচীর গঠনে সহায়তা করে। এমনই একটি সুবিশাল প্রবাল প্রাচীর হচ্ছে, দ্যা গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। এটি তিন লাখ আটচল্লিশ হাজার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। রিফটি অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের উপকূল ঘেঁষা কোরাল সাগরে অবস্থিত।
১৯৮১ সালে এটাকে বিশ্ব হেরিটেজ সাইটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিএনএন এই প্রবাল প্রাচীরকে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তম আশ্চর্য-এর একটি বলে ঘোষণা করে। কুইন্সল্যান্ড ন্যাশনাল ট্রাস্ট এই রিফকে কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রসিডিংস অফ ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮৫ সালের পর থেকে এই রিফটি অর্ধেকেরও বেশি প্রবাল কভার হারিয়েছে।

২০২০ সালের আরেকটি গবেষণায় এটি পুনরায় নিশ্চিত করা হয় যে, রিফের কোরাল কভারের অর্ধেকেরও বেশি ১৯৯৫ থেকে ২০১৭ এর মধ্যে হারিয়েছে, যদিও এখানে ২০২০ সালের ব্যাপক প্রবাল ব্লিচিং এর প্রভাবগুলি পরিমাপ করা হয়নি। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফটি আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ান এবং টরেস স্ট্রেইট দ্বীপপুঞ্জের লোকেদের কাছে দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত। এই রিফ স্থানীয় গোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
রিফটি পর্যটকদের জন্য, বিশেষত হুইটসুন্ডে দ্বীপপুঞ্জ এবং কেয়ার্নস অঞ্চলের পর্যটকদের জন্য একটি খুব জনপ্রিয় গন্তব্য। ২০১৭ এর মার্চে নেচার জার্নাল প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায়, রিফের উত্তর অংশে ৮০০ কিলোমিটার প্রসারিত বিশাল অংশগুলি ২০১৬ সালে মারা গিয়েছিল পানিতে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে।
গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে জন্মগ্রহণ করা কোরাল শিশু ব্যাপকহারে কমে যাচ্ছে এবং কোরাল জন্মের হারও কমে যাচ্ছে। প্রজনন ক্ষমতাসম্পন্ন প্রবালগুলির ধরন পরিবর্তন হয়েছে। একসময় আধুনিক অস্ট্রেলিয়ান মূল ভূখণ্ডটি অ্যান্টার্কটিকার অংশ ছিল এবং এর চারপাশের পানি প্রবালগুলির জীবনযাত্রার জন্য খুব শীতল ছিল। তবে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন বছর আগে, বিশ্ব মানচিত্রে বৃহৎ পরিবর্তনগুলি ঘটেছিল, সে সময় অস্ট্রেলিয়া অ্যান্টার্কটিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উত্তর দিকে যেতে শুরু করেছিল।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে মূল ভূখণ্ডের চলাচল সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থানের সঙ্গে মিলে যায় এবং এটি প্রবালগুলির বৃদ্ধি এবং প্রজননের জন্য আদর্শ অবস্থার সৃষ্টি করে। রিফ তৈরির প্রবালগুলি ১৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় লবণাক্ত অগভীর পানিতে থাকতে পারে। এবং প্রবাল বৃদ্ধির জন্য ২২-২৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডকে আদর্শ তাপমাত্রা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ দক্ষিণে মকর এর ক্রান্তীয় অঞ্চল দ্বারা আবদ্ধ। উত্তরে, প্রবাল দ্বীপগুলি নিউগিনি উপকূলে শেষ হয়, যেখানে ফ্লাই নদী সমুদ্রের মধ্যে প্রবাহিত হয় এবং পানিকে বিচ্ছিন্ন করে।
রিফের মূল কঙ্কালটি সেই অঞ্চলে বিকাশ লাভ করেছে যা একসময় বন্যার্ত নদীগুলির জন্য একটি জলাশয় হিসাবে প্রবাহিত হত।