অমৃতা শের গিলের জন্ম ১৯১৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে। অভিজাত শিখ পিতা উমরাও সিং শের-গিল মজীদিয়ায়, যিনি সংস্কৃত ও ফার্সির বিদ্বান ছিলেন এবং মাতা মারি আন্তোনিটেক গটস্মান ছিলেন হাঙ্গেরির ইহুদি অপেরা গায়ক। দুই কন্যার মধ্যে অমৃতা ছিলেন বড়। জন্মের পর থেকে হাঙ্গেরীয়-ইওরোপীয় সংস্কৃতিতে বড় হলেও অমৃতার আঁকা ছবি প্রমাণ করে, সচেতনভাবেই তিনি তার পিতৃভূমি ভারতকে লালন করতেন।
স্কুলে অধ্যয়নকালে ক্যাথলিক আচার-অনুষ্ঠানের নিন্দা করার অপরাধে ১৯২৪ সালে তিনি স্কুল থেকে বহিস্কৃত হন এবং শেষ পর্যন্ত এই কারণেই তার আনুষ্ঠানিক স্কুল শিক্ষার অবসান ঘটে। এরপরে বেশিরভাগ সময় চিত্রাঙ্কন এবং পিয়ানো বাজানো শেখার জন্য ব্যয় করেছিলেন।
.png)
তার অঙ্কনের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তার চিত্রশিল্পী চাচা এরভিন বাকাতায়ের পরামর্শে প্যারিসের অন্যতম সেরা আর্ট স্কুল একাডেমি দে লা গ্র্যান্ডে চৌমিয়ার ইনস্টিটিউটে অধ্যয়ন শুরু করেন। সেখানে থাকাকালীন তিনি ক্লাসের নীতি ও ধরন অনুসরণ না করে নিজস্ব স্টাইলের প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন।
অল্প সময়ের ব্যবধানে প্যারিসের আর্ট স্কুলে শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন অমৃতা। ১৯৩০ থেকে ৩২ সালের মধ্যে অমৃতা ৬০টির অধিক চিত্রকর্ম তৈরি করেছিলেন, যার বেশিরভাগে বিষয় হিসেবে ছিল- জড় জীবন, ল্যান্ডস্কেপ এবং তার আত্ম প্রতিকৃতি।
'ইয়ং গার্ল' শিরোনামের একটি চিত্রকর্মের জন্য তিনি ১৯৩৩ সালে গ্র্যান্ড সেলন থেকে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। পরে তিনি ফ্রান্সের গ্র্যান্ড সেলনের এশীয়দের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, প্রথম ও একমাত্র সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন, যা এখন পর্যন্ত অনন্য রেকর্ড। ১৯৩৫ সালে ভারতে ফিরে আসেন এবং শিমলার গেটি থিয়েটারে কনসার্ট শিল্পী হিসেবে নিয়োগ পান। বছরখানিক পরে দেশীয় ঐতিহ্যের সন্ধানে অমৃতা ভারতের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা শুরু করেন। যার ফলে তার পরবর্তী ছবিগুলোতে মিশ্রণ ঘটেছে ব্যক্তিগত জীবনে পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণার নানা বর্ণের সঙ্গে ভারতের দুর্দশাগ্রস্ত দরিদ্রদের মলিনতা।
অমৃতার চিত্রকর্মে নারীমনের কামনা-বাসনা শক্তিমানরূপে প্রতিফলিত। তার উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে থ্রি গার্লস, ট্রাইবাল ওমেন শিরোনামের কাজ। ১৯৩৬ সালে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো শের-গিলের কাজ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে শুরু করে এবং এ সময় তিনি নয়াদিল্লিতে অল ইন্ডিয়া ফাইন আর্টস সোসাইটির ৫ম বার্ষিক প্রদর্শনীতে দুটি পুরস্কারও জিতেছিলেন। একই বছরে বোম্বেতে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীতে তার সেরা চিত্রকর্মের কয়েকটি হলো- গ্রুপ অব ইয়াং গার্লস, বালিকা বধূ, হিল উইমেন, পোর্ট্রেট অব মাই ফাদার এবং ভিলেজারস।
অমৃতার চিত্রকর্ম থ্রি গার্লস এ তিনজন নারীকে দেখা যায় রঙিন কাপড় পরিহিত অবস্থায় বসে আছে, কিন্তু পরনের কাপড়ের রঙের রঙিন ছাপ তাদের চেহারায় নেই। শের-গিলের আঁকা এসব চিত্রকর্ম বেশ আলোড়ন ফেলে চারদিকে, কেননা সেই সময়ে বেশিরভাগ চিত্রে নারীদের হাসিখুশি ও সংসারমুখী চরিত্র তুলে ধরা হতো। অমৃতা শের-গিল তার রচনাশৈলী এবং নারীদের উপর উদ্ব্যক্তির কারণে ভারতের ফ্রিদা কাহলো হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
১৯৩৪ সালে নিজের আট বছর বয়সি বোন ববিতকে এঁকেছেছিলেন ভারতের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী অমৃতা শেরগিল। তার আঁকা ‘দ্য লিটল গার্ল ইন ব্লু’ চিত্রকর্মটি বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১৯ কোটি টাকায়। সদবির ‘বাউন্ডলেস ইন্ডিয়া’ শীর্ষক নিলামে অমৃতার আঁকা সপ্তম তৈলচিত্র ১৮.৬৯ কোটি টাকায় বিক্রি হয়। ভারতের শিল্প বাজারে শের-গিলের ছবি এতো বেশি দামে আগে নিলাম হয়নি। ধারণা করা হয়েছিল ছবিটি ৮ থেকে ১২.৫ কোটিতে বিক্রি হবে। ১৯৩৭ সালে পাকিস্তানের লাহোরে প্রথম প্রদর্শিত হয় ছবিটি। এটি কিনেছিলেন ইতিহাসবিদ চার্স ফ্যাব্রি। অনেক বছর পর আবার সদবির দৌলতে ছবিটি প্রকাশ্যে আসে।
১৯৪১ সালের ডিসেম্বরের ৫ তারিখে প্রথাবিরোধী এই চিত্রশিল্পীর মৃত্যু হয়। মাত্র ঊনত্রিশ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। জরায়ুর রক্তপাতজনিত কারণে মৃত্যু হয় তার। ২০১৩ সালকে ইউনেস্কো অমৃতার শততম জন্মদিন উপলক্ষ্যে অমৃতা শের-গিলের আন্তর্জাতিক বছর হিসেবে ভূষিত করে।