এ অবস্থায় কৃষি বিভাগ বলছে আগামী দিনে উঁচু পাহাড়ি ভূমি এবং খালি জমিতে যেনো মাল্টার আবাদ বৃদ্ধি করা যায় সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তারা। ফলন ভালো হওয়ায় চাষিদের মুখেও তৃপ্তির হাসি। চলতি বছর জেলায়
১৩৫ হেক্টর জমিতে ২৭ কোটি টাকার মাল্টা বিক্রি হবে বলে আশাবাদ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের। অনুকূল আবহাওয়া ও উপযোগী পরিবেশ থাকায় প্রতি বছরই বাড়ছে মাল্টার চাষ। প্রতি বছরই চাষিরা মাল্টার নতুন নতুন বাগান করছেন।
.png)

কৃষি বিভাগ ও চাষিরা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ত্রিপুরা সিমান্তবর্তী বিজয়নগর উপজেলার নোয়াবাদী, মেরশানী, বিষ্ণুপুর, পাহাড়পুর ও আখাউড়া উপজেলার আজমপুর, আমুদাবাদ, রাজাপুর এবং কসবা উপজেলার কিছু এলাকার প্রতিটি বাগানে এখন থোকায় থোকায় মাল্টা আর মাল্টার সমারোহ। ২০১৫ সালে কৃষি বিভাগের প্রণোদনায় প্রথমবারের মতো চাষিরা বারি-১ ও বারি-২ জাতের মালটা গাছের চারা লাগিয়ে ছিলেন। শুরুতে অপরিচিত এই ফলটির চাষাবাদ নিয়ে স্থানীয় কৃষকেরা কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও খরচ কম আর উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাল দাম পাওয়ায় বেশ খুশি চাষিরা।
চলতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৩৫ হেক্টর জমিতে সবুজ মাল্টার চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১ হেক্টর, সরাইল উপজেলায় ২ হেক্টর, কসবা উপজেলায় ৩৫ হেক্টর, নবীনগর উপজেলায় ১০ হেক্টর, বাঞ্চারামপুর উপজেলায় ৫ হেক্টর, নাসিরনগর উপজেলায় ১ হেক্টর, আখাউড়া উপজেলায় ১৫ হেক্টর, আশুগঞ্জ উপজেলায় ১ হেক্টর ও বিজয়নগর উপজেলায় ৬৫ হেক্টর জমিতে মাল্টার চাষ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছোট বড় মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রয়েছে ১ হাজার ৮৮০টি মাল্টার বাগান। এর মধ্যে বিজয়নগরে ৭৫৪টি, কসবায় ৬৬০টি ও আখাউড়ায় ৪৬৬টি মাল্টার বাগান রয়েছে।

বিজয়নগর উপজেলার সিংগারবিল ইউপির মিরাসানী গ্রামের মাল্টা বাগান মালিক মো. সোহাগ ভূইয়া জানান, প্রায় এক একর জমিতে তিনি মাল্টা বাগান করেছেন। গতবারের চেয়ে এবার মাল্টার ফলন বেশি হয়েছে। মাল্টা চাষে খরচ কম, লাভ বেশি হওয়ায় অন্যান্য সবজি থেকে মাল্টা চাষে আগ্রহী হয়েছেন তিনি।
তিনি আরো জানান, তার বাগানটিতে ১২০টি গাছ রয়েছে। বাগানটি করতে প্রথমে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রথম বছরে প্রায় ২লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করতে পেরেছি। এবার মালটার বাম্পার ফলন আরো বেশি বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। তার দেখাদেখি অনেকেই পেয়ারা, বেগুনের আবাদ কমিয়ে মাল্টা বাগানের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

এলাকার অপর বাগান মালিক সাজু ভূঁইয়া জানান, পাহাড়ি এলাকার লাল মাটি হওয়ায় মাল্টা চাষের জন্যে বেশ উপযোগী। মাল্টার এবার ফলন ও ভালো হয়েছে। বিক্রিও বেশ ভাল হচ্ছে। বর্তমান বাগান থেকে প্রতি কেজি মাল্টা ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে পাইকারী বিক্রি করা হচ্ছে। কুমিল্লা, নরসিংদী ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারেরা এসে বাগান থেকে সরাসরি মাল্টা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
উপজেলার সিঙ্গারবিল গ্রামের মাল্টা চাষি আবদুল আলিম জানান, তার বাগানে ১৩০টি মাল্টা গাছ আছে। বাগানের পরিচর্যা করতে তার ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, আশাকরি দেড় লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করতে পারব।
বিষ্ণুপুর গ্রামের চাষি জহির মিয়া জানান, গত বছরের তুলনায় এবার তার বাগানে ফলন ভালো হয়েছে। এরই মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা আসতে শুরু করেছেন। এছাড়াও অনেকে শখের বসে পরিবার নিয়ে ঘুরতে গিয়ে মাল্টা কিনছেন।
চাষি হাফিজুর রহমান জানান, তার বাগানে ১০০টি গাছ রয়েছে। এর মধ্যে বারি মাল্টা-১ জাত বেশি। তার নতুন বাগান। অন্যান্য চাষিদের দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে বাগান করেছেন। স্থানীয় কৃষি অফিসের সহায়তা গাছগুলো রোপণ করেছেন। বাগানে বেশ ভালো ফল ধরছে।
সিঙ্গারবিল ইউপির চাষি আলমগীর মিয়া জানান, তার বাগানে ১৩০টি গাছ আছে। তার প্রতিটি গাছেই ফল ধরেছে। ফলন ভালো হয়েছে। প্রতিদিনই লোকজন মাল্টা বাগানে দেখতে আসেন। এখানকার মাল্টা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করা হচ্ছে। এই অঞ্চলের মাল্টা রসালো ও স্বাদে ভিন্নতা থাকায় সারা দেশেই এই সবুজ মাল্টার কদর রয়েছে।
বিজয়নগর উপজেলার কৃষি বিভাগের উপ-সহকারি কৃষি অফিসার হাদিউল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিজয়নগর কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সাইট্রাস ভিলেজ প্রজেক্ট এর আওতায় কৃষকদেরকে বিনামূল্যে মাল্টার চারা সহ কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হয়। যার বিপ্লব ঘটেছে এই এলাকার মাল্টা চাষে। বিজয়নগর এলাকার আবহাওয়া ভালো থাকায় মাল্টা চাষিরা এবছর অনেক লাভবান হবে।

তিনি আরো বলেন, আমরা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে চাষিদের সব ধরনের পরামর্শ ও সহযোগীতা করছি। অল্প খরচে লাভবান হওয়ায় প্রতিবছরই মাল্টা চাষে মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক রবিউল হক মজুমদার বলেন, চলতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৩৫ হেক্টর জমিতে সবুজ মাল্টার চাষ করা হয়েছে। এসব বাগানে ২৭০০ মেট্টিক টন মাল্টা উৎপাদন হবে। আশা করছি এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৭ কোটি টাকার মাল্টা বিক্রি হবে। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছি। মাল্টা চাষ জনপ্রিয় করে তুলতে বিভিন্ন সময় প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করি। প্রতিবছরই মাল্টা চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।