এ জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় শতাধিক পরিবার হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। এ পেশা ধরেই রাখেনি এসব পরিবার, বিশ্ববাজারেও পৌঁছে দিচ্ছে সুস্বাদু এ মুড়ি। এখন দেশ-বিদেশে ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুরের হাতে ভাজা গিগজ মুড়ি।
নিয়মিত না হলেও কয়েকটি দেশে রফতানি হচ্ছে লক্ষ্মীপুরের গিগজ মুড়ি। এ জেলায় বছরে প্রায় পাঁচ শতাধিক টন মুড়ি উৎপাদন হচ্ছে। এমনটিই জানিয়েছেন উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীরা।
.png)

জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সমসেরাবাদ, উত্তর মজুপুর, বেড়িরমাথা, কমলনগর উপজেলার করুণানগর, দক্ষিণ গ্রাম, উত্তর গ্রাম, চর জালিয়া, রামগতি উপজেলার চর ডাক্তার ও রঘুনাথপুর এলাকা হাতে ভাজা গিগজ মুড়ির জন্য বিখ্যাত। এসব এলাকার প্রায় শতাধিক পরিবারের হাজারো মানুষ এ পেশার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া গিগজ মুড়ি উৎপাদনের জন্য রয়েছে আলাদা আড়ত ও হাট। তবে গিগজ মুড়ির জন্য লক্ষ্মীপুর থানা রোড বিখ্যাত। এখানে প্রায় সব দোকানেই এ মুড়ি পাওয়া যায়।
হাতে ভাজা গিগজ মুড়ির কারিগর সরস্বতী দাস জানান, লক্ষ্মীপুর থানা রোডে প্রতি রোববার হাট বসে। হাটের দিন প্রতি কেজি ১৩০ টাকা দরে ৬০ কেজি মুড়ি বিক্রি করেন তিনি। তবে তিনি প্রতি মণ ধান কেনেন ২২শ’ টাকা কেজি দরে।
তিনি আরো জানান, পাঁচ বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তিনি। হাতে ভাজা মুড়ির আয়ে চলছে তার সংসার। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের সমসেরাবাদ এলাকায়। এ এলাকায় প্রায় ৩০ পরিবারের প্রধান পেশা হলো গিগজ ধানের মুড়ি ভাজা। কষ্টের হলেও বংশগতভাবে যুগ যুগ ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তারা।

সমসেরাবাদ গ্রামের বাবুল দাস জানান, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে হাতে ভাজা গিগজ মুড়ি ও খই উৎপাদন করেন তিনি। শহরে জমি কিনে বহুতল বাড়িও করেছেন। কিন্তু আদি পেশা ছাড়েননি।
আড়তদার স্বদেশ দাস ও নির্মল দাস জানান, প্রতি হাটের দিন কমপক্ষে পাঁচ-ছয় টন গিগজ মুড়ি বিক্রি হয়। এখানকার মুড়ি দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে যায়। আবার অনেক প্রবাসী নিজের সঙ্গে পাঁচ-দশ কেজি মুড়ি নিয়ে যান।
শম্ভু দাস নামে এক কারিগর জানান, এ জেলায় আগে গিগজ ধানের প্রচুর চাষ হতো। কিন্তু এখন মজুচৌধুরীর হাট, চরবংশী, মোল্লারহাট, তোরাবগঞ্জ বাজার, উত্তর মার্টিন বাজার, মতিরহাট, করুণানগর ও রামগতি বাজারে এ ধান কেনাবেচা হয়।
তিনি জানান, গিগজ মুড়ি ভাজতে প্রথমে ধান ভাপ দিয়ে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। ২৪ ঘণ্টা পর ফের সিদ্ধ করতে হয়। এরপর দুদিন রোদে শুকিয়ে চাল উৎপাদনের উপযোগী করা হয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে মুরির চাল পেতে কমপক্ষে পাঁচদিন সময় লাগে। এরপর মুড়ি ভাজা হয়।

তিনি আরো জানান, ৮০ কেজি ধানে সর্বোচ্চ ৪৮ কেজি মুড়ি পাওয়া যায়। প্রতি বাজারেই দাম ওঠানামা করে। সারা বছরই চলে এ মুড়ি। তবে রমজান ও শীতে বেশি বিক্রি হয়।
উৎপাদনকারীরা জানান, হাতে ভাজা মুড়িতে লবণ পানি ছাড়া অন্য কোনো পদার্থ দেওয়া যায় না। গ্যাসের আগুনেও এ মুড়ি ভাজা যায় না। বাজারে পাওয়া কোনো চালেও উৎপাদন হবে না এ মুড়ি।
সোনালী ব্যাংক লক্ষ্মীপুরের প্রধান শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার) মো. শামছুল ইসলাম জানান, হাতে ভাজা গিগজ মুড়ি একটি ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প। সোনালী ব্যাংক থেকে কুটির শিল্পে ঋণ নিতে হলে ট্রেড লাইসেন্স প্রয়োজন। কিন্তু মুড়ি উৎপাদনকারীরা ট্রেড লাইসেন্স না দিতে পারলে তাদের সহযোগিতা করা সম্ভব নয়। তিনি নিজেও গিগজ মুড়ির নিয়মিত ক্রেতা।