ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

অর্থনীতিতে যশোরের ফুলের সৌরভ

এইচ আর তুহিন, যশোর
প্রকাশিত: ১৬:৪৩, ২২ জানুয়ারি ২০২৩
অর্থনীতিতে যশোরের ফুলের সৌরভ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দিগন্তজুড়ে বিভিন্ন রঙের সমাহার। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি আর সাদা রঙের চাদর যেন বিছিয়ে রেখেছে চারদিকে। মাঠে মাঠে দোল খাচ্ছে গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জিপসি, রডস্টিক, কেলেনডোলা, চন্দ্রমল্লিকাসহ নানা ধরনের নানা রঙের ফুল। বলছিলাম ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের ঝিকরগাছার গদখালীর কথা।

বর্তমানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুলের উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে। বেড়েছে ব্যবহারও। ফুল চাষের মাধ্যমে অর্থনীতিতে এসেছে সমৃদ্ধি। চলতি মৌসুমে প্রায় শত কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে। এরই মধ্যে ৫০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে যশোর শহর থেকে পশ্চিমের উপজেলা ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার ৭৫টি গ্রামে চাষ করা হয় হরেক রকমের ফুল। ফুল চাষে স্বাবলম্বী হয়েছেন এলাকার সাড়ে পাঁচ হাজার কৃষক। সারাদেশে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে যে ফুল বেচাকেনা হয় এর অন্তত ৭০ ভাগই যশোরের গদখালী-পানিসারায় উৎপাদিত হয়।

গদখালী ও পানিসারা ঘুরে দেখা যায়, প্রতি পিস গোলাপ পাঁচ থেকে আট টাকা, গ্লাডিওলাস ১০ থেকে ১৫ টাকা, জারবেরা আট থেকে ১০ টাকা, রজনীগন্ধা ছয় থেকে আট টাকা, একশ’ পিস চন্দ্রমল্লিকা ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, এক হাজার গাঁদা ফুল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

Advertisement

ফুল ব্যবসায়ী আল আমিন জানান, ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে বেশি চাহিদা থাকে গোলাপ ও রজনীগন্ধার। বিজয় দিবসে গোলাপ চার টাকা বিক্রি হলেও এখন পাঁচ থেকে আট টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর চার টাকার রজনীগন্ধা বিক্রি হচ্ছে ছয় থেকে আট টাকা।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, বাজার চাঙা থাকলে চলতি মৌসুমে চাষিরা শত কোটি টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন। পানিসারা গ্রামের ফুলচাষি মঞ্জুরুল আলম বলেন, ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে ভালো দামে ফুল বিক্রি করতে পেরেছি।

চাষি আব্দুর রহিম জানান, প্রতি একর জারবেরা ফুল চাষ করতে ৩৮ লাখ টাকা খরচ হয়। রজনীগন্ধা চাষে একর প্রতি খরচ প্রায় তিন লাখ টাকা, গোলাপ পাঁচ লাখ টাকা, গ্লাডিওলাস সাড়ে চার লাখ টাকা, গাঁদা চাষে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে থাকে।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পানিসারা গ্রামের ফুলচাষি হারুন-অর-রশিদ জানান, চোরাপথে ফুল আমদানি হওয়ায় ফুলের বিক্রয়মূল্য কম হচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষিরা। তবুও এবার ফুলচাষিরা প্রায় শত কোটি টাকা ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। গদখালীর পটুয়াপাড়া গ্রামের আব্দুল্লাহ জানান, গদখালীর ফুল উন্নতমানের হওয়ায় এখনকার ফুলের চাহিদা অনেক বেশি।

সৈয়েদপাড়া গ্রামের রমজান আলী জানান, গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার ফুল উৎপাদন খরচ বেড়েছে। শ্রমিক খরচ, চারার দ্বিগুণ মূল্য, সার কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার ফুলের দাম একটু বেশি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা ফুল কিনতে আসেন।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সাবেক সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, গদখালীর ফুল চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে কৃষি বিভাগের উদ্যোগে ফুলচাষিরা কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও আমেরিকা সফর করেছেন। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি গদখালীতে ফুল সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণ। সেটির কাজ এর মধ্যে শেষ হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ দীপঙ্কর দাস জানান, এবারো গদখালীতে ফুলের উৎপাদন বেশ ভালো হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় শত কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে। এর মধ্যে ৫০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। আর মহান ভাষা দিবস, বসন্ত উৎসব ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে আরো ৩৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে।

তিনি আরো জানান, দেশের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে যশোর জেলার গদখালীতে ফুল উৎপাদন শুরু করা হয় আশির দশকে। দেশের ফুলের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার রয়েছে এখানে। গদখালীর ফুল ক্রয় করতে আসেন ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা।

ঝিকরগাছার কৃষি কর্মকর্তা মাসুম হোসেন পলাশ জানান, ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার ৭৫টি গ্রামে চাষ করা হয় হরেক রকমের ফুল। প্রতিদিন ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারার শত শত ফুলচাষির আনাগোনা শুরু হয় গদখালীর বাজারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছোট-বড় পাইকাররাও সেখান থেকে ফুল কিনে নিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন হাতবদল হয়ে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ফুল ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এমনকি দেশের বাইরেও।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মঞ্জুরুল হক জানান, যশোরের গদখালীতে সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জিপসি, রডস্টিক, কেলেনডোলা, চন্দ্রমল্লিকাসহ ১১ ধরনের ফুলের চাষ হয়েছে। বিভিন্ন দিবসকেন্দ্রিক হলেও এখন সারা বছর এ এলাকায় ফুলের চাষ হয়ে থাকে। এখানে নতুন নতুন জাতের ফুলের চাষ করা হয়ে থাকে।

তিনি আরো জানান, গত বছর টিউলিপ ও লিলিয়াম ফুলচাষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন এখানকার চাষিরা। এ বছরও চাষ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে চাষিদের সার, বীজসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করা হয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এইচএন
ট্যাগ: যশোর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!