ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

দালালদের দৌরাত্ম্যে নাকাল শজিমেক হাসপাতাল

মাসুম হোসেন, বগুড়া
প্রকাশিত: ১৭:৪৭, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
দালালদের দৌরাত্ম্যে নাকাল শজিমেক হাসপাতাল
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল (ফাইল ছবি)

দালালদের দৌরাত্ম্যে নাকাল হয়ে পড়েছে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল। অথচ মাস চারেক আগেও সেখানে খুব বেশি দালালদের আনাগোনা ছিল না। হঠাৎ করেই দালালদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে শজিমেক। এখন তাদের অবাধ চলাচল হাসপাতাল চত্বরে। রোগীদের খদ্দের বানিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। আর এ কাজে সহায়তা করছেন স্বয়ং এক পুলিশ কর্মকর্তা।

অভিযুক্ত সেই পুলিশ কর্মকর্তার নাম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বগুড়া ছিলিমপুর (মেডিকেল) পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক)। রোগীদের দালালদের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে পকেট ভারী হচ্ছে তার।

অভিযোগ উঠেছে, শজিমেক হাসপাতাল ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ফার্মেসির দালাল চক্র। হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠেছে বেশ কয়েকটি ক্লিনিক। সেগুলোতে রোগী যোগানদাতা হিসেবে শজিমেকের দালালেরা অবস্থান করেন। নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে রোগীদের ক্লিনিকগুলোতে নিয়ে যান তারা। এছাড়াও সুযোগ বুঝে রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে কয়েকগুন বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করেন ফার্মেসি দালালরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শজিমেক হাসপাতালের পাশে গড়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে অন্যতম দিগন্ত ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশন ও এশিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এ দুই ক্লিনিকের ১৬ জন দালাল রয়েছেন। তাদের মধ্যে এশিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রয়েছেন ৪ জন। আর দিগন্ত ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশনের রয়েছেন ১২ জন। তারা শজিমেক চত্বর ও এর আশপাশে ঘোরাফেরা করেন এবং রোগীর অপেক্ষায় থাকেন। গ্রামগঞ্জ থেকে কোনো রোগী শজিমেকের উদ্দেশে চিকিৎসাসেবা নিতে আসলে অনেকেই দালালদের খপ্পরে পড়েন। তাদের শজিমেক চত্বর অথবা মূল ফটকের সামনে থেকে কৌশলে নেয়া হয় ক্লিনিকে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ তাদের বিশ্বাস করে  প্রতারিত হন। রোগীদের জিম্মি করে ক্লিনিকে নিয়ে চিকিৎসাসেবার নামে প্রতারণা করে আসছেন তারা। এছাড়াও শজিমেক হাসপাতাল সংলগ্ন ফার্মেসিগুলোর আরও ১২ জন দালাল রয়েছেন। 

দিগন্ত ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশনের দালালরা হলেন রবিউল, মামুন নামে দুজন, রেজা, রুবেল, জুয়েল, শামীম, রনি, আব্দুল আজিজ ও দুই নারী। আর আনোয়ার, দুলু, জামরুল ও মামুন হলেন এশিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দালাল। এছাড়াও আব্দুল কুদ্দুস, মিথন, রবিউল, হৃদয়, মোমিন, পারভেজ, রায়হান, স্বাধীন, সুমন, রফিকুল, মিনহাজ্ব ও বাপ্পী হলেন ফার্মেসিগুলোর দালাল।

এসব দালালদের মধ্যে রবিউল, রফিকুল, দুলুসহ দুই নারীকে বৃহস্পতিবার গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হাসপাতাল চত্বর থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

গত বছরের ২৭ নভেম্বরের ঘটনা, চারদিন বয়সী এক অসুস্থ ছেলে নবজাতক শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি ছিল। চিকিৎসককের পরামর্শ অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে kacin100 নামের একটি ইনজেকশনের প্রয়োজন হয় তার। সেটি কিনতে হাসপাতাল সংলগ্ন বর্ষণ মেডিসিন এন্ড সার্জিক্যাল ফার্মেসিতে যান তার বাবা লিখন। সেখানে ১৬ টাকার ওই ইনজেকশন তার কাছে বিক্রি করা হয় ৫২০ টাকায়। পরে লিখন এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের বগুড়া কার্যালয়ে অভিযোগ করেন। তার  অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ওই ফার্মসিকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে। এরমধ্যে অভিযোগকারী নবজাতকের বাবা লিখনকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, লিখন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের অভিযোগ করে বিচার পেলেও তার মতো শত শত ভুক্তভোগী রয়েছেন, যারা প্রতারিত হলেও কোথাও অভিযোগ করছেন না। 

তিনি আরও বলেন, দালাল চক্রের কাছ থেকে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ৪০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। বিপুল নামের এক ব্যক্তি দালালদের পক্ষ থেকে তাকে এই টাকা দেন। 

নাম গোপন রাখার শর্তে এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, পুলিশ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুরের কারণে বর্তমানে শজিমেক দালালদের অভয়ারণ্যে হয়ে উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাসপাতালে অবস্থান করা দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। দালালদের কাছ থেকে আমি কোনো টাকা নেইনি। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।

জানতে চাইলে শজিমেল হাসপাতালের উপপরিচালক মো. আব্দুল ওয়াদুদ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, হাসপাতাল দালালমুক্ত রাখতে নিয়মিত খোঁজ খবর নেয়া হয়। গতকাল পাঁচজন দালালকে গ্রেফতার করেছেন পুলিশ সদস্যরা।

টাকার বিনিময়ে পুলিশ কর্মকর্তা শজিমেক হাসপাতাল চত্বরে দালালদের জায়গা করে দিচ্ছেন-এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, রক্ষকই যদি ভক্ষক হয়, তাহলে তো মুশকিল। জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হবে। এছাড়াও কারো লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!