হাসপাতাল চত্বরেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো অ্যাম্বুলেন্স। চালকরা সাফ জানিয়ে দিলেন টাকা লাগবে চার হাজার। সদরের ভেতরেই সামান্য পথ (হাসপাতাল থেকে জয়বাংলা হাট) যেতে গুনতে হবে এত টাকা! অবাক হলেন মৃতের স্বজনরা। কোনো উপায় না পেয়ে স্বজনদের মধ্যে একজন ফোন দিলেন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ। ফলে কিছুটা রক্ষা পান তারা। একই অ্যাম্বুলেন্সেই ভাড়া কমল ১ হাজার ৫০০ টাকা। ২ হাজার ৫০০ টাকায় হয় রফাদফা।
সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে। মৃতের স্বজন (মেয়ে জামাই) হৃদয় খন্দকারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের ভোগান্তির কথা।
.png)
গত ১১ মার্চ (শুক্রবার) ভোরে শজিমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আঙ্গুর খাতুন। এর আগে ৯ মার্চ (বুধবার) করোনা আক্রান্ত হয়ে শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। তার মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের শিকার হন স্বজনরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শজিমেক হাসপাতালে এমন চিত্র মাঝে মধ্যে নয়, নিত্যদিনের ঘটনা। পুলিশের সাহায্য নিয়ে অনেকেই অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া কিছুটা কমাতে পারলেও জিম্মিদশা থেকে পুরোপুরি উদ্ধার হতে পারেননি কেউ। শুধু তা-ই নয় শহরের অন্যত্র খোঁজ করলে কম ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স মেলে ঠিকই। তবে কোনো সমাধান মেলে না। কারণ অন্যত্র থেকে ভাড়া করা অ্যাম্বুলেন্স শজিমেক থেকে কোনো রোগী বা লাশ বহন করতে পারবে না। এমন নিয়ম খোদ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির। হাসপাতাল চত্বর থেকেই নিতে হবে অ্যাম্বুলেন্স। দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেটে জিম্মি হয়ে আছে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা। তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত শুক্রবার (১৮ মার্চ) দিবাগত রাতে শজিমেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পাবনা কাশিনাথপুরের এক যুবক। পরদিন শনিবার সকালে লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরতে স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে এসে আটকা পড়েন সিন্ডিকেটে। ভাড়া চাওয়া হয় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। তাদেরকে বাড়তি ভাড়াতেই যেতে বাধ্য করা হচ্ছিল। কারণ বাইরে থেকে তারা কোনো অ্যাম্বুলেন্স আনতে পারবে না। ওই সময় ছিলিমপুর (মেডিকেল) পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই রকিবুল হাসানকে বিষয়টি জানান ভুক্তভোগী এক স্বজন। পরবর্তীতে এএসআই রকিবুলের হস্তক্ষেপে ভাড়া কমিয়ে করা হয় সাড়ে চার হাজার টাকা। ঘটনাটি জানান এএসআই রকিবুল হাসান নিজেই।
বগুড়া শহরের ফুলতলা এলাকার বাসিন্দা রমজান প্রামাণিক জানান, মাস চারেক আগে তার ভাই কলেজ শিক্ষার্থী মোহন শজিমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। হাসপাতাল থেকে তার বাড়ির দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়ি পর্যন্ত তার ভাইয়ের লাশ নিয়ে আসতে খরচ হয় ১ হাজার টাকা। অ্যাম্বুলেন্স মালিক পরিচিত হওয়া টাকা কমিয়ে এক হাজার টাকা করা হয়। কিন্তু তিন কিলোমিটার পথ হাজার টাকা কীভাবে হয়!
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির শজিমেক শাখার সভাপতি জাকির হোসেন বেবী মুঠোফোনে বলেন, রোগী বা লাশ বহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয় না। শহরের মধ্যে আমরা কম খরচই নিই। শজিমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের কোনো সিন্ডিকেট নেই।
অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের শিকার হওয়া রমজান জানান, শজিমেক হাসপাতাল চত্বরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে চলছে প্রকাশ্যে ডাকাতি। হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গুনে অ্যাম্বুলেন্স চালকরা। কারণ লাশ বহনের ক্ষেত্রেই তারা বেশি টাকা হাতিয়ে নিতে পারেন।
এদিকে সরকারি হাসপাতাল চত্বরে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স রাখা আইন বিরোধী। এরপরেও শজিমেক হাসপাতাল চত্বরে অবৈধ অ্যাম্বুলেন্সের স্ট্যান্ড করা হয়েছে। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো থাকে ৫০-৬০টি অ্যাম্বুলেন্স। তবুও সেখানে নেই আইনের প্রয়োগ। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে হাসপাতাল চত্বর থেকে প্রায়ই অ্যাম্বুলেন্স বের করে দেওয়া হয়।
জেলার অতিরিক্তি পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল ও জেলা পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র) শরাফত ইসলাম জানান, শজিমেক হাসপাতাল চত্বরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
জানতে চাইলে শজিমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, হাসপাতাল চত্বরে অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড করা হয়েছে কথাটি ঠিক নয়। মাঝে মধ্যে চালকরা সেখানে অ্যাম্বুলেন্স রাখেন। তবে তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিষয়ে আমরাও কিছু অভিযোগ পেয়েছি। অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি-সম্পাদককে ডেকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এরপরেও তারা রোগী বা লাশ বহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে।