ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

দেশের মাটিতে সৌদির খেজুর উৎপাদনে বিপ্লবের হাতছানি

কামরুজ্জামান মিন্টু, ময়মনসিংহ 
প্রকাশিত: ১৫:৩৬, ৭ মে ২০২৩
দেশের মাটিতে সৌদির খেজুর উৎপাদনে বিপ্লবের হাতছানি
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ভোজন রসিকদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় সৌদি আরবের খেজুর। এ দেশসহ একসময় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, পাকিস্তান এবং ভারত থেকেও খেজুর আমদানি হতো। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে সৌদির খেজুর চাষ গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। উৎপাদন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ খেজুর। ফলে খেজুরসহ চারা বিক্রির মাধ্যমে চাষিরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি সৌখিন ব্যক্তিরাও খেজুর চাষে ঝুঁকছেন।

গত কয়েক বছরে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় খেজুর বাগান। একজনের সাফল্য দেখে আরেকজন খেজুর চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। গত প্রায় দুই যুগে চারা বিক্রি করে সাফল্যের চূড়ায় পৌছেছে আব্দুল মোতালেব। তিনি বর্তমানে কোটিপতি খেজুর মোতালেব নামেই পরিচিত। তার বাগানে উৎপাদিত চারা যাচ্ছে সারাদেশে। বিক্রি হচ্ছে রসে টইটম্বুর সুস্বাদু খেজুর।

আব্দুল মোতালেবের বাড়ি উপজেলার পাড়াগাঁও গ্রামে। ১৯৯৮ সালে সৌদি আরব গিয়ে একটি খেজুর বাগান দেখাশুনার কাজ করেন তিনি। নিয়মিত কাজ করে চারা উৎপাদনসহ খেজুর উৎপাদনে পারদর্শী হন। এরপর মাতৃভূমিতে খেজুর চাষের পরিকল্পনা করেন। তিন বছর পর ৩৫ কেজি বিভিন্ন জাতের খেজুর নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ২০০১ সালে নিজের বাড়ির পাশে খেজুরের বাগান তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি।

Advertisement

গত বছর প্রায় ১২০ টি গাছ থেকে ৬ লাখ টাকার খেজুর বিক্রি করেছেন আব্দুল মোতালেব। ছোট আকৃতির প্রতিটি চারা ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা, ফলধারক একটি গাছ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। তার বাগানে বর্তমানে দুই হাজার ছোট-বড় গাছ রয়েছে। প্রতিটি পূর্ণ বয়স্ক গাছে ২৫০ কেজি খেজুর ধরে। আজুয়া জাতের খেজুর প্রতি কেজি ২ হাজার টাকা, আমবাগ প্রতি কেজি ২ হাজার টাকা, সুকারী ১ হাজার ৫শ টাকা ও বরকি ১ হাজার ৫শ টাকা কেজি বিক্রি হয়।

বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে সৌদির খেজুর চাষ গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে।

তিনি এক সময় স্ত্রী সন্তান নিয়ে মাটির ঘরে বসবাস করতেন। খেজুর বাগান থেকে আয়ের টাকায় দ্বিতল ভবনের বাড়ি করেছেন, ৬ বিঘা জমি কিনেছেন, যার মূল্য কোটি টাকা।

মরুভূমির উত্তপ্ত আবহাওয়ায় উৎপাদিত ফলকে এদেশে চাষ করে মোতালেবের ব্যাপক সাফল্য দেখে এ অঞ্চলের অনেক বেকার যুবকরাও এখন সৌদি আরবের খেজুর চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

মোতালেবের এমন সাফল্য দেখে খেজুর চাষ করেন পার্শ্ববর্তী পাড়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আফাজ পাঠান। 

তিনি জানান, ২০১৬ সালের শেষের দিকে দুই বিঘা জমিতে বীজ বপন করেন। সে বছরই আড়াই হাজার চারা হয়। বর্তমানে ১০ বিঘা জমিতে গড়ে তোলেছেন খেজুর বাগান। সৌদি আরবের ১০ জাতের খেজুরের প্রায় ৫ হাজার গাছ ও ৫ হাজার চারা আছে তার বাগানে। প্রতিটি চারা ২ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।

আফাজ পাঠান আরো বলেন, মানুষের মধ্যে ধারণা ছিল খেজুর সব মাটিতে হয়না। এটি ভুল প্রমাণ করেছি। ঢাকার বনানি, আব্দুল্লাহপুর, কেরানিগঞ্জ, সিলেট , নিলফামারীর সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বিপুল পরিমাণ চারা বিক্রি করেছি। সব জায়গায় লাগানো গাছে ফল এসেছে। স্বাদে, গন্ধে ও রসে টইটম্বুর খেজুর।

বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে সৌদির খেজুর চাষ গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে।

খেজুর বাগানের মালিক আজিজুল হক নামের আরো একজন জানান, মোতালেবের বাগান দেখে তিনিও দুই একর জায়গায় বাগান শুরু করেছেন। খেজুরের চেয়ে চারা বিক্রি করেই লাভবান তিনি। স্থানীয় লোকজনসহ দূর- দূরান্তের লোকজন বাড়ির আঙ্গিনায় কিংবা বিভিন্ন রিসোর্টের শোভা বর্ধনের জন্য কিনে নিচ্ছেন খেজুরের চারা।

উপজেলার মাস্টারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম। তিনি খেজুর চাষি মোতালেবের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন দশটি চারা। ফল ধরেছে কিনা জানতে কথা হয় তার সঙ্গে।

তিনি বলেন, মোতালেব সৌদির খেজুর চাষে আলোড়ন তুলেছেন জানতে পেরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। গত ৮ বছর আগে দশটি চারা সংগ্রহ করি। এরমধ্যে তিনটি গাছে খেজুর ধরেছে। স্বাদও সৌদি আরবের খেজুরের মতোই।

জহির উদ্দিন নামে আরেকজন বলেন, আফাজ পাঠানের কাছ থেকে তিনটি চারা কিনেছিলাম। এরমধ্যে একটি গাছে খেজুর ধরছে। পরে চাষিকে জানালে তিনি আরো একটি চারা কিনতে বলেন। সে অনুযায়ী বেশি দামে আরেকটি চারা কিনে লাগালে চাষি মাঝেমধ্যে এসে নিজেই পরিচর্যা করার পাশাপাশি কৌশল শিখিয়ে দেন৷ দুইবছর আগে ওই গাছেও খেজুর ধরেছে।

কথা হয় খেজুর চাষি আব্দুল মোতালেবের সঙ্গে। তিনি বলেন, দেশে ফিরে আমার বাড়ির পাশে একটি জমিতে খেজুরের চারা রোপণ করি। কিন্তু প্রায় সব গাছই পুরুষ হয়ে যাওয়ায় খেজুর হয়নি। আবার গাছ লাগালে আবারো একই অবস্থা। তৃতীয় দফায় দুটি গাছে খেজুর হয়। সেই দুই গাছ থেকে বর্তমানে দুই হাজার চারা উৎপাদন করেছি। প্রতিবছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে মুকুল আসে এবং জুন-জুলাইয়ে ফল পাকবে৷ এ বছর ২০০ গাছের খেজুর ৬ থেকে ৭ লাখ টাকায় বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও গতবছর ২৫ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়েছে।

তিনি বলেন, ভালুকার মাস্টারবাড়ি, ঢাকার উত্তরা, বনানি, চট্টগ্রাম, ও মানিকগঞ্জে প্রচুর চারা বিক্রি হয়েছে। অনেকে বাগান করার জন্য শতাধিক চারা এক সঙ্গে কিনতে আসেন৷ তাদেরকে স্টেম্পে লিখিত দিয়ে বিক্রি করা হয়। তারা বেশি দামে চারা কিনেন। আমিও নিজ হাতে চারা রোপণ করে আসি৷ যাদেরকে চারা দিয়েছি সবাই জানিয়েছে খেজুর ধরেছে। তবে কিছু পুরুষ চারা হওয়ায় ও পরিচর্যা যথাযথভাবে না পাওয়ায় ফল আসেনি।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ময়মনসিংহের উপপরিচালক মো. মতিউর রহমান বলেন, পৃথিবীতে প্রায় এক হাজারের বেশি খেজুরের জাত রয়েছে, এর মধ্যে সৌদি আরবে ৪০০ বেশি জাতের খেজুর উৎপাদন হয়। বাংলাদেশে জনপ্রিয় জাতের মধ্যে আজওয়া, বেরহি, সামরান, জাহেদি, মরিয়ম, আনবারাহ, আসমাউলহাসনা, ইয়াবনি অন্যতম। এর মধ্যে আজওয়া, বেরহি এবং মরিয়ম জাতের খেজুর বেশি চাষ হচ্ছে।

তিনি বলেন, বীজ থেকে তৈরি চারায় প্রকৃত জাতের গুণাগুণ থাকে না বা কম থাকে। এ কারণে বীজের চেয়ে চারার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। খেজুর চাষের ক্ষেত্রে পুরুষ ও স্ত্রী গাছের চারা নির্বাচনে চাষীদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। কারণ অধিকাংশ চারা পুরুষ হয়ে যায়। এজন্য সতর্কতার সঙ্গে চারা নির্বাচন করতে হয়। ভালুকার লাল মাটিতে খেজুরের উৎপাদন বাড়ছে। খেজুর চাষে কেউ আগ্রহী হলে সবধরনের পরামর্শ দেয়া হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: ময়মনসিংহ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!