ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, দেশে স্বাদু পানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩ প্রজাতির ছোট মাছ রয়েছে। এর মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় মাছের সংখ্যা ৬৪টি। পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, মাগুর, দেশি সরপুঁটি, জাতপুঁটি, ভেদা, গুতুম, খলিশা, গজার, ফলি, চিতল, মহাশোল, নারকেলি চেলা, তিতপুঁটি ও দারকিনাসহ ৩৬ প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজনন সম্ভব হয়েছে। এরমধ্যে ২০ প্রজাতির মাছ সারাদেশে চাষের আওতায় এসেছে। বাকিগুলো চাষের আওতায় আনাসহ বিলুপ্তপ্রায় মাছের পোনা উৎপাদন করতে গবেষণা চলছে।
সরেজমিন ময়মনসিংহ শহরের মেছুয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রজাতির বড়-ছোট দেশীয় মাছ নিয়ে বসে আছে বিক্রেতারা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের দামাদামিতে সরগরম বাজারটি। এসময় কথা হয় জালাল উদ্দিন নামের একজন বিক্রেতার সঙ্গে।
.png)
দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছের দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সময়ের ব্যবধানে দেশীয় বিভিন্ন ছোট মাছগুলো বিলুপ্তির আশংকায় ছিল। ফলে বাজারে এসব মাছের দাম ছিল প্রচুর। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে বিভিন্ন ছোট মাছ চাষের আওতায় এসেছে। ফলে ক্রেতাদের হাতের নাগালে এসেছে দাম৷ এসব মাছের চাহিদাও বেড়েছে।
কাদের মিয়া নামের আরেকজন বলেন, পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, মাগুরের দাম ছিল বেশি। বর্তমানে এসব মাছসহ বিভিন্ন মাছ প্রচুর পরিমাণে চাষ করা হচ্ছে। ফলে এসব মাছের দাম কেজিতে একশো থেকে ২শ টাকা পর্যন্ত কমেছে। অন্যান্য সব দেশীয় মাছ চাষাবাদের আওতায় আনতে পারলে আমাদের বেশি পরিমাণ মাছ বিক্রি করতে সুবিধা হবে। এতে ক্রেতারা কম দামে কিনতে পারার পাশাপাশি চাষিরাও লাভবান হবে।
গবেষণা প্রসঙ্গে বিএফআরআইয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জুলফিকার আলী জানান, কৃত্রিম প্রজননের জন্য বিলুপ্তপ্রায় মাছ পুকুর, বিভিন্ন জলাশয়, হাওর-বাঁওড় কিংবা নদী থেকে সংগ্রহ করা হয়। এরপর দীর্ঘ গবেষণার ধারাবাহিকতায় একপর্যায়ে হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। অক্সিজেন সরবরাহের জন্য ঝর্ণার মাধ্যমে পানির প্রবাহের ব্যবস্থা করা হয়।
ইনজেকশন দেয়ার নির্দিষ্ট সময় পর ডিম দেওয়ার একপর্যায়ে ডিম থেকে রেণু বের হয়ে আসে। ডিম থেকে রেণু বের হওয়ার পর হাঁপাতে ৪৮-৭২ ঘণ্টা রাখতে হয়। এভাবে ডিম থেকে উৎপাদিত রেণু পোনাকে নার্সারি পুকুরে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকেই প্রচুর পরিমাণ পোনা উৎপাদন করা হচ্ছে।
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শাহা আলী বলেন, জলাশয় সংকোচন, পানি দূষণ এবং অতি আহরণের ফলে এসব মাছের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় বর্তমানে এগুলো বাংলাদেশে বিপন্নের তালিকায়। ফলে পুনরায় খাবার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে গবেষণা চলছে।
তিনি বলেন, দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার কারণে সংরক্ষণের জন্য লাইভ জিন ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। যেসব মাছের হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, সেগুলো সংগ্রহ করে লাইভ জিন ব্যাংকে রাখা হয়। পরে গবেষণা করা হয়।
পরিসংখ্যান মতে, ২০০৮-০৯ সালে চাষের মাধ্যমে দেশীয় মাছের উৎপাদন ছিল ৬৭ হাজার মেট্রিকটন। দেশীয় মাছের পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন হওয়ায় ২০২০-২১ সালে উৎপাদন ৪ গুণ বেড়ে আড়াই লাখ মেট্রিকটনে উন্নীত হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, দেশীয় প্রজাতির মাছগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও আয়োডিনের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ আছে। এগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং রক্তশূন্যতা, গলগণ্ড ও অন্ধত্বের মতো রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, মাছের ব্যাপক পোনা উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে এসব দেশীয় মাছ চাষাবাদে পোনা প্রাপ্তি সহজতর হবে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। গবেষণার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সকল দেশীয় মাছকে খাবারের পাতে ফিরিয়ে আনা হবে।