উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড কুতুপালং। এটি এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকা। এর ভেতরে অসুস্থ স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বাস করেন লম্বাশিয়া গ্রামের নুর জাহান নামে এক বৃদ্ধা। তিনি মনে করেন, তাদের জীবনে কোনো স্বাধীনতাই নেই।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে তাদের জীবন কাঁটাতারের বেষ্টনীতে বন্দি হয়ে গেছে। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালে আসতে যেতে পথে পথে তল্লাশি চৌকি ও জিজ্ঞাসাবাদের কারণে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। নিজ জমির ফসল আনতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। এর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মধ্যে মারামারি, খুনসহ নানা অপরাধে চরম আতঙ্কে জীবনযাপন করছেন তারা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে এমন পরাধীন জীবনযাপন করতে হবে তা কল্পনাও করেননি তারা।
.png)
একই এলাকার নুরুল কবির জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় কাঁটাতারের বেষ্টনী দেওয়াটা জরুরি ছিল। কিন্তু এটার কারণে বন্দি জীবনে পড়েছেন তারা নিজেরাই। অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া, কেনাকাটা করতে দীর্ঘ পথ হেঁটে যেতে হয়। কোনো গাড়ি ঘর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে এপিবিএনের অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে।
নুরুল কবির বলেন, আমার মেয়ে অনার্স পাস করে ঘরে বসে আছে। এর মধ্যে কয়েকটি বিয়ের প্রস্তাব আসলেও ক্যাম্পের ভেতরে বাড়ি হওয়ার অজুহাতে বিয়ে হয়নি। রোহিঙ্গা ঘরগুলো সরিয়ে নিয়ে স্থানীয়দের জন্য চলাফেরার সহজ পথ তৈরি করা জরুরি।
একই এলাকার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী রায়হান জানায়, আগে যে রাস্তা ব্যবহার করে তারা স্কুলে যেত এখন ওই রাস্তা বন্ধ। প্রায় আধা ঘণ্টা ঘুরে স্কুলে যেতে হয়। আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে পথে পথে তল্লাশি। ঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে পড়ালেখায়ও সমস্যা হচ্ছে।
একইভাবে রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৪০০ পরিবার ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেষ্টনীতে বন্দি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন।
তিনি জানান, ৪০০ পরিবারের মানুষের চলাফেরা ও জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া, চিকিৎসা, কেনাকাটায় প্রতিদিন সমস্যা হচ্ছে। এজন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্প অপসারণ করা দরকার। রোহিঙ্গাদের সরিয়ে বা ক্ষেত্র বিশেষে কিছু স্থানীয় পরিবারকে সরিয়ে এমন উদ্যোগ নেয়া সম্ভব। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
শুধু রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প নয়, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পের স্থানীয় ১৯০০ পরিবারের বাসিন্দারা কাঁটাতারের বেষ্টনীতে চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতার মুখে রয়েছেন। প্রতিদিন নানাবিধ সমস্যার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে আতঙ্কিত তারা।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, তার ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকা রোহিঙ্গা ক্যাম্প। যেখানে কাঁটাতারের বেষ্টনীর কবলে রয়েছে সাড়ে ৩শ’ পরিবার। এদের চলাফেরার জটিলতা নিয়ে প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের লিখিতভাবে একাধিকবার জানানো হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৮ এর নিরাপত্তায় নিয়োজিত অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি আমির জাফর বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তায় বেষ্টনী ও তল্লাশি চৌকি স্থাপন করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয়রাও এপিবিএনের চেকপোস্টে যাচাইয়ের আওতায় পড়ছে। এ নিয়ে সাময়িক অসুবিধা হলেও নিরাপত্তার জন্য তা জরুরি।
কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক অতিরিক্ত কমিশনার সামছুদ্দৌজা নয়ন জানান, কাঁটাতরের বেষ্টনীতে কিছু স্থানীয় পরিবার বসবাস করে। তাদের কিছু অসুবিধা রয়েছে বলে নানাভাবে জানা গেছে। এ ব্যাপারে স্থানীয়রা লিখিতভাবে আবেদন করেছেন কিনা জানা নেই। তবে স্থানীয়দের সরানো সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের কীভাবে আলাদা করা যায়, সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।