ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

পদ্মার চরে একমাত্র ভরসা ‘মহিষের গাড়ি’

ইসমাইল হােসন বাবু, ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া)
প্রকাশিত: ০২:২৭, ২৬ জানুয়ারি ২০২৪
পদ্মার চরে একমাত্র ভরসা ‘মহিষের গাড়ি’
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পদ্মার বালুচরের বুকে একমাত্র যানবাহন ‘মহিষের গাড়ি’। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

‘মহিষের গাড়ি’ এখন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পদ্মার বালুচরের বুকে একমাত্র যানবাহন। কালের আবর্তে এই যানবাহনটির প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। পদ্মার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে উঁচু নিচু, আঁকা বাঁকা বালুময় পথে যাত্রী বা মালামাল গন্তব্যে পৌঁছাতে একমাত্র ভরসা এই ‘মহিষের গাড়ি’।

যুগযুগ ধরে কৃষকের কৃষি ফসল বপন ও বহনের গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে পরিচিত ছিল গরু-মহিষের গাড়ি। দুই চাকাবিশিষ্ট গরু বা মহিষের টানা এক প্রকার বিশেষ যান। এ যানে সাধারণত একটি মাত্র অক্ষের সঙ্গে চাকা দুটি যুক্ত থাকে। গাড়ির সামনের দিকে একটি জোয়ালের সঙ্গে দুটি গরু বা বলদ জুটি মিলে গাড়ি টেনে নিয়ে চলে। সাধারণত চালক বসেন গাড়ির সামনের দিকে। আর পেছনে বসেন যাত্রীরা। বিভিন্ন মালপত্র বহন করা হয় গাড়ির পেছন দিকে। কৃষিজাত দ্রব্য ও ফসল বহনের কাজে এ গাড়ির প্রচলন ছিল ব্যাপক। এই গাড়িই ছিল একমাত্র ভরসা। তবে বর্তমানে নানা ধরনের মোটরযান চলাচলের কারণে অপেক্ষাকৃত ধীর গতির এই যানটির ব্যবহার অনেক কমে এসেছে। তাই এখন আর তেমন চোখে পড়ে না।

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পদ্মার বালুচরের বুকে একমাত্র যানবাহন ‘মহিষের গাড়ি’।পদ্মার চরাঞ্চলে সড়কগুলো সব সময়ই উঁচু নিচু ও বালুময় দুর্গম। এসব চরে নির্দিষ্ট কোনো সড়ক নেই। চরের মানুষ বিভিন্ন সময়ে সুবিধাজনক সড়ক বেছে নেন। এসব সড়কে মাইলের পর মাইল হেঁটে যাতায়াত করেন তারা। পণ্য পরিবহনে মহিষের গাড়িই এখানে একমাত্র মাধ্যম। তবে যুগের হাওয়ায় শুকনো মৌসুমে জমি চাষ করা ট্রাক্টরের সঙ্গে ট্রলি সংযোগ করে মালামাল পরিবহন করতে দেখা যায়। কিন্তু পদ্মার পাড় থেকে নৌকা যোগে নিয়ে আসা মালামাল কিংবা বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঝখান থেকে কৃষিপণ্য পরিবহনে এখনও মহিষের গাড়িই ভরসা।

Advertisement

ভেড়ামারা উপজেলার পদ্মা নদীর অভ্যন্তরে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে সরেজমিন গেলে মহিষের গাড়ির এমন অনেক দৃশ্যই দেখা যায়।

আবেদ মাঝির নৌকাঘাটে গিয়ে দেখা যায়, শহর থেকে আনা মালামাল চরের বিভিন্ন গ্রামে নিতে হলে প্রথমে নৌকাযোগে নির্দিষ্ট জায়গায় নামিয়ে তারপর সেই মালামাল তুলে দেওয়া হয় মহিষের গাড়িতে। নদীর তীর থেকে খাড়া ঢাল বেয়ে মহিষের গাড়ি উপরে ওঠে। তারপর ছুটে চলছে মাইলের পর মাইল।

চরের মহিষের গাড়িচালক রবিউল ইসলাম রবি বলেন, আমরা চরের কৃষক। অনেক আগে থেকেই মহিষের গাড়ি চালাই। আবাদের কাজের ফাঁকে মহিষের গাড়ি চালাই।

উপজেলার রায়টা এলাকার নুর ইসলাম বলেন, আমার জমির ফসল ঘরে তোলা ও আর হাঁট-বাজারে নেয়ার জন্যই মহিষের গাড়ি চালাই।

দিয়াড় বাহাদুরপুর চরের কৃষক আমান উল্লাহ, আ. করিম, নজরুল ইসলামসহ অনেকেই জানান, নদীতে বেশির ভাগ জায়গা চর পড়ে আবাদী জমির পরিমাণ বেড়েছে। বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দূরে তাদের কৃষি জমি। এসব জমির ফসল ঘরে তুলতে মহিষের গাড়ি ছাড়া সম্ভব নয়। আবার মহিষের গাড়ি না পেলে মাথায় বা কাঁধে বোঝা নিয়ে আসতে হয়। এছাড়া শহর থেকে মালামাল আনতেও মহিষের গাড়িই একমাত্র যানবাহন।

চিলমারীর চর বাংলাবাজার এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, শুকনো মৌসুমে আমাদের একমাত্র যানবাহন মহিষের গাড়ি। এই গাড়ির মাধ্যমে আমরা মালামাল আনা নেয়া করি।

দৌলতপুরের চিলমারীর ইউপি চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, পদ্মার মধ্যবর্তী একটি ইউনিয়ন চিলমারী। এখনো চরের অনেক রাস্তা মাটির। নদী তীরবর্তী বালুময় রাস্তাগুলোতে চলাচল বা পণ্য পরিবহনের জন্য মহিষের গাড়ি একমাত্র যানবাহন।

চরাঞ্চলের বাসিন্দা আবুল ফজল জানান, বর্তমান যুগের মানুষ বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় মালামাল বহনের জন্য বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে ট্রাক, পাওয়ার টিলার, লরি, নসিমন-করিমনসহ বিভিন্ন মালগাড়ি। মানুষের যাতায়াতের জন্য রয়েছে মোটরগাড়ি, রেলগাড়ি, সিএনজি, অটোরিকশা ইত্যাদি। ফলে গ্রামাঞ্চলেও আর চোখে পড়ে না মহিষের গাড়ি।

মাইজচরের মহিষের গাড়ির গাড়িয়াল ছফু মিয়া বলেন, এ গাড়ির একটি সুবিধা হলো এতে কোনো জ্বালানি লাগে না, ধোঁয়া হয় না। পরিবেশের কোনো ক্ষতিও করে না। কিন্তু যুগের পরিবর্তনে আমাদের প্রিয় এই গরুর গাড়ি প্রচলন আজ হারিয়ে যাচ্ছে। তবে বাপ-দাদার পেশা আকড়ে ধরে এখনো বাহন হিসেবে মহিষের চালানো হচ্ছে। এ থেকে যেটা রোজগার হয়, তা দিয়ে চালানো হচ্ছে সংসার।

ভেড়ামারা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ খলিল উল্লাহ বলেন, গরু ও মহিষের গাড়িতে চড়ে বিয়ে করতে যাওয়ার দৃশ্য আগে দেখা যেতো। এ সংস্কৃতি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!