মসজিদ থেকে প্রাপ্ত শিলালিপির তথ্য মতে, ১৫৮১ সালে সম্রাট আকবরের শাসনামলে আবুল ফতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁর অর্থায়নে তারই সহোদর মুহাম্মদ বিন তুর্কি খান কাকশাল চাটমোহরে মসজিদটি নির্মাণ করেন।
তিন গম্বুজবিশিষ্ট চাটমোহর শাহী মসজিদের নির্মাণ কৌশলে প্রাচীন সুলতানী স্থাপত্যের প্রভাব রয়েছে। বগুড়ার খেরুয়া মসজিদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ছোট ছোট পাতলা জাফরী ইটের সমন্বয়ে নির্মিত চাটমোহর শাহী মসজিদের দৈর্ঘ্য ৪৫ ফুট, প্রস্থ ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ৪৫ ফুট। প্রায় ৪০০ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী ভিড় করেন।
.png)
স্থানীয় প্রবীণরা বলেন, এক সময় চাটমোহর ছিল পাবনার একটি অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র। তখনকার সময়ে এখানে মুঘল ও পাঠানদের অবাধ বিচরণ ছিল। তখনই মুহাম্মদ বিন তুর্কি খান কাকশাল মসজিদটি নির্মাণ করেন। এটিই আজকের চাটমোহর শাহী মসজিদ। তবে অনেক বইয়ের পাতায় এটিকে মাসুম কাবলির মসজিদ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই মসজিদে তুঘরা লিপিতে উৎকীর্ণ একটি ফারসি শিলালিপি ছিল। তবে বর্তমানে এই শিলালিপিটি রাজশাহী বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষিত আছে।
লাল জাফরী ইটে নির্মিত এই মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট। জাফরী ইটের ব্যাখ্যায় জানা গেছে, এই ইটগুলো বর্তমান সময়ের ইটের মতো মোটা হতো না। এই ইটগুলো চিকন চিকন হয় বলেই জাফরী বলা হয়। মসজিদের দেয়াল প্রায় ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি চওড়া। মসজিদের ভেতর ৩টি কাতার দাঁড়াতে পারে। এর ভেতরে কালিমা তাইয়্যবা লিখিত একটি কালো পাথর রয়েছে। বর্তমানে মসজিদটি একটি সংরক্ষিত ইমারত। একসময় মসজিদটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
‘৮০-র দশকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর পরিপূর্ণভাবে মসজিদটি নির্মাণ করে। তবে পুনর্নির্মাণের কয়েকবছর পর মসজিদের তিনটি গম্বুজ ও ছাদ প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের অধীনে মসজিদ সংস্কার ও সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চাটমোহর মসজিদ থেকে প্রাপ্ত তুঘরা শিলালিপিটি বর্তমানে রাজশাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এ শিলালিপি অনুসারে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে জনৈক খান মুহম্মদ বিন তুর্কি খান কাকশাল মসজিদটি নির্মাণ করেন।
চাটমোহর শাহী মসজিদের দেয়ালে থাকা প্রাচীন ভাস্কর্যগুলো মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। চাটমোহরে তিন গম্বুজ সমৃদ্ধ শাহী মসজিদে দেখা যায়, মসজিদটিতে তিনটি দরজা বিশিষ্ট প্রবেশপথ রয়েছে। প্রবেশপথের তিনটি দরজার মধ্যে প্রধান প্রবেশপথে উঁচু দরজার উপরে কালো পাথরের মাঝে খোদাই করা কালেমা শাহাদাৎ লেখা রয়েছে। মূল প্রবেশ পথটি ছাড়া অন্য প্রবেশপথ দুটি একই ধরনের।
মসজিদটিতে তিনটি প্রবেশপথের সঙ্গে মিল রেখে পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে মোট তিনটি মিহরাব। কেন্দ্রীয় মিহরাব থেকে দুই পাশের মিহরাবে রয়েছে বড় সুরঙ্গের মতো অপূর্ব নিদর্শন। সুলতানি রীতিতে মসজিদটির কার্নিশ সামান্য বাঁকানো। খিলানগুলিতে এখনো গোলাপ নকশার চিহ্ন রয়েছে। প্রতিটি খিলান পথেরই দুপাশে রয়েছে স্থাপিত দুটি করে আয়তাকার খোপ নকশা। নকশাগুলি বর্তমানে ফাঁকা, তবে আগে হয়ত এখানে অলঙ্করণ ছিল।
দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে ছাঁচে ঢালা ব্যান্ড নকশার একটি সারি রয়েছে। যে কারণে মসজিদটিকে বাইরে থেকে দেখতে দ্বিতল বলে মনে হয়। মিহরাবগুলি আয়তাকার ফ্রেমের মধ্যে স্থাপিত এবং শুরুতে এগুলিতে পোড়ামাটির অলঙ্করণ ছিল যার চিহ্ন এখনো খুঁজে পাওয়া যায়।
গোলাপ নকশা, পুষ্পলতা এবং জ্যামিতিক নকশার মতো নানা রকম মোটিফ এখানে ব্যবহৃত হয়েছিল। চাটমোহর শাহী মসজিদের দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সাইট পরিচালক শাহজাহান আলী জানান, পাবনার এ মসজিদ এবং বগুড়ার শেরপুরে অবস্থিত খেরুয়া মসজিদ দুটিই ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এবং হুবহু একই পরিকল্পনা বিশিষ্ট। বাংলায় বিদ্যমান মুঘল ইমারতের মধ্যে এ দুটি সর্বপ্রাচীন নিদর্শন। যদিও ইমারত দুটি মুঘল আমলে নির্মিত কিন্তু এগুলির বর্তমানরুপে এ অঞ্চলে প্রচলিত সুলতানি স্থাপত্য রীতির সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায়।
বক্র কার্নিশ, দ্বিকেন্দ্রিক সুচাঁলো খিলান, অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব, গম্বুজ, গম্বুজ নির্মাণে বাংলা পেন্ডেনটিভের (লম্বমান অংশ) ব্যবহার প্রভৃতি সবই সুলতানী স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য। তবে সুলতানী রীতির এসব বৈশিষ্ট্য থাকলেও অন্ততপক্ষে মসজিদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় এ রীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বাংলায় তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ পরিকল্পনার সূচনা হয়েছিল এখানেই। পরবর্তীকালে এ পরিকল্পনার সম্প্রসারিত ও পরিবর্তিত রূপ দীর্ঘ দিন এ অঞ্চলের স্থাপত্যে প্রভাব বিস্তার করেছিল।
শাহজাহান আলী আরো জানান, সুলতানী-মোঘল আমলের শাহী মসজিদ দেখতে সারাবছরে বহু মানুষ আসেন পাবনার চাটমোহরে। দেশ-বিদেশ থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা আসেন এক সারিতে তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ ও এর কারুকাজ দেখতে। দূর থেকে মসজিদটি বিশাল মনে হলেও ভেতরে মাত্র দুই কাতার লোক নামাজে দাঁড়াতে পারেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার নামাজ আদায় হয় এই মসজিদে। ওই মসজিদে একজন ঈমাম ও একজন মোয়াজ্জ্বিন রয়েছেন।