কেন খুন হলেন মিতু, আদালতে জানালেন তার মা
স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে কক্সবাজারের একটি হোটেলে ওঠেন সাবেক এসপি বাবুল আক্তার। একই হোটেলেই পাশের আরেকটি রুমে ওঠেন ভারতীয় এক নারী। সেই নারীর সঙ্গে পরপর দু’বার বাবুলকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন মিতু। এজন্যই মানসিক অত্যাচার ও পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে তাকে খুন করা হয়।
সোমবার চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে এসব তথ্য জানান মিতুর মা শাহেদা মোশাররফ।
সাক্ষ্যে শাহেদা মোশাররফ বলেন, ২০০২ সালের ২৬ এপ্রিল বাবুল আক্তারের সঙ্গে আমার বড় মেয়ে মাহমুদা খানম মিতুর বিয়ে হয়। তখন বাবুল আক্তার বেকার ছিলেন। বিয়ের পর একেবারে শুরু থেকে তাদের সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না, মোটামুটি ছিল। পরে বাবুল পুলিশে যোগদান করেন। এরপর কক্সবাজারে এসপি (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) হিসেবে বদলি হয়। সেখানে ভারতীয় এক নারীর সঙ্গে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, একদিন বাবুল আক্তার মিতুকে নিয়ে কক্সবাজারের একটি হোটেলে ওঠেন। পাশের রুমে ওই নারীও ওঠেন। ওই নারীর রুমে বাবুল আক্তারকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন মিতু। তখন মিতু জিজ্ঞেস করলে বাবুল বলেন- বিদেশে যাওয়ার জন্য ল্যাপটপে কাজ করছেন। তাদের দুজনকে এ অবস্থায় দেখে মিতুর খুব খারাপ লাগলো। সে কিছুক্ষণ ওখানে ছিল। বাচ্চারা একা থাকায় মিতু তাদের রুমে চলে আসে। বাচ্চারা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর সেও ঘুমিয়ে পড়ে।
গভীর রাতে আবারো বাবুলকে ওই নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন মিতু- উল্লেখ করে শাহেদা মোশাররফ বলেন, রাত ৩টার দিকে মিতুর ঘুম ভেঙে যায়। তখনও বাবুল আক্তার মিতুর রুমে ছিলেন না। মিতু আবার ওই নারীর রুমে গেলে তাদের দু-জনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পায়। মিতু রুমে এসে কেঁদে কেঁদে আমাকে ফোন দেয়। তখন আমি তাকে বলি- তুই চলে আয়। মিতু তখন বলে- আমার ছেলেমেয়েরা আমাকে খারাপ মনে করবে। তাই আমি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি।
চীনে বসে মিতুকে খুনের পরিকল্পনা
সাক্ষ্যে শাহেদা মোশাররফ বলেন, বাবুল আক্তার বিদেশে (মিশনে) থাকার সময় তিন-চারবার বাংলাদেশে আসেন। তবে দেশে ফিরলেও তিনি বাসায় অর্থাৎ মিতু কিংবা ছেলেমেয়েদের কাছে যাননি। মিশন শেষ করে তিনি চীনে চলে যান। সেখানে বসেই বাবুল মিতুকে মারার পরিকল্পনা করেন।
মিতুর ব্যবসার টাকায় খুন করা হয় তাকে
শাহেদা মোশাররফ বলেন, মিতুর একটি ব্যবসা ছিল। ব্যবসার তিন লাখ টাকা দিয়ে মিতুকে খুন করেন। মিতু মারা যাওয়ার পর বাবুল আক্তার আমাদের বাসায় ওঠেন। ছয়মাস আমাদের বাসায় ছিলেন তিনি। সেখানে বসে তিনি আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ২৪ জুন (২০১৬) বাবুল আক্তারকে ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর বাবুল সেখান থেকে চাকরি ছেড়ে আসেন। আমি তখন তাকে জিজ্ঞেস করি- চাকরি ছাড়ল কেন? তখন তিনি বলেন- মিতু খুন হওয়ার কারণে আমাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। আমি তাকে বলি- চাকরি ছাড়ার বিষয় কি মিতুর খুনের বিচারের জন্য?
মিতুকে খুনের জন্য ৭০ হাজার টাকায় অস্ত্র কেনেন বাবুল
শাহেদা মোশাররফ বলেন, মিতুকে খুন করার জন্য ৭০ হাজার টাকা দিয়ে মুসাকে অস্ত্র কিনে দেন বাবুল। একথা বলেছেন মুসার স্ত্রী। মুসার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করেছিল- তুমি মিতুকে খুন করেছ? তখন মুসা তার স্ত্রীকে বলেন- আমি খুন না করলে বাবুল আক্তার আমাকে ক্রসফায়ার দেবে। বাবুল আক্তার আমাদের বলেছিল- মিতুর খুনের আসামিরা গ্রেফতার হয়েছে। আমি ক্রসফায়ার দিতে বলেছি।
শাহেদা আরো বলেন, আসামি ওয়াসিম, আনোয়ার গ্রেফতার হয়েছিল। এর কিছুদিন পরেই ভোলা ধরা পড়ে। গ্রেফতার হওয়ার পর ভোলা আদালতে জবানবন্দি দেন- বাবুল আক্তারের নির্দেশেই মিতুকে খুন করেন মুসা। মিতু মারা যাওয়ার দেড় মাস পর সে যে বাসায় ছিল, ওখানে মিলাদ পড়ানোর জন্য আমরা চট্টগ্রাম আসি। এর কিছুদিন পর আসামি কালু ও শাহজাহান গ্রেফতার হয়।
তিনি বলেন, আমরা চট্টগ্রাম আসার পরে অবস্থা দেখে মনে হয়েছে- পূর্বপরিকল্পিতভাবে মিতুকে খুন করেছেন বাবুল আক্তার। মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিনি নিজেই মিতু হত্যার মামলা করেন। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমার স্বামীকে বলেন- আপনারা বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ২০২১ সালের ১২ মে মিতুর বাবা বাবুল আক্তারকে আসামি করে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করলেন।
‘বেয়াইন, মিতুকে আমার ছেলে খুন করেছে’
মারা যাওয়ার ১৫ দিন আগে (২০১৭ সালে) মিতুর মা শাহেদাকে ফোন করেন বাবুল আক্তারের মা- উল্লেখ করেন শাহেদা।
ফোন করে বাবুল আক্তারের মা বলেন- ‘বেয়াইন, মিতুকে আমার ছেলে (বাবুল) খুন করেছে। তাকে আপনি মাফ করে দেন।’
তখন আমি তাকে (বাবুলের মা) বলি, বাবুল মরলে কি এ কথা আপনি বলতেন? এসব আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে বলেছি- যোগ করেন শাহেদা।
সোমবার দুপুর ১২টায় চাঞ্চল্যকর এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর পর প্রথমে সাক্ষ্য দেন নগরের পাঁচলাইশ থানার তৎকালীন ওসি পুলিশ পরিদর্শক মহিউদ্দিন মাহমুদ। এরপর সাক্ষ্য দিতে কাঠগড়ায় দাঁড়ান শাহেদা মোশাররফ।
২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরের পাঁচলাইশ থানার জিইসি মোড়ের কাছে ওআর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে গুলি ও ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন মাহমুদা খানম মিতু। ওই ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন তার স্বামী তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তার। মামলাটি তদন্ত শুরু করে নগর ডিবি পুলিশ। পরে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ‘আদালতের নির্দেশে’ মামলার তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এরপরই ঘুরতে থাকে মামলার গতিপ্রকৃতি। পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসতে থাকে স্ত্রী হত্যার সঙ্গে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততার নানা দিক।
২০২১ সালের ১০ মে মামলার বাদী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাবুল আক্তারকে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ে ডেকে নেয়া হয়। এরপরই তাকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। পরে ১২ মে দুপুরে বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে নগরের পাঁচলাইশ থানায় আটজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন।