ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

সিন্ডিকেটের ধানে ভরছে সরকারি খাদ্য গুদাম!

তুহিন আহমেদ, সিলেট
প্রকাশিত: ১৫:৫৫, ৩০ মে ২০২৪
সিন্ডিকেটের ধানে ভরছে সরকারি খাদ্য গুদাম!
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে সরকারি খাদ্য গুদামে তোলার কথা থাকলেও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে হচ্ছে তার ঠিক উল্টো। 

কৃষকদের কাছ থেকে ধান না কিনে পাথর ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ধান কিনে সরকারি খাদ্য গুদামে তোলার অভিযোগ করেছেন সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কৃষকরা। এমনকি সরকারি গুদামের কর্মকর্তার যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠারও অভিযোগ উঠেছে। এতে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। 

দীর্ঘদিন ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও অবশেষে গত রোববার এক অভিযানের মাধ্যমে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে উপজেলা খাদ্য গুদামের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ও অনিয়মের বিষয়টি আলোচনায় ওঠে আসে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযান চালিয়ে সিন্ডিকেটের মূল হোতা পাথর ব্যবসায়ী আব্দুল আলীর গোডাউন থেকে সরকারি বস্তাভর্তি ধান ও সরকারের সিলযুক্ত খালি বস্তাও উদ্ধার করেন।

Advertisement

এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এছাড়া সিলেট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে চার সদস্য বিশিষ্ট আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের বুধবারের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহের জন্য ৩৪৫ জন কৃষককে নির্বাচিত করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রতিমণ ধান ১ হাজার ২৮০ টাকা দরে কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোম্পানীগঞ্জের থানা বাজার এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল আলী ও খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার যোগসাজশে গড়ে উঠা সিন্ডিকেটের কাছ থেকেই শুধু ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। তালিকায় থাকা অন্য কৃষকরা ধান সরবরাহ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। 

কৃষকদের অভিযোগ, কোম্পানীগঞ্জ খাদ্য গুদামের কর্তাদের সঙ্গে থানা বাজারের পাথর ব্যবসায়ী আব্দুল আলী একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। আব্দুল আলীর গোডাউনে হাজার হাজার সরকারি বস্তা আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে বস্তা ভরে গাড়িতে করে নিয়ে ওজন ছাড়াই খাদ্য গুদামে ঢুকানো হয়। গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রকৃত কৃষকরা ধান সরবরাহ করার জন্য সিরিয়াল পাচ্ছেন না। অথচ আব্দুল আলী সিন্ডিকেটের ধান ভেজা অবস্থায়ও গুদামে ঢুকানো হচ্ছে। অভিযোগ ওঠেছে, গোলাম কিবরিয়া ২ হাজার টাকার বিনিময়ে প্রতি কার্ডধারীর কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে থাকেন। 

এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অভিযান চালিয়ে আব্দুল আলীর ৩টি গোডাউনে থাকা সরকারি বস্তাভর্তি ধান ও সরকারের সিলযুক্ত খালি বস্তা উদ্ধার করেন। এসময় গোডাউনে তালা দেন ইউএনও। পরে তিনি ঘটনা তদন্তে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেন। অন্যদিকে, সিলেট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে চার সদস্য বিশিষ্ট আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন আব্দুল আলী। তিনি বলেন, তার পাথরের ব্যবসা রয়েছে। ধান চাল নিয়ে কোনো সিন্ডিকেট নেই। খাদ্য গুদামে তার তিন ভাই ধান সরবরাহ করেন। তারা তিনজনই কার্ডধারী। এসবের সঙ্গে তিনি জড়িত না।

আব্দুল আলী বলেন, সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহ করি না। আমি চুনাপাথরের ব্যবসা করি। আমাদের ক্ষেতের ধান আমার তিন ভাই গুদামে বিক্রি করেন। তারা তিনজনই কার্ডধারী। ইউএনও গত রোববার এসেছিলেন। আমি সরকারি বস্তা কেনার কাগজপত্র দেখিয়েছি।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনোজ কান্তি দাস চৌধুরী বলেন, উপজেলা কৃষি অফিস কৃষকের তালিকা তৈরি করে দিয়েছে। এই তালিকাধারীদের কাছ থেকে ধান কেনা হচ্ছে। বাইরের কারো ধান সরবরাহের সুযোগ নেই। খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কীভাবে ধান সংগ্রহ করছেন সেটা আমার জানা নেই। কিন্তু আমি পরিদর্শনে গিয়ে কিছু অসঙ্গতি পাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। রোববার এ ঘটনার পর জেলা নিয়ন্ত্রকের দফতর থেকে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন বলেন, উপজেলার কতজন কৃষক ধান সরবরাহ করতে ইচ্ছুক সেটার একটা তালিকা করে আমরা খাদ্য গুদামে পাঠাই। তারা যাচাই বাছাই করে ঠিক করবে কাদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হবে। কিন্তু তালিকা কে করলো সেটার চেয়ে এখন বড় কথা হলো সরকারি বস্তা অন্য একজন ব্যক্তির গোডাউনে গেল কীভাবে। এটা তদন্ত করা উচিত।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুনজিত কুমার চন্দ বলেন, রোববার বিকেলে ৩টি গোডাউন তল্লাশি করে সরকারি বস্তাভর্তি ধান পাওয়া গেছে। এ সময় সরকারি বস্তা ও ধান উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে তিনদিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র দেখাতে না পারলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: সিলেট
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!