স্থানীয়রা জানান, প্রায় শত বছর আগে এই অঞ্চলে প্রমত্তা মেঘনা বহমান ছিল। এখানে নদীটির দৈর্ঘ্য ছিল ৭ মাইল আর প্রশস্ত ছিল ১ মাইল। নদীতে বড়বড় জাহাজ চলাচল করতো এই জায়গার উপর দিয়ে। এরপর নদীটি ক্রমে পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে এদিকে চর হয়ে যায়। নদী থাকাকালে জাহাজ চলাচলের দিকনির্দেশনার জন্য এদিকে কয়েকটি বয়া ফেলা হয়। চর দেওয়ার পর এই দুটি বয়া এখানে মাটি চাপা পড়ে যায়। ধীরে ধীরে মাটি সরে গিয়ে বয়াগুলোর অস্তিত্ব ফুটে উঠে।
তবে, একসময় মানুষ মনে করতো এই বয়া দুটো এখানে আসার পর থেকেই নদী সরে যায় এখান থেকে। তাই মানুষ অলৌকিক ভেবে এগুলো ঘিরে মানত আর মিলাদ করতো। এসবগুলোও অনেক পুরান কাহিনী। যেহেতু বয়াগুলো মানুষের কাছে ছিল রহস্যাবৃত। তাই এগুলো নিয়ে রূপকথাও ছিল মুখেমুখে। যার কারণে এখানে এই চরটির নামও বয়াগুলোর সঙ্গে মিল রেখে মুখে মুখে রটে যায় ‘বয়ার চর’।
.png)
রহস্যঘেরা এই বয়া দুটি নিয়ে স্থানীয়দের কাছে কৌতুহলের শেষ নেই। এগুলো কীভাবে কোথা থেকে আসলো অনেকেরই জানা নেই। স্থানীয় অনেক বয়স্করাও ছোটবেলা থেকেই গোলাকার এই দুটি বয়া দেখে আসছেন এখানে। আর বাপ-দাদার মুখ থেকেই শুনে আসছেন এগুলোকে ঘিরে নানান রহস্যময় কাহিনী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ, তেওয়ারীগঞ্জ, কুশাখালীসহ আশপাশ এলাকা নদী ছিল। তৎকালীন নোয়াখালী জেলার কুশাখালীর ফরাশগঞ্জ ছিল নৌ-বন্দর। ফরাশগঞ্জ নৌ বন্দরে বড় বড় জাহাজ ভিড়ত। জাহাজ ভিড়াবার জন্য ব্রিটিশরা এ অঞ্চলে কয়েকটি বয়া স্থাপন করে। সেগুলোর মধ্যে এ দুটি বয়াও ছিল। নদী সরে গিয়ে এলাকায় চর জেগে তখন বয়াগুলো মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। তবে কালের বিবর্তনে সেগুলোর ওপর থেকে মাটি সরে গিয়ে ওপরের অংশ দৃশ্যমান হয়।
স্থানীয় আব্দুল আলী জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই এখানে বয়াগুলো দেখে আসছেন। বাপ-দাদাদের মুখে শুনেছেন, তৎকালে অনেক দূর থেকে মানুষ বিভিন্ন নিয়তে এখানে আসতো। মোমবাতি জ্বালাতো। মিলাদ পড়তো শিরনি বিতরণ করতো। মানত করে টাকা দিত। অনেক বছর এগুলো লাল কাপড় দিয়ে মানুষ ঘিরে রেখে বিশেষভাবে যত্ন নিত। মানত করে এখানে রেখে যাওয়া টাকা-পয়সা এলাকার দুষ্টু পোলাপান নিয়ে যেত বলেও জানান তিনি।
মমিন উল্যাহ নামে একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ১৯৬০ সালের আগে এ চরে তেমন কোনো বসতি ছিল না। নদীর জেগে উঠা চরে ফসল চাষ হত। তখন এ বয়াগুলো লোকজনের নজরে পড়ে। এরপর থেকে বয়াগুলো এভাবেই পড়ে আছে। বয়ার নামে এ এলাকার নাম ‘বয়ারচর’ হয়েছে।
মোহাম্মদ শাহজাহান নামের একজন বলেন, ছোটবেলা থেকে বয়া দুটি দেখে আসছি। অতীতে বয়ার ওপর লোহার তৈরি খাঁচা ছিল। অনেকটা টাওয়ারের উচ্চতার মতো ছিল। কিন্তু সেগুলো কেউ হয়তো নিয়ে গেছে। এখন বয়া দুটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। লোহাগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, বয়া হলো নেভিগেশন ইকুয়েপমেন্ট। এগুলো লোহার তৈরি শিকল ও অ্যাঙ্কর দিয়ে আটকানো থাকে।