খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপজেলায় ৪ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬২ হাজার ১৭৯ মেট্রিক টন।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ৪ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদিত আম বিক্রি করে ১৫০ থেকে ১৫৫ কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
.png)
জেলায় বর্তমানে আম্রপালি, বারি-৪, বারি-১১, হাড়িভাঙা, রাংগুয়াই, গৌরমতি, বানানা ম্যাঙ্গো, কিউজাই, কাটিমন, মল্লিকা, চিয়াংমাই, মিয়াজাকি (সূর্যডিম), আশ্বিনা, হিমসাগর, কিং অব চাকাপাতসহ বিভিন্ন জাতের আমের চাষ হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী খাগড়াছড়ি জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন জাতের সর্বাধিক ফলিত আমের আবাদ ও সম্ভাব্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিম্নরূপ, আম্রপালি: ৩২১০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.৬৪ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৪৩৮১০ মেট্রিক টন। বারি-৪,২২৪ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.২৩ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ২৯৬৫ মেট্রিক টন।
হাড়িভাঙা: ৫৪ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১২.৫ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৬৭৫ মেট্রিক টন।
রাংগুয়াই: ৩৭৫ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.৫৫ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৯৯৬৫ মেট্রিক টন।
গৌরমতি: ৫ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.৬ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৬৮ মেট্রিক টন।
বানানা ম্যাঙ্গো: ১৩৫ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.১৮ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ১৭৮০ মেট্রিক টন।
কিউজাই: ১২৪ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.০২ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ১৬১৫ মেট্রিক টন।
কাটিমন: ৮ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.১২মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ১০৫ মেট্রিক টন।
মল্লিকা: ৩৪ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১২.২০ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৪১৫ মেট্রিক টন।
চিয়াংমাই: ৪ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.৭৫ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৫৫ মেট্রিক টন।
সূর্যডিম (মিয়াজাকি): ৫ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.৬ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৬৮ মেট্রিক টন।
আশ্বিনা: ৫ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.৬ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৬৮ মেট্রিক টন। পালমার: ৪ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩.৭৫ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৫৫ মেট্রিক টন।
রত্না: ৪ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১২ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৪৮ মেট্রিক টন।
কিং অব চাকাপাত: ৪ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১১.২৫ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৪৫মেট্রিক টন।
ফজলি: ১৮ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১২.০৫ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ২২৫ মেট্রিক টন।
অন্যান্য জাতের আম: ৩৭৭ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৩ মেট্রিক টন হিসেবে সম্ভাব্য উৎপাদন ৪ হাজার ৬০১ মেট্রিক টন।
সর্বমোট ৪৫৯০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে এবং সম্ভাব্য উৎপাদন। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৬ হাজার ৫৬৬ মেট্রিক টন। উৎপাদিত আম বিক্রি করে প্রায় ১৬০ থেকে ১৭০ কোটি টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলার মাটিরাঙ্গা পৌর এলাকায় তরুণ উদ্যোক্তা মো. ফোরকান উদ্দিন ফরম যত্নে প্রায় পাঁচ একর পাহাড় ভূমিতে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমধর্মী আম বাগান। মায়ের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি ২০২৩ সালের জুন মাসে দেশি বিদেশি ৪০ প্রজাতির চারা দিয়ে বাগানের কার্যক্রম শুরু করেন।
ফোরকান উদ্দিন মালয়েশিয়ার ভিক্টোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কলেজ থেকে কুলিনারি আর্টসে ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি চট্টগ্রামের বাসিন্দা। বাবার ব্যবসার সূত্রে পাহাড়ে এসে তিনি কৃষির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তার বাগানে প্রায় দুই হাজার আমগাছ রয়েছে।
বাণিজ্যিকভাবে বারি-৪ (গৌরমতি), বানানা ম্যাঙ্গো, আম্রপালি, বারি-১১, কাটিমনসহ বিভিন্ন জাতের আম উৎপাদন করছেন তিনি। এছাড়া ডগমাই, কিং অব চাকাপাত, চিয়াংমাই, মিয়াজাকি (সূর্যডিম), আলফানসো, ইটু-আরটু, ফোর কেজি, ব্ল্যাক স্টোন, ব্রুনাই কিং, রেড পামার, আশ্বিনা, হাড়িভাঙাসহ নানা বিদেশি ও দেশি জাতের আম রয়েছে তার বাগানে।
চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় ১০ টন আম বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ফোরকান উদ্দিন বলেন, ‘শখের বশে ছোট পরিসরে আমের বাগান শুরু করেছিলাম। সময়ের পরিক্রমায় সেই শখই আজ বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ি এলাকার মাটি ও অনুকূল আবহাওয়া বিভিন্ন উন্নত ও বিদেশি জাতের আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সঠিক পরিচর্যা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করলে এ অঞ্চলে আম চাষের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে এবং কৃষকরা অধিক লাভবান হতে পারবেন।’
একই এলাকার আরেক বাগান মালিক রূপক বলেন, ‘আগে পাহাড়ি জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। এখন আমসহ বিভিন্ন ফলের চাষ করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। সরকারি সহযোগিতা আরও বাড়লে পাহাড়ে আম চাষে বিপ্লব ঘটবে।’
বাগানে কর্মরত শ্রমিক মো. জগদিস ত্রিপুরা বলেন, ‘এই বাগানে সারা বছর কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি। নিয়মিত কর্মসংস্থানের ফলে পরিবারের আয়-রোজগার বেড়েছে এবং সংসারের খরচ নির্বাহ অনেক সহজ হয়েছে। বাগানটি শুধু ফল উৎপাদনেই নয়, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’
খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি উপ পরিচালক মো. নাছির উদ্দিন বলেন, ‘পাহাড়ি অঞ্চলের জলবায়ু ও মাটি আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। উন্নত জাতের আম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে খাগড়াছড়ি দেশের অন্যতম আম উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’
পাহাড়ি জনপদে আম চাষের এই বিস্তার শুধু কৃষকদের নতুন স্বপ্নই দেখাচ্ছে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীন অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনাও উন্মোচন করছে।