সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, কোথাও কৃষকেরা পাট কাটছেন, কোথাও জাগ দিচ্ছেন। আবার কোথাও কৃষকেরা পাটের আঁশ ছাড়িয়ে ধোয়া ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত। মাঠজুড়ে কৃষকরা এখন পাট ঘরে তোলার শেষ সময়ের কর্মব্যস্ততায় মুখিয়ে পড়েছে।
অপরদিকে চলতি মৌসুমে রোগবালাইয়ের প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকায় পাটের বৃদ্ধি অত্যন্ত আশানুরূপ। তবে সার, বীজ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে। স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ পাট চার হাজার টাকা থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভাল ফলন ও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে।
.png)
জেলার একাধিক কৃষকগণ জানান, কয়েক বছর আগেও পাট চাষে লাভের চেয়ে লোকসানের আশঙ্কাই ছিলো বেশি। কিন্তু এবার উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবং বাজারে দাম সন্তোষজনক থাকায় পাট আবারো লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে। তাই অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে পাটের আবাদ আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
বর্তমানে সোনালি আঁশ পাটের মৌসুম চলছে। গ্রামবাংলায় এখন এটি চিরচেনা দৃশ্যে মাঠে পাটচাষিরা জমি থেকে কাঁচা পাটগাছ কেটে কয়েকদিন জমিতে টিবি করে রাখে। এরপর পাটের পাতাগুলো ঝড়ে গেলে পানিতে ডুবিয়ে জাগ দেয়া। পানিতে থাকা অবস্থায় পচন ধরে পাটের সবুজ আঁশ নরম হয়। এরপর আঁশ ছাড়িয়ে নিলেই পাওয়া যায় সোনালি আঁশ।
জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জের তেঘরিয়া এলাকায় কৃষকরা জমি থেকে পাট পানিতে নামিয়ে পচনের জন্য জাগ দিচ্ছে। পাটের জাগকে পানির নিচে ডুবিয়ে রাখতে জাগের উপরে মাটি দিয়ে ভরা দিতে হয়। এতে পাট পানির নিচ থেকে উপরের দিকে উঠতে পারে না। সঠিকভাবে পানিতে ডুবাতে না পারলে পাটে পচন ধরে না। আর পচন না ধরলে আঁশে পরিণত হয় না। আর আঁশ না হলে ওই পাট দিয়ে কিছুই করা যায় না। অপরদিকে একই উপজেলার সুখনগরি এলাকায় চাষিরা পাটের শোলা থেকে আঁশ ছাড়িয়ে নিচ্ছে। এরপর পাটগুলো রোদে শুকানোর পরই বাজারজাত করার উপযোগী হয়।
সরিষাবাড়ির পাটচাষি আব্দুল কাদের বলেন, একসময় পাটের চাষ করা হতো অন্য ফসল বাদ দিয়ে। দরপতন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও জাগ দেয়ার পানির সংকটে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন অনেক কৃষক। তবে এবার পরিস্থিতি বদলে গেছে। গত বছর থেকেই দাম বেড়ে যাবার ফলে এ বছর পাটের চাষ বেশি হয়েছে। ফলে সোনালি আঁশ নিয়ে আবারো স্বপ্ন জামালপুরের পাটচাষিরা।
মেলান্দেহ কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, ভাল বাজার দর, অনুকূল আবহাওয়া, সময়মত বৃষ্টিপাত, উন্নত জাতের বীজ এবং কৃষি বিভাগের সহায়তায় চলতি মৌসুমে উপজেলায় পাটের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি ভাল ফলন ও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় আবারো সোনালি আঁশের এই অর্থকরী ফসলের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।
মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, আগে পাটের দাম কম থাকায় চাষ কমিয়ে দিয়েছিলাম। গত বছর ভাল দাম পাওয়ায় এবার পাঁচ বিঘা জমিতে পাট করেছি। ফলনও ভাল হয়েছে। আশা করছি আশানুরূপ মুনাফা আয় হবে।
আরেক কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, এবার পাটের ফলন বেশ ভাল হয়েছে। বাজারে দামও ভাল। শুধু পাটের আঁশ নয়, পাটকাঠিরও চাহিদা রয়েছে। এতে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন।
মাদারগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় দুই হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ ছিল দুই হাজার ২০০ হেক্টর। এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ৬৫০ হেক্টর।
জামালপুর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান (খামারবাড়ি) বলেন, কৃষকদের পাট চাষে উদ্বুদ্ধ করতে সরকার প্রণোদনা দিচ্ছে। পাশাপাশি পাটের ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উন্নত জাতের বীজ, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের আগ্রহের কারণে এবার পাটের আবাদ বেড়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, আগামী বছর পাটের আবাদ আরো ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে।