ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জনবল

ভোলার অর্ধশতাধিক চরে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত ৩ লাখের বেশি মানুষ

আদিল হোসেন তপু, ভোলা
প্রকাশিত: ১০:২৩, ১১ আগস্ট ২০২৬
ভোলার অর্ধশতাধিক চরে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত ৩ লাখের বেশি মানুষ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসাসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ভোলার অর্ধশতাধিক দুর্গম চরাঞ্চলের তিন লাখের বেশি মানুষ। পর্যাপ্ত কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, চিকিৎসক-জনবল ও ওষুধের সংকটে এসব এলাকার মানুষ পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নদীপথে উপজেলা সদরে নেওয়ার আগেই অনেক সময় ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। চরাঞ্চলে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি স্থানীয়দের।

  • দ্রুত জনবল নিয়োগ ও ঔষুধ সংকট নিরোসনে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখা হয়েছে বলে জানান ভোলা সিভিল সার্জন মনিরুল ইসলাম

মেঘনার বুকে জেগে ওঠা দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের চর বৈরাগী। প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় আগে জেগে ওঠা এই চরে বসতি গড়ে তুলেছেন কয়েক হাজার মানুষ। কিন্তু মানুষের বসতি বাড়লেও বাড়েনি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা। নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাকেন্দ্র, নেই নিয়মিত চিকিৎসক কিংবা ওষুধের ব্যবস্থা। অসুস্থ হলে চরবাসীর ভরসা স্থানীয় কয়েকটি ফার্মেসি আর হাতুড়ে চিকিৎসা।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর নদীভাঙনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে আছে উপকূলীয় জেলা ভোলার চরাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ।
জেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত ছোট-বড় অর্ধশতাধিক চরে বসবাস এসব মানুষের। কিন্তু দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে মৌলিক চিকিৎসাসেবাই যেন তাদের কাছে দুর্লভ।

Advertisement

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, ৬ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ভোলার অনেক চরেই নেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কোথাও স্থাপনা থাকলেও নিয়মিত সেবা, জনবল ও ওষুধের সংকট রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েন গর্ভবতী নারী ও শিশুরা। প্রসবকালীন জটিলতা কিংবা গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিলে দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। জরুরি সময়ে নৌযান না পাওয়া কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পথেই মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি চরবাসীর।

চরের একটি বিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষক ইয়ানুর বেগম জানান, তাদের চরে  যারা বসবাস করে তারা অনেক অসহায়। চরের বেশির ভাগ গর্ভবতী মাকে  চিকিৎসার জন্য  অনেক কষ্ট পেতে হচ্ছে। চরে কোন সেবাই পাচ্ছে না। চরে যদি একটা ক্লিনিক  থাকতো তাহলে কিছুটা সেবা ওষুধ পাইতো। এখন সেবা না পাওয়াতে ব্যাথা উঠলে কয়েকদিন ভুগে তারপরে হাসপাতালে নিতে হয়। তাও জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। যদি যানবাহন লাইন করতে পারলে নিতে পারি। নিলে আল্লাহর হুকুম হলে বাঁচে না হলে মারাই যায়। সব মানুষ তো মা বাঁচায়া রাখা যায় না। 

চর বৈরাগী চরের গৃহীনি রেহানা বেগম বলেন, চরে ক্লিনিক না থাকায় আমরা অনেক দূরের  পথ হেটে গিয়ে ফার্মেসী থেকে ঔষুধ কিনে আনতে হয়। বাবা- মা বয়স্ক রা অসুস্থ  হলে আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করে থাকি। টাকা জোগার করে তারপরে ট্রলার দিয়ে ওপারে যাই। তারপর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা চালাই।  এছাড়া আমরা আর কিছুই পারিনা। চরে সেবা বলতে কিছুই নাই। হাসপাতাল নাই ক্লিনিক নাই। 

চরের আরেক গৃহবধূ  রহিমা বেগম বলেন, আমাদের চরে কোন ডাক্তার নাই। আমরা কোন চিকিৎসা নিতে পারিনা।আমাদের বাচ্চাদের কোন অসুখ হলে ডাক্তার দেহাতে পারিনা। বাচ্চা অসুস্থ হলে বাসায় নিয়ে রাখতে হয়। অনেক কষ্ট আমাদের। উপারে খেয়া দিয়ে যাইতে একদিন অপেক্ষা করতে হয়। চরে একটা কমিউনিটি ক্লিনিক দরকার। 

চরের বাসিন্দা ফাতেমা বলেন, ‘আমরা যারারচরে বসবাস করি তারা অনেক আতংকে থাকি। চরের কেউ অসুস্থ হলে ভালোমতো সেবা পায়না। যদি রাইতে কারো ব্যাথা বা অসুস্থ  হয় তাইলে ভুইগ্যা থাকতে হয়। আল্লাহর উপর ভরসা করে থাকতে হয়। সেবা নিতে হলে ভোলা যাইতে হয়। তাও তাড়াতাড়ি যেতে পারেনা। জোয়ার ও খেয়ার  উপর নির্ভর করে উত্তাল মেঘনা পারি দিয়ে গিয়ে সেবা নিতে হয়। এছাড়াও চিকিৎসা হয় না। কিছু দিন আগে এক মহিলার ডেলিভারি হইছে হাসপাতালে নেওয়ার আগে মারা গেছে।’
চরের বয়স্ক আলী আজগর বলেন, আমরা চরে যারা বসবাস করি আমরা আমাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আমরা ভোট দিয়ে এমপি বানাই, চেয়ারম্যান বানাই,মেম্বার বানাই তারা আমাগো খোঁজ নেয় না। আমাদের চরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নাই। কেউ এটা সমাধান করেনা।  রাতে অসুস্থ হলে একটা স্পিডবোট ও নাই  যে জরুরি প্রয়োজনে সদর হাসপাতালে নিবো।  দয়াকরে আমাদের চরের মানুষের কথা চিন্তা করে ক্লিনিক ও ওষুধের ব্যবস্থা করে দিন। 

শুধু চর বৈরাগী নয় একই চিত্র ভোলার দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, মনপুরা ও সদর উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলেও।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংকটের পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসক, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি। কোথাও কোথাও ওষুধ সরবরাহও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ রয়েছে।

মদনপুর চরের চেয়ারম্যান প্রার্থী, জামাল উদ্দিন বলেন, মদনপুর চরে স্বাস্থ্যসেবা বলে কিছুই নাই। এই চরের মানুষের আল্লাহ আমাদের বাচিয়ে রাখছে বলে আমরা আছি।  এই চরে ফার্মেসী কিছু টেবলেট, বড়ি বিক্রি করে এছাড়া কোন ভালো ব্যবস্থা নাই। আমরা চাই চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য স্থায়ী ক্লিনিক এর ব্যবস্থা করা হউক। যাতে চরবাসী চিকিৎসা সেবা সব সময় পায়। 

দৌলতখান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আনিসুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলের যে স্বাস্থ্যসেবা এটা ব্যহত হওয়ার মূল কারন হচ্ছে জনবল ও অবকাঠামো গত সমস্যা । তার সাথে প্রতিকূল আবহাওয়া বিদ্ধমান। কিন্তু তার পরেও আমরা সরকারের সাথে কথা বলা আছে। আমার আশাকরি জনবল সংকট দূর হবে। চরে আরো ক্লিনিক স্থাপন হলে সেবা দেওয়া সহজ হবে। 
পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ভোলার সহকারী পরিচালক ডা. অচিন্ত কুমার ঘোষ জানান,আমাদের ভোলা একটা  দ্বীপ জেলা। তারপরে তার মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো চরাঞ্চল। যেখান থেকে সেবা নেওয়ার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কমপ্লেক্সে পৌছাতে পারেনা। চরে যদি আমরা সার্ভিস।দিতে পারতাম তাহলে তারা সেবা পেতো। আমাদের বেশ কিছু রিমোট এলাকায় এফডব্লিউসি বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই। এর মধ্যে মনপুরা উপজেলা অন্যতম। আমরা যদি যেসব চর ও ইউনিয়নে সেবা কেন্দ্র নেই সেখানে  স্থাপনার করার মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া যেত তাহলে সবাইকে সুন্দর  ভাবে সেবা দিতে সহজ হতো।  ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে যেখানে স্থাপনা নেই, সেখানে যেন সেবা কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এছাড়াও যেসব জায়গার জনবল সংকট রয়েছে দ্রুত  জনবল নিয়োগ দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।আশাকরি জনবল সংকট নিয়োগ হলে কিছুটা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে। 

ভোলা সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবাতেও রয়েছে বড় ঘাটতি। দুর্গম এলাকায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জনবল না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা পৌঁছানো যাচ্ছে না বলে স্বীকার করছেন। দ্রুত জনবল নিয়োগ ও ঔষুধ সংকট নিরোসনে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখা হয়েছে। 

ভোলা জেলায় ৭১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে মাত্র ৪৭টি ইউনিয়নে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এর বাইরে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

নদীবেষ্টিত ভোলার চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা যেমন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে, তেমনি চিকিৎসার অধিকার পেতেও প্রতিদিন লড়তে হচ্ছে তাদের।
চরবাসীর দাবি নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনে নৌ-অ্যাম্বুলেন্সসহ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। 
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
ট্যাগ: ভোলা
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!