জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মাছের প্রজনন মৌসুম বিবেচনায় প্রতিবছরের মতো জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা জারি করে বন বিভাগ। এ সময় সম্পূর্ণ আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় উপকূলীয় পরিবারের জীবনযাত্রা স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
শ্যামনগরের দাতিনাখালী গ্রামের জেলে লতিফ গাজী বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে ট্রলার মেরামতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিন মাসের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, "সুন্দরবন বন্ধ থাকায় মহাজন ও এনজিওর কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে। সামনে বন খুলছে ঠিকই, কিন্তু আসল ভয় বনদস্যুদের নিয়ে। বনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগেই আতঙ্কে রাত কাটছে, না জানি কখন ডাকাতের কবলে পড়তে হয়!
.png)
একই আতঙ্কের কথা জানান গাবুরা এলাকার জহিরুল ইসলাম। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "আগে বনে ঢুকতে মূল ভয় ছিল বাঘের, আর এখন প্রধান আতঙ্ক বনদস্যু। গত ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটেছে। বর্তমানে বন বিভাগের পাস নেওয়ার পাশাপাশি দস্যু বাহিনীকেও মাসিক চাঁদা দিয়ে বিশেষ 'স্লিপ' নিতে হয়। চাঁদা না দিলে জেলেদের জিম্মি করে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় এবং পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়।"
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে বনদস্যু দমনে বিভিন্ন সময় আশ্বাসের কথা বলা হলেও বাস্তবে কার্যকর কোনো উদ্ধার অভিযান বা যৌথ তৎপরতা দেখা যায় না। এর সুযোগে ডাকাত দলের দৌরাত্ম্য দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞার তিন মাসে অসাধু চক্র বনের অভয়ারণ্যে ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং ফাঁদ পেতে হরিণ শিকারের মতো মারাত্মক অপরাধে লিপ্ত ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কেবল জেলেই নন, আর্থিক সংকটে বিপর্যস্ত পর্যটন খাতও। মুন্সিগঞ্জের পর্যটকবাহী ট্রলার মালিক সমিতির কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জানান, তিন মাস ট্রলার অলস বসে থাকায় নোনা জলে কাঠ নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ট্রলার মেরামত ও আলকাতরা দিতে বিপুল অর্থ খরচ হয়েছে। পাস খোলার পর উপার্জিত অর্থ দিয়ে ঋণের কিস্তি শোধ করবেন, নাকি পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করবেন—তা নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তারা।
সার্বিক বিষয়ে সুন্দরবন বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ইরফান হোসেন জানান, প্রজনন ও সংরক্ষণ মেয়াদের আইনি বাধ্যবাধকতা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়ম অনুযায়ী জেলে, বাওয়ালি ও পর্যটকদের বনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে বনাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বনজীবীদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি আশ্বাস দেন।