ঢাকা,  শুক্রবার   ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

পদ্মার চাপ, মহানন্দা-পুনর্ভবার স্রোতে প্লাবিত ৫ ইউনিয়ন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৮:১৯, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পদ্মার চাপ, মহানন্দা-পুনর্ভবার স্রোতে প্লাবিত ৫ ইউনিয়ন
পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি ও গ্রামীণ সড়ক

চাঁপাইনবাবগঞ্জে হু হু করে বাড়ছে পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি। টানা সাত দিনের পানি বৃদ্ধিতে জেলার সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার নদীতীরবর্তী  পাঁচটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল  প্লাবিত হয়েছে। কোথাও ঘরের আঙিনা, কোথাও বসতঘরের আশপাশে পানি জমেছে। তলিয়ে গেছে আমন-আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও শাকসবজির ক্ষেত। প্লাবিত হয়েছে ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রশাসনের হিসাবে ইতোমধ্যে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার। এর মধ্যে সদর উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ এবং শিবগঞ্জে ৭০০ পরিবার রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, আপাতত তিন নদীর কোনোটি বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা নেই। পূর্বাভাস অনুযায়ী শনিবার পর্যন্ত পানি বাড়তে পারে, এরপর কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ এরই মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে যাতায়াত, বিশুদ্ধ পানি, রান্না, গবাদিপশু ও ফসল রক্ষা নিয়ে। ফলে বড় বন্যার আশঙ্কা না থাকলেও প্রশ্ন উঠেছে, পানি আরও বাড়লে নিম্নাঞ্চলের এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে কতটা দ্রুত সহায়তার আওতায় আনা যাবে।

Advertisement

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পদ্মার পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ২১ দশমিক ৭৬ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ২২ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি। এর আগের দিন সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি বেড়েছিল ১১ সেন্টিমিটার।

শুধু পদ্মা নয়, জেলার অন্য দুই প্রধান নদী মহানন্দা ও পুনর্ভবার পানিও বাড়ছে। মহানন্দার খালঘাট গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ১৯ দশমিক ৪৩ মিটার। এ নদীর বিপৎসীমা ২০ দশমিক ৫৫ মিটার। অন্যদিকে পুনর্ভবার রহনপুর গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ১৯ দশমিক ৪৬ মিটার, বিপৎসীমা ২১ দশমিক ৫৫ মিটার। গত ২৪ ঘণ্টায় মহানন্দা ও পুনর্ভবা, দুই নদীতেই পানি বেড়েছে ১০ সেন্টিমিটার করে।

পদ্মার পানি বাড়ায় সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর, পাঁকা ও চরাঞ্চলের নিম্নভূমিতে পানি ঢুকেছে। শিবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়নের চরপাঁকা, লক্ষ্মীপুর ও নতুনপাড়া এলাকায় বেশ কিছু বসতবাড়িতে পানি ঢোকার খবর পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ ভবনসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কথাও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাজির হোসেন জানান, পদ্মায় পানি দ্রুত বাড়ছে। এখনো সব এলাকায় বাড়িঘর ও রাস্তায় পানি ঢোকেনি। তবে কয়েকটি স্থানে নদীভাঙন চলছে। পানি এভাবে বাড়তে থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
শিবগঞ্জের দুর্লভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম আজম জানান, ইউনিয়নের কয়েকটি নিম্নাঞ্চলে পানি ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু পাকা আউশ ধানখেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষকেরা দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, পানি বৃদ্ধির কারণে চরপাঁকা, লক্ষ্মীপুর ও নতুনপাড়া এলাকায় বেশ কিছু বাড়িতে পানি ঢুকেছে। পানিবন্দী পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

পানি বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩৬২ হেক্টর জমির আমন-আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও শাকসবজি পানিতে তলিয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আতিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। প্লাবিত এলাকার মানুষ গবাদিপশু, ঘরের জিনিসপত্র ও ফসল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সমস্যায় পড়েছেন।

স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, পানি দ্রুত না কমলে নিমজ্জিত ধান ও অন্যান্য ফসলের ক্ষতি আরও বাড়বে। বিশেষ করে যেসব জমিতে ফসল কাটার সময় এখনো হয়নি, সেসব জমির কৃষকেরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসাসহ ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার ইকরামুল হোসাইন জানান, পানিবন্দী মানুষের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশুদ্ধ পানি, রান্নার জায়গা, গবাদিপশুর খাদ্য ও চলাচল নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন তারা। অনেক পরিবার ঘরের মালামাল ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।

প্লাবিত এলাকার পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছে উপজেলা প্রশাসন। সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে ছিলেন উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার ইকরামুল হোসাইন, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আল আওয়াল, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. শাহীনুর রহমান, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কাঞ্চন কুমার দাস, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন এবং নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাজির হোসেন।

শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, প্লাবিত এলাকায় শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম জানান, শিবগঞ্জের তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ২৫০ পরিবারের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ত্রাণ সহায়তার আওতায় আনা হবে।

জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মূসা জঙ্গী বলেন, সদর উপজেলার প্রায় ১ হাজার ৮০০ এবং শিবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৭০০ পরিবারসহ মোট আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে চাল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ধাপে ধাপে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, উজানে ভারত থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টির পানিতে জেলার নদ-নদীর পানি বাড়ছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী শনিবার পর্যন্ত পানি আরও বাড়তে পারে। এরপর পানি কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে তিনটি নদীর পানিই বিপৎসীমার নিচে থাকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।

তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও নদীর পানি বৃদ্ধির চাপ ইতোমধ্যে নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় পড়েছে। পানিবন্দী পরিবারগুলোকে বিশুদ্ধ পানি, খাবার, গবাদিপশুর খাদ্য, যাতায়াত ও ফসল রক্ষায় বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পানি আরও কয়েক দিন স্থায়ী হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে। তাই বড় বন্যার আশঙ্কা না থাকার পূর্বাভাস স্বস্তি দিলেও নদীতীরের মানুষের দুশ্চিন্তা কাটছে না। তাদের এখন একটাই অপেক্ষা, পদ্মাসহ তিন নদীর পানি দ্রুত কমে গিয়ে প্লাবিত এলাকা থেকে পানি সরে যাক এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারুক পানিবন্দী পরিবারগুলো।

ডেইলি-বাংলাদেশ/চাঁপাই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!