ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

বাবা-ছেলের নিয়ন্ত্রণে ইউনিয়ন ভূমি অফিস

নোয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:২৭, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাবা-ছেলের নিয়ন্ত্রণে ইউনিয়ন ভূমি অফিস
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরকারি সেবা দিতে গিয়ে অনিয়ম, ঘুষ আদায় ও দালালনির্ভরতার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিনের বিরুদ্ধে সরকারি নিয়োগ ছাড়াই নিজের ছেলে নাইম হোসেনকে অফিসে বসিয়ে কম্পিউটার অপারেটরের কাজ করানোর অভিযোগও করেছেন সেবাগ্রহীতারা।

সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও অতিরিক্ত টাকা না দিলে এ ভূমি অফিস থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন। কয়েকজন দালালের মাধ্যমে পরিচালিত একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে অফিসের কার্যক্রম চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি নিজের জমির নামজারি করতে দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান এক নারী। অভিযোগ রয়েছে, কয়েক দিন অফিসে ঘোরার পরও কাজ না হওয়ায় একপর্যায়ে তাকে ঘুষের টাকা নিয়ে আসতে হয়। চড়া সুদে ৮ হাজার টাকা সংগ্রহ করে আনলেও দাবি করা ৯ হাজার টাকা দিতে না পারায় শুরু হয় দেনদরবার।

Advertisement

এ ঘটনায় ঘুষের টাকা নিয়ে ওই নারীর সঙ্গে তহসিলদার জয়নাল আবেদিনের কথোপকথনের একটি ভিডিও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ভিডিওতে ওই নারীকে বলতে শোনা যায়, ‘সুদে টেঁয়া লই কাম ইয়ান করি আটকি গেছি। অন আঁত্তুন ওগগা হাজার টেঁয়া কম নেন। আননে নয় হাজার টেঁয়া চাইছেন, আঁই আন্নেরে আস্টে হাজার টেঁয়া দিছি।’

অভিযোগ রয়েছে, জয়নাল আবেদিনকে ঘিরে পাঁচ থেকে সাতজনের একটি দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে মতিউল ইসলাম শামিম, সাহাদাত হোসেন ও অফিস সহকারী মোস্তফার নাম উল্লেখ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। তাদের দাবি, দালালদের মাধ্যমে না গেলে অনেক সময় ফাইল এগোয় না।

সরকারি নিয়োগ ছাড়াই অফিসে ছেলে

অন্যদিকে, কোনো সরকারি নিয়োগ ছাড়াই তহসিলদার জয়নাল আবেদিনের ছেলে নাইম হোসেন বাবার অফিসে বসে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধেও সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে সাধারণত ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ, নামজারি ও মিউটেশন আবেদনের যাচাই-বাছাই ও তদন্ত, বিভিন্ন ধরনের খতিয়ান সংরক্ষণ ও হালনাগাদ, খাসজমি বন্দোবস্তের প্রস্তাব তৈরি এবং জমির সীমানা ও মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধের প্রাথমিক তদন্তসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেওয়া হয়।

সরকার নির্ধারিত ফি অনুযায়ী ই-নামজারির জন্য ১ হাজার ১৭০ টাকা, খতিয়ানের অনলাইন বা সার্টিফাইড কপির জন্য ১২০ টাকা, মৌজা ম্যাপের প্রতি শিটের জন্য ৫৪৫ টাকা এবং খতিয়ান সংশোধনের আবেদনের জন্য ২০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে।

তবে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নির্ধারিত ফি দিয়ে সরাসরি সেবা নিতে গেলে দিনের পর দিন অফিসে ঘুরতে হয়। একপর্যায়ে হয়রানি এড়াতে বাধ্য হয়ে দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কাজ করাতে হয়।

ঘুষের টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ

ঘুষের টাকা নিয়ে কথোপকথনের ভিডিওর বিষয়ে তহসিলদার জয়নাল আবেদিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ভিডিওটির সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে বলি আমাকে কাজ দিয়েন না, আমি বয়স্ক মানুষ। মাফ চাই, আমি নিজের জন্য টাকা নেই না। কাজ না হলে ওই মহিলার টাকা ফিরিয়ে দিবো। এই টাকা উপজেলা ভূমি অফিসকে ভাগ করে দিতে হয়। সবাই ভাগ পায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘টাকা ছাড়া কাজ নিয়ে গেলে বলে—বিনা পয়সার কাম কিল্লাই আনছেন? মক্কেল পাঠায় দেন।’

কারা এই টাকা নেন—এমন প্রশ্নের জবাবে জয়নাল আবেদিন বলেন, দেওটি তহসিল অফিস ‘মেইনটেইন’ করেন উপজেলা ভূমি অফিসের আনোয়ার। একইভাবে নাজমুল, ফরহাদসহ অন্যরাও আলাদা আলাদা তহসিল অফিস ‘মেইনটেইন’ করেন বলে দাবি করেন তিনি।

নির্ধারিত টাকা দিতে না পারলে সেবাগ্রহীতাকে উপজেলা ভূমি অফিসে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয় বলেও জানান তিনি। সহকারী কমিশনার (ভূমি) কত টাকা পান এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার হাত-পা বাঁধা, তবে এটুকু বলি সবাই ভাগ পায়।’

ছেলের কাজ করার বিষয়টি স্বীকার

নিজের ছেলে কোনো সরকারি নিয়োগ ছাড়াই অফিসে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন এ বিষয়টিও স্বীকার করেছেন তহসিলদার জয়নাল আবেদিন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সোনাইমুড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি ভূমি অফিসে দালালনির্ভরতা, ঘুষ লেনদেন এবং নিয়োগবহির্ভূত ব্যক্তির মাধ্যমে সরকারি সেবা দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: নোয়াখালী
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!