ঢাকা,  সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

১৭ বছর ধরে পারাপারে ভরসা ‘ড্রামের ভেলা’!

কামাল হোসেন, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:৪৩, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৭ বছর ধরে পারাপারে ভরসা ‘ড্রামের ভেলা’!
১৭ বছর ধরে ড্রামের ভেলায় পারাপার। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পূর্বপাশে শাকবাড়িয়া নাদী। নদীর ওপারে সুন্দরবন। আর দক্ষিণে প্রশস্ত খাল। এর মধ্যে সবুজ-শ্যামল, শান্ত, ছায়াঘেরা, মনোরম এক গ্রাম। গ্রামটিতে রয়েছে ফসলের মাঠ, রয়েছে মাছের ঘের। বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিক। গ্রামটির নাম মঠবাড়ী। এটির অবস্থান খুলনা জেলার কয়রা উপজেলায়।

একসময়ের সবুজ-শ্যামল, ছায়াঘেরা, মনোরম পরিবেশ বর্তমানে দেখা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০০৯ সালে গ্রামটির ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় আইলা। এ সময় শাকবাড়িয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণ পানিতে তলিয়ে যায় গ্রামটি। তিন বছর ধরে চলে জোয়ার-ভাটা। জোয়ার-ভাটা উঠানামা করায় গ্রামটির মাঝখান দিয়ে সৃষ্টি হয় খাল। এই খালই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে গ্রামটিকে।

১৭ বছর অতিবাহিত হলেও খালটির ওপর বাঁধ না হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের ভেলায় পারাপার হতে হচ্ছে গ্রামবাসীকে।

Advertisement

স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্ষায় নদীর পানি বেড়ে গেলে ভেলায় পারাপার আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বয়স্কদের চলাচলে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন দেখা গেছে, সৃষ্টি হওয়া খালটির দুই পাড়ের দূরত্ব প্রায় ১৭০ মিটার। পশ্চিম পাড়ে  রয়েছে প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। খালের পূর্বপাশ থেকে ওপারে একটি রশি বাধা আছে। আর সেই রশি ধরে টেনে টেনে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। রাস্তা বা স্থায়ী কোনো সেতুর ব্যবস্থা না থাকায় যেখানে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের ভেলায় ওপারে পারাপার হতে দেখা গেছে।

প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমা খাতুন বলেন, এই স্থান দিয়ে আমাদের প্রতিদিন ড্রামের ভেলায় চড়ে স্কুলে যেতে হয়। পরানডা ভয়ে কাঁপে, কখন না জানি উল্টে যায়। যেকোনোভাবেই আমাদের স্কুলে যাওয়ার জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হোক।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া বলেন, ড্রামে চড়ে ওপারে স্কুলে যেতে খুব ভয় হয়। একবার ভেলা উল্ডে নদীতে পড়ে গিয়েছিলাম। আমাদের বইয়ের ব্যাগ ও সব ভিজে যায়। পাশে লোকজন থাকায় কোনোমতে জীবনটা রক্ষা হয় আমাদের। আমরা চাই এখানে একটা সেতু হোক, আমরা যাতে ভালোভাবে স্কুলে যেতে পারি।

প্রতাপ স্মরণী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অবিভাবক হোসনেয়ারা খাতুন বলেন, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর পর খুব চিন্তায় থাকতে হয়। একবার ভেলায় পার হতে গিয়ে নদীতে পড়ে কোনোমতে আমার মেয়েসহ আরো কয়েকটা বাচ্চা প্রানে বাঁচে। নতুন সরকারের কাছে দাবি জানাই, রাস্তাটা যেন দ্রুত নির্মাণ করা হয়।

বিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) প্রধান শিক্ষক রণজিৎ কুমার মন্ডল বলেন, ২০০৯ সালে আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এখানে একটি বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিনিয়ত বাচ্চাদের ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের ভেলায় পারাপার হতে হয়। অনেক অভিভাবক এখন যাতায়াতের সমস্যার  কারণে বাচ্চাদের এই স্কুলে ভর্তি করাতে চায় না। 

এই স্থানে স্থায়ী বাঁধ ও নিরাপদ সড়ক নির্মাণ করা হলে কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও কমবে। শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর সুবিধার্থে দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

মহারাজপুর ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু সাঈদ বলেন, ১৭০ মিটারের বেশি এই ভাঙায় ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য বরাদ্দ দিয়ে কাজ করা সম্ভব নয়। এখানে গভীরতাও অনেক বেশি । প্রতিনিয়ত এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের এভাবেই পারাপার হতে হয়। একটি ভাসমান সেতু কিংবা বাঁধটি স্থায়ীভাবে বাঁধা গেলে দীর্ঘদিনদের ভোগান্তির অবসান হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সুলতান মাহমুদ বলেন, প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন বাঁধটি পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বরাদ্দের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/খুলনা/জেডআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!