ঢাকা,  শুক্রবার   ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]
বিশ্ব ডাক দিবস আজ

চিঠির দিন ফুরিয়েছে, নতুন সেবায় টিকে আছে কয়রার ডাকঘর

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৯:৪৮, ৯ অক্টোবর ২০২৬
চিঠির দিন ফুরিয়েছে, নতুন সেবায় টিকে আছে কয়রার ডাকঘর
কয়রা উপজেলা পোস্ট অফিস। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

একসময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই ঘরের দরজায় ছুটে যেতেন পরিবারের সদস্যরা। দূরদেশে থাকা সন্তানের চিঠি কিংবা প্রিয়জনের খবর হাতে পেতে অপেক্ষার প্রহর গুনতেন স্বজনেরা। একটি চিঠিকে ঘিরেই তৈরি হতো আনন্দ, উৎকণ্ঠা আর আবেগের মুহূর্ত। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত। ব্যক্তিগত চিঠির জায়গা দখল করেছে পার্সেল, রেজিস্ট্রি ডাক, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সেবা। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় বদলে যাওয়া বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুনভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছে খুলনার কয়রা উপজেলা ডাকঘর।

আজ ৯ অক্টোবর, বিশ্ব ডাক দিবস। দিবসটি সামনে রেখে কয়রার ডাকসেবার বর্তমান চিত্রে দেখা যাচ্ছে, যোগাযোগের মাধ্যম বদলে গেলেও ডাকঘরের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। বরং মানুষের চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে ডাকসেবার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন।

স্থানীয় ডাকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় ডাকঘরের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল ব্যক্তিগত চিঠি আদান-প্রদান। দূর-দূরান্তে থাকা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মানুষ নিয়মিত চিঠি পাঠাতেন। প্রিয়জনের লেখা কয়েকটি লাইন পড়তে অপেক্ষা করতে হতো দিনের পর দিন। বর্তমানে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার অনেক কমে গেছে।

কয়রার ৮০ বছর বয়সী বাসিন্দা সফেদ আলীর স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল সেই দিনগুলো। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন, ডাকঘরের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিঠি বিলি করতেন। চিঠি এলে পরিবারের সবাই মিলে তা পড়তেন। এর মাধ্যমে দূরে থাকা আত্মীয়-স্বজনের খবর পাওয়া যেত। এখন মোবাইল ফোনের সাহায্যে মুহূর্তেই কথা বলা ও খোঁজখবর নেওয়া যায়। তাই আগের মতো চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না।

চিঠির বদলে নতুন ব্যস্ততা

ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমলেও ডাকঘরের কার্যক্রম থেমে নেই। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেবার ধরন। পার্সেল ও পণ্য পরিবহন, রেজিস্ট্রি ডাক এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র আদান-প্রদানের মতো কাজে এখনও ডাকঘরের ওপর নির্ভর করছেন অনেকে।

অনলাইনভিত্তিক কেনাবেচার বিস্তারের ফলে পণ্য পরিবহনেও ডাকসেবার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র পাঠানো এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ডাকব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

উপকূলীয় ও প্রত্যন্ত উপজেলা হওয়ায় কয়রায় ডাকসেবার গুরুত্বও ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। উপজেলার সব এলাকায় দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবা সমানভাবে সহজলভ্য নয়। এ বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, পণ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী আদান-প্রদানে ডাকব্যবস্থা এখনও কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

স্থানীয়দের মতে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ডাকঘরের সেবাও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয়, সেবার গতি বৃদ্ধি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সহজে সেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে ডিজিটাল যুগেও ডাকঘরের গুরুত্ব বজায় থাকবে।

স্বল্প খরচে দ্রুত সেবার প্রত্যাশা

কয়রা উপজেলা পোস্টমাস্টার সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ডাকসেবার ধরনেও পরিবর্তন আসছে। প্রচলিত সেবার পাশাপাশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে স্পিড পোস্ট সেবা চালু হওয়ায় স্বল্প খরচে যেকোনো মালামাল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে মানুষ আবারও ডাকঘরে সেবা নিতে আসছেন।

একসময় চিঠির খামে জমা হতো প্রিয়জনের ভালোবাসা, অপেক্ষার গল্প আর দূরত্ব পেরিয়ে আসা অনুভূতি। এখন সেই খামের সংখ্যা কমেছে, কমেছে ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকার অভ্যাসও। তবে পার্সেল, জরুরি নথিপত্র ও আধুনিক ডাকসেবার মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন মেটাতে এখনও কাজ করছে কয়রা উপজেলা ডাকঘর। বদলে গেছে শুধু ব্যস্ততার ধরন, বদলে গেছে সেবার ভাষা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/খুলনা/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!