বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানি হওয়া ইউরিয়ার প্রায় ৪৯ শতাংশ সরবরাহ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে, যার একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত ২ মার্চ ইরান যখন এই প্রণালিটি কার্যত বন্ধ ঘোষণা করে, তখন থেকেই সার সরবরাহ ব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হয়।
‘ট্রেডিং ইকোনমিকস’-এর তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি টন ইউরিয়ার দাম ৪৫০ ডলারের মধ্যে থাকলেও মার্চে তা ৬৮০ ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া সারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অ্যামোনিয়ার ৩০ শতাংশ এই অঞ্চল থেকে আসায় এর দামও প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
.png)
এই মূল্যবৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন উত্তর গোলার্ধের কৃষকরা বসন্তকালীন বপন মৌসুম শুরু করছেন। কাতারসহ প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলো অবকাঠামোগত ক্ষতি ও হামলার আশঙ্কায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে পথ বন্ধ থাকায় উৎপাদিত সারও বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। কৃষি অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, উপকরণ বা ইনপুট কমলে উৎপাদনও কমে যায়। ফলে নাইট্রোজেনভিত্তিক এই সারের সংকট বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই সংকট অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের সারের চাহিদার বড় অংশই মেটানো হয় সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানির মাধ্যমে। বিশেষ করে কাতার ও আমিরাত থেকে প্রধানত ইউরিয়া আমদানি করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি, অতিরিক্ত বীমা খরচ এবং পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে আমদানিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সার দেশে পৌঁছাতে না পারলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
সারের পাশাপাশি এই সংকটের ঢেউ লেগেছে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পেও। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ হিলিয়াম গ্যাস সরবরাহ করে কাতার, যা মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হয়। সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদন, এমআরআই যন্ত্র এবং মহাকাশ গবেষণায় হিলিয়াম অপরিহার্য। কিন্তু তরল হিলিয়াম নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সংরক্ষণ করা যায় না বলে প্রণালিতে আটকে থাকা এই মূল্যবান গ্যাসের গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতও এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, সংঘাত যদি আরো কয়েক সপ্তাহও স্থায়ী হয়, তবে তা সরাসরি বপন মৌসুমে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে প্রধান খাদ্যশস্য, পশুখাদ্য, এবং এর ফলে দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় খুব কম দেশই যথেষ্ট সক্ষম।