ব্রেইল লিপিকে বাংলায় লেখার সফটওয়্যার আনল ঢাবি
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের হস্তলিখিত ব্রেইল লিপিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত করার সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের (আইআইটি) এক গবেষক দল এটি উদ্ভাবন করেন। অন্য ভাষায় ‘ব্রেইল থেকে টেক্সট’-এ রূপান্তরের সফটওয়্যার থাকলেও বাংলা টেক্সট-এ রূপান্তরের এটিই প্রথম সফটওয়্যার।
বুধবার (৩১ আগস্ট) বেলা ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে ‘ব্রেইল থেকে বাংলা টেক্সট’-এ রূপান্তর করার এই সফটওয়্যারটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক, শিক্ষকবৃন্দ, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. আহমেদুল কবীর প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ অতিথিদের সামনে সফটওয়্যারটির ব্যবহার সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহাম্মদ শোয়াইব এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি গবেষক দল এই অফলাইন ডেস্কটপ সফটওয়্যারটি তৈরি করেন। এ দলের বাকিরা হলেন একই ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক আহমেদুল কবীর এবং শিক্ষার্থী মিনহাজ কামাল, আতিক আহম্মেদ, মো. আরমান হোসেন এবং সাদিকুল হক সাদি।
শিক্ষিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের লেখন পদ্ধতি ব্রেইল একটি টেকটাইল বা স্পর্শ নির্ভর পদ্ধতি যা শুধু এই ফিল্ডের অভিজ্ঞজনরাই পাঠ করতে পারেন। কিন্তু আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মিত এ সফটওয়ারের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা বাংলার পাঠোদ্ধার করতে পারবেন মাত্র কয়েক ক্লিকেই৷ দৃষ্টিহীনদের সঙ্গে বাকিদের লৈখিক যোগাযোগ দূরত্ব কমানোর একটি মাইলফলক হওয়ার সমস্ত সম্ভাবনা আছে এ সফটওয়্যারটির৷
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭০জনেরও বেশি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন। তারা শ্রুতিলেখকের সহায়তায় বিভিন্ন একাডেমিক পরীক্ষায় অংশ নেন। এতে অনেক সময় খারাপ প্রভাব পরে পরীক্ষায়। তারা ব্রেইলেই উত্তর লেখার সুযোগ পেলে এ সফটওয়ারের মাধ্যমে তা পাঠোদ্ধার করে তাদের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা আরো যুক্তিযুক্ত হবে বলে মতামত শিক্ষাবিদদের।
প্রতিটি বর্ণ বা ক্যারেক্টার লেখার জন্য ছয়টি ডটের বিন্যাস করা হয় ব্রেইল পদ্ধতিতে। এভাবে ৬৪টি ক্যারেক্টারের সমন্বয়ে বাংলা ভাষা, সংখ্যা, চিহ্ন, যুক্তাক্ষর প্রভৃতি প্রকাশ করা হয় বাংলা ব্রেইল লিখন পদ্ধতিতে। গবেষকদের তৈরি সফটওয়্যারটি ব্রেইল থেকে পাঠযোগ্য বাংলা ভাষায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ৯৪ দশমিক ৮১ শতাংশ নির্ভুল ফলাফল প্রদর্শন করে বলে জানিয়েছেন গবেষক দলের সদস্য আহমেদুল কবির।

এরই মধ্যে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, আরবি, হিন্দি, তামিল ও সিংহলী ভাষায় ব্রেইল লিপিকে স্ব স্ব ভাষায় রূপান্তরের পদ্ধতি ছিল। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে এটিই প্রথম এ ধরনের প্রয়াস এবং বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বের যেকোনো দেশের বাংলা ভাষাভাষী দৃষ্টিহীনরা শ্রুতিলেখক বা অন্য কোনো মধ্যবর্তী ব্যক্তির সাহায্য ছাড়াই তাদের মৌলিক কাজ, গল্প, কবিতা সরাসরি তাদের দৃষ্টিহীন সম্প্রদায়ের বাইরের পাঠকের কাছে ছড়িয়ে দিতে পারবে৷
সফটওয়্যারটির বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে এক বা একাধিক পাতার ব্রেইল ডকুমেন্ট একই সঙ্গে প্রক্রিয়াকরণ, সংখ্যা ও ইংরেজি ক্যারেক্টার চিহ্নিতকরণ এবং ফলাফল ডক্স ও পিডিএফ আকারে সংরক্ষণ। সফটওয়্যারটির সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য এটি ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যয়ন ক্ষেত্রে দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিকভাবে ব্যবহার করা হবে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান এই সফটওয়্যার উদ্ভাবনের জন্য গবেষকদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এই সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিভার বিকাশ ও সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড সবার কাছে পৌঁছাতে পারবে। গবেষণা ও উদ্ভাবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
এপ্লিকেশনটির উদ্বোধনের সময় ঢাবি উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামান আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণে এই সফটওয়্যার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে উপাচার্য আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে এই সেবাটি বাংলা ভাষাভাষী সব দৃষ্টিহীন ও সংশ্লিষ্টদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি প্রযুক্তিটির প্যাটেন্ট, বাজারজাতকরণসহ প্রভৃতি বিষয় তদারকি করবেন বলে জানান।