ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]

পরিবার ছেড়ে দূরে, রমজান কাটে মাকে মনে করে

নাঈম আহমদ, শাবিপ্রবি
প্রকাশিত: ১৩:০২, ৫ এপ্রিল ২০২৩
পরিবার ছেড়ে দূরে, রমজান কাটে মাকে মনে করে
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পরিবার ছেড়ে রোজা রাখা অনেক কষ্টের। সেটা যদি হয় ক্যাম্পাসে তাহলে তো আর কথাই নেই। রমজানে ক্লাস পরীক্ষা থাকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হলে কিংবা মেসে অবস্থান করছেন। পরিবার ছেড়ে সেহেরি ও ইফতার কেমন কাটছে? এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর অনুভূতি তুলে ধরা হলো-

‘সেহরির সময় আম্মুর ডাক অনেক মিস করি’

জীবনকে সুন্দর করতে হলে জীবনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তাই তো আজ বাবা-মাকে ছেড়ে বাইরে আছি। আজ প্রায় ৬টা বছর ধরে পরিবার ছেড়ে রমজান কাটাচ্ছি। যখন ইফতার ও সেহেরি করি তখন পরিবারের সবাইকে অনেক মনে পরে। পরিবার ছাড়া রোজা! আম্মুর হাতের বানানো ইফতার ও সেহেরির সময় আম্মুর ডাকাডাকি ছাড়া রমজান বড্ড নিরস লাগে। নিজের ঘরে নিজের বাড়িতে রমজান পালন করার মতো আনন্দ আর কোথাও নেই। তবুও বাইরে এসে এমন কিছু মানুষ পেয়েছি যাদের কাছে পরিবারের মতো ভালোবাসা পাই। আমার মতো হাজারো সন্তান আজ পরিবার ছেড়ে বাইরে আছে। শুধু একটা কারণে, যাতে আগামী দিনগুলো সুন্দর  হয়। সবার এসব উৎসর্গের বদলে জীবনে সফলতা আসুক!

Advertisement

মাহামুদা আফরোজ
৩য় বর্ষ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ


‘সেহেরি-ইফতারের তৃপ্তি টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে’

রমজান মাস ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সঙ্গে কাটানো হয়েছে, তাই বুঝতে পারিনি পরিবার ছাড়া রোজা কেমন কাটতে পারে! হয়তো এখানে যা খাচ্ছি এমন খাবার যদি মা বাড়িতে করতো তাহলে লঙ্কা কাণ্ড ঘটে যেত। এখানে সেহেরি বা ইফতার করার তৃপ্তিটা টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে, কিন্তু নেই পারিবারিক ভালোবাসার ছোঁয়া। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সংগঠন, বন্ধু বা বিভিন্ন গ্রুপের মানুষদের সঙ্গে একত্রে ইফতার করার মাধ্যমে সেই অভাব পূরণের নিরন্তর কৃত্রিম চেষ্টাতেও দেখা যায় লাভ-ক্ষতির হিসেব, তখন শুধু একত্রে খাওয়া ছাড়া আর কোনো তৃপ্তি মেলে না। তবে ভালো দিকটি হলো পরিবার থেকে দূরে রমজান কাটানোর মাধ্যমে বুঝতে পারছি পরিবারের গুরুত্ব এবং এর পাশাপাশি অর্জন করে চলেছি যান্ত্রিক শহরে বিভিন্ন হিসেব-নিকেশ করে টিকে থাকার অভিযোজন ক্ষমতাও।

জাকির হোসেন 
৩য় বর্ষ, বাংলা বিভাগ


‘মা-বাবা ছাড়া ইফতারে তৃপ্তি নেই’

জীবনের প্রয়োজনে পরিবার ছেড়ে দূরে থেকে ইফতারে সবসময়ই ভয়ঙ্কর বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়। কারণ, এখানে বাবা-মা এবং পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে ইফতারে কখনো তৃপ্তি পাওয়া যায় না। বাড়িতে থাকলে কখনো ইফতার তৈরি করা নিয়ে চিন্তা তো দূরে থাক, এগুলো নিয়ে ভাবারও কোন দরকার হয়নি। আর এখন সবকিছু নিজেরই করতে হয়। যা সব সময় বিভিন্ন কারণে ভালো লাগে না। তাছাড়া প্রতিদিনের ক্রয় করা ইফতার সামগ্রী সবসময় খাওয়ার উপযোগী থাকে না। খাদ্য ভেজালের যুগে রমজানে সব কিছুতেই মনে হয় আরো বেশি ভেজালযুক্ত। এগুলো খেয়ে নিজেকে সুস্থ রাখাও বড় কষ্টের কাজ। এজন্য প্রতিদিনই ইফতার করার সময় বাবা-মা এবং বাড়ির কথা অনেক মনে পড়ে। বিশেষ করে মাকে অনেক মিস করি।

মমিন উদ্দিন
পিএসএস বিভাগ
২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ


‘ইফতারে বাবার হাত তুলে মোনাজাতের দৃশ্য চোখে ভাসে’

পরিবার ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দ্বিতীয় রমজান। বাসা থেকে দূরে রমজান মাস কাটানো অনেক কষ্টের। জীবনের তাগিদে পরিবারের মানুষ ছাড়া ক্যাম্পাসে রোজার সময়টুকু পার করতে হচ্ছে। ইফতারের সময় এলে চোখে ভেসে উঠে আব্বা দুইহাতে মোনাজাত ধরেছেন তার সঙ্গে সবাই মোনাজাত ধরেছেন। আর বাসার সবার ছোট মেয়ে আমি মোনাজাতের ফাঁক গলে চোখ দিয়ে ছাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকি কখন আযান হবে আর খেজুর গলায় যাবে। ওপাশ থেকে আব্বা এখনো বলেন বেশি খিদা লাগলে রোজা কলসিতে রেখে খেয়ে নাও, পারবা তো! এখন ছোট মেয়ে সব পারে, তবে জোরপূর্বক। যদিও স্বাস্থ্যহানি কিছুটা হয়েছে হল জীবনযাপন আর নিত্যনৈমিত্তিক জীবন যাপনে যেখানে খাবারের সংগ্রামে বেচে থাকাই মুখ্য। কখনো নিজের হাতে রান্না করে খাই। যখন ব্যস্ততা ঘিরে ফেলে তখন হল ক্যান্টিনে খেতে হয় যা এখন অরুচিকর। কখনো বন্ধুর মেস, কখনো বা রেস্তোরা থেকে খাবার এনে খাই যেখানে মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ পাওয়া দুষ্কর।

আফসানা ইসলাম শিফা
গণিত বিভাগ, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ


‘মরুভূমিতে রুক্ষ গাছের ন্যায় টিকে আছি’

জীবন বলতেই বুঝি সংগ্রাম। বেঁচে থাকার সংগ্রাম নয়, নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম। রমজান মাসে থাকতাম বাসায় পরিবারের ঘরোয়া কাজে হাত বাটাতাম আর অধিকাংশ সময়ই ইবাদতে কাটাতাম। কিন্তু এখন রমজানে মনে হয় রোজা নয় যেন মরুভূমিতে রুক্ষ গাছের ন্যায় টিকে আছি। পকেট গরম তো ভালো ইফতার ও সেহরি আর নয় কাঙাল। তার ওপর যদি ক্লাস থাকে তাহলে তো কথাই নেই। আর ইবাদতে তো নিজেকে জোর করে বেঁধে রেখেছি যদিও দিন শেষে দেহটা আর চলে না। জীবন যেন দিন দিন গাছে গেঁথে থাকা বৃদ্ধ পাতার মতো শুকিয়ে যাচ্ছে। তার পরও বলবো বেঁচে আছি, ভালো আছি।

ইয়াসির ইনজামাম মুগ্ধ
৩য় বর্ষ, গণিত বিভাগ

‘বাড়ির মতো খাবারের চাহিদা মিটে না’

পরিবার ছেড়ে প্রথমবারের মত ক্যাম্পাসে রমজান মাসের সিয়াম আদায় করছি। পরিবার থেকে দূরে থাকাতে স্বভাবতই মন খারাপ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিজের পরিবার ছেড়ে এসে যে এখানে এত সুন্দর একটা পরিবার পাব কখনো ভাবতে পারিনি, সেহরিতে সব বন্ধুরা মিলে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, একসঙ্গে নামাজে যাওয়া, ক্লাস শেষ করে অবসর সময়ে ক্যাম্পাসে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো, ইফতারের সময় বন্ধুরা আর সিনিয়র মিলে একইসঙ্গে ইফতার করা অনেক উপভোগ করি। যদিও বাড়ির মত খাবারের চাহিদা মিটে না। তবুও বলব, এইতো বেশ আছি। কিছুদিন পর হয়তো আপন নীড়ে ফিরব, তখন এই পরিবারটাকে খুব মিস করব, যেরকম প্রথম ক্যাম্পাসে এসে নিজ পরিবারকে মিস করেছিলাম।

আজিজুর রহমান তালুকদার
পিএসএস বিভাগ
২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!