২৫ মার্চ: আজও ঢাবির বাতাসে সেই আতঙ্ক
১৯৭১ সাল, ২৫ মার্চ রাত। আজ থেকে ৫৩ বছর পেরিয়েছে। কিন্তু, বিভীষিকাময় ভয়াল সেই রাত যেন সময় ঘুরে আসে। ভয়াবহতা না থকলেও চাপা আতঙ্ক ও শোকে হাজির হয় দিনটি। ৭১ এর ভয়াবহ কালরাতের প্রভাব পড়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি)। কেননা সব আন্দোলন আর সংগ্রামের সূতিকাগার রচিত হয়েছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাইতো এখনো আঁতকে ওঠেন বর্তমান শিক্ষার্থীরা।
তথ্যকোষ বাংলাপিডিয়া থেকে জানা যায়, ২৫ মার্চ রাতে আরো শহিদ হন ১০৪ জন ছাত্র, ১ জন কর্মকর্তা ও ২৮ জন কর্মচারী। যদিও অন্যান্য উৎস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেই সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়ে গেছে।
৫৩ বছর আগে ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ২৫ মার্চ দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। দিন পেরিয়ে রাত, সুনসান নীরবতায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। রাত যেন গুলি-ট্যাংকের শব্দে এক ভয়াল রাতে সৃষ্টি হয়। শুরু হয় অপারেশন সার্চলাইটের নামে নির্বিচারে নিরীহ মানুষ হত্যা। রাত সাড়ে ১১টা থেকে মধ্য মে পর্যন্ত বড় বড় শহরে অপারেশন সার্চলাইটের অভিযান পরিচালিত হয়। যদিও অপারেশন সার্চলাইট অভিযান শুরুর সময় নির্ধারিত ছিল ২৬ মার্চ রাত ১টা।
তথ্যকোষ বাংলাপিডিয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু মো. দেলোয়ার হোসেন সম্পাদিত লিখা থেকে জানা যায়, যেখানে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা সফল করতে সাতটি পরিকল্পনার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে একটি হলো— ‘ঢাকার অপারেশনকে শতকরা ১০০ ভাগ সফল করতে হবে। এ জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করতে হবে।’
এদিকে আরেক পরিকল্পনায় আট ভাগে ভাগ করেছেন এই অধ্যাপক। যার চার ভাগে বলা হয়েছে, ‘২২নং বালুচ, ১৮ ও ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বাছাই করা একদল সৈন্য আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী শক্তিকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (জহরুল হক হল), জগন্নাথ হল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াকত হল আক্রমণ করবে।’

অধ্যাপক আনোয়ার পাশার উপন্যাস ‘রাইফেল, রোটি, আওরাত’ থেকে জানা যায়, ২৫ মার্চের প্রথম প্রহরে অধ্যাপক ফজলুর রহমান এবং তার দুই আত্মীয় নীলক্ষেতের ২৩ নং ভবনে নিহত হন। তার স্ত্রী দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে বেঁচে যান। পাকবাহিনী অধ্যাপক আনোয়ার পাশা এবং অধ্যাপক রশিদুল হাসানের (ইংরেজি বিভাগ) বাসভবন আক্রমণ করেছিল। তারা দুজনেই খাটের নিচে লুকিয়ে বেঁচে যান। কিন্তু পরবর্তীতে আল-বদর বাহিনীর হাতে তারা প্রাণ হারান। ২৪ নং ভবনে বাংলা সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম থাকতেন। তার বাসভবনে প্রবেশমুখে দুইজন আহত নারী তাদের সস্তানসহ কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের রক্তের দাগ লেগেছিল মাটিতে। পাকবাহিনী যখন তার বাসভবন আক্রমণের জন্য আসে, তখন তারা রক্তের দাগ দেখে ধারণা করে নেয় অন্য কোনো ইউনিট হয়ত এখানে হত্যাযজ্ঞ কাজ সমাধা করে গেছে। তাই তারা আর প্রবেশ করেনি। এভাবে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম নিতান্ত ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।
অধ্যাপক রতনলাল চক্রবর্তীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা: ১৯৭১ জগন্নাথ হল বইতে বলা হয়েছে, ঐ রাতে সেখানে গণহত্যার শিকার হয়েছিল চার শিক্ষক, ৩৬ ছাত্র এবং ২১ কর্মচারী ও অতিথি। ছয় ছাত্রকে পাকিস্তানি হায়েনারা কবর খোঁড়ার কাজে জোর করে লাগিয়েছিল। সেই ছয় ছাত্র দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়েই দীর্ঘদিনের পথচলা সঙ্গীদের কবর দিচ্ছিল। এরপরও তারা বাঁচতে পারেনি। তাদেরও গুলি করে হত্যা করেছিল হায়েনার দল। এদিকে ২৬ মার্চ ভোরেই পরিস্থিতি বুঝতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা জরিপ করতে বেরিয়েছিলেন মেজর সিদ্দিক সালিম। তার বইয়ে ঐ সকালের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবে, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গণকবরগুলো জরিপ করছিলাম। সেখানে আমি তিনটি ঢিবি দেখতে পাই, যার প্রতিটি ৩ থেকে ১৫ মিটার ডায়ামিটারের ছিল। সেগুলো নতুন মাটিতে ভরাট করা। কিন্তু কোনো অফিসার মৃতের প্রকৃত সংখ্যা জানাতে রাজি ছিল না। আমি দালানগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম, বিশেষত ইকবাল ও জগন্নাথ হলের, যেগুলো আমার মনে হলো, অ্যাকশনের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে’।
তবে ঢাবিতে সবচেয়ে বেশি নৃশংসতা ঘটেছে জগন্নাথ হলে। রশীদ হায়দার সম্পাদিত ‘১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা’ বইটিতে নূরুল উলা লিখেছেন, ‘রাতে দেখি জগন্নাথ হল ছাত্রাবাসের চারপাশ পাক বাহিনীতে ছেয়ে গেছে। হলের কক্ষগুলোতে আগুন। কক্ষগুলোতে ঢুকে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সকালে উঠে দেখি মাঠের পশ্চিম দিকে লাশ এনে জড়ো করা হচ্ছে। আহতদের গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হচ্ছে। এভাবে কয়েকবার চলল।...আমি তাড়াতাড়ি ক্যামেরা সেট করে একটা কালো কাগজে ফুটো করে ক্যামেরার লেন্সটা জানালার কাচের ওপর রাখলাম। এরপরের তিনটা গণহত্যা ধারণ করলাম। বুলডোজার দিয়ে মাটি খুঁড়তেও দেখলাম।’

জগন্নাথ হলে সেদিন যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ৬৬ জনের পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের নামের তালিকা উৎকীর্ণ আছে হলের মাঠে গণকবরের জায়গায় তৈরি একটি নামফলকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক রতনলাল চক্রবর্তীর সম্পাদনায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা: ১৯৭১’ বইতে বলা হয়েছে, ঐ রাতে সেখানে গণহত্যার শিকার হন চারজন শিক্ষক, ৩৬ জন ছাত্র এবং ২১ জন কর্মচারী ও অতিথি। এছাড়া মেয়েদের আবাসিক হল রোকেয়া হলেও আক্রমণ হয়েছিল।
তবে বইয়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ মার্চ নিয়ে বর্বরতার নানা বর্ণনা মিললেও ঢাবির শতবর্ষ (১৯২১-২০২১) উদযাপনে প্রকাশিত ‘যান্ত্রিক’ নামক চার শতাধিক পৃষ্ঠার স্মরণিকায়। শুরুতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইয়ের রেফারেন্স টেনে একাত্তরের ২৫ মার্চের কাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি বিস্তারে তুলে ধরেছেন প্রয়াত অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম তার ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক লেখাতে।
এদিকে ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘বার্ষিক প্রতিবেদন ১৯৭০-৭১’-এ ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক কে এম এ মুনিম লিখেন, পাক হানাদার বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু বা নিশানা বানিয়েছিল। কারণ এটি ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। তাই চিরদিনের জন্য নিশ্চিহ্ন করে দিতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অনুমান করা হয়, ইকবাল হলেই প্রায় ২০০ ছাত্র নিহত হয়।
একে কয়েক যুগ কেটে গিয়ে নৃশংসতার, এখনো সেই ভয়াবহতায় আঁতকে ওঠে বর্তমান শিক্ষার্থীরা। ক্যালেন্ডারের পাতায় ৫৩টি বছর একেকটি বছর পেরিয়ে গেলেও সেই নৃশংসতার যেন চাপা আতঙ্ক আজও ঢাবির বাতাসে ছড়িয়ে রয়েছে। যদিও চাপা আতঙ্কের মধ্যেই এখন রয়েছে স্বাধীনতার হাওয়া। ফলে স্বাধীনতার দমকা হওয়ায় মিলিয়ে যায় আতঙ্কের ভয়াবহতা। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পরাধীন বাঙালি খুঁজে পায় মুক্তির নিশানা; বিশ্বমানচিত্রে স্থান পায় ‘বাংলাদেশ’।