ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

যে কারণে যতীন পেয়েছিলেন ‘বাঘা’ উপাধি

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫:২২, ৭ ডিসেম্বর ২০২১
যে কারণে যতীন পেয়েছিলেন ‘বাঘা’ উপাধি
বাঙালি বিপ্লবী নেতা বাঘা যতীন। ছবি : সংগৃহীত

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী তিনি। একজন বাঙালি বিপ্লবী নেতা হিসেবে তার সুখ্যাতি ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী। তিনি বাঘা যতীন নামেই সবার কাছে সমধিক পরিচিত। সাহসী এই নেতার জন্মদিন আজ। ১৮৭৯ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

স্বামী বিবেকানন্দ পরাধীনতার শিকল ছিঁড়তে বাঙালিদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ভেবেছিলেন হয়তো বাঙালি যখন পাল্টা আঘাত করতে শিখবে তখনই কেবল মুক্তি সম্ভব। আঘাতের বিরুদ্ধে আঘাতের কোনো বিকল্প নেই বলেই মনে করতেন স্বামীজি। অনেকেই স্বামীজির চিন্তা এবং বাণী গ্রহণ করেছেন স্বাদরে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিপ্লবী বাঘা যতীন।  তার আসল নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি ভারতে ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯০০ সালের দিকের ঘটনা। নদীয়া জেলার কুষ্টিয়ার এক গ্রামে হঠাৎ এক বাঘের আবির্ভাব ঘটল। বাঘের যন্ত্রণায় যখন মানুষজন অস্থির তখন যতীনের মামাতো ভাই ফণিবাবু বাঘটিকে মারার সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনাক্রমে যতীন তখন তার মামার বাড়িতেই। সবার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সামান্য এক ভোজালি (ছোট চাকুর মতো একটি অস্ত্র) নিয়ে ফণিবাবুর সঙ্গে বাঘ মারা দেখতে গেলেন। সমগ্র গ্রাম তন্ন তন্ন করে খোঁজার পরও বাঘটিকে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সবাই জঙ্গলের পাশের মাঠে বাঘ শিকারের প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।

Advertisement

ফণিবাবুর বন্দুক তাক করা ছিল জঙ্গলের দিকে। বাঘ বোধহয় বন্দুকটি দেখতে পেয়েছিল, তাই বন্দুকের দিক দিয়ে বের না হয়ে যতীনের পেছন দিয়ে বের হল। বাঘ দেখামাত্রই গ্রামবাসী ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। ফণিবাবু সতর্কভাবেই বাঘের দিকে গুলি ছোঁড়েন। দুর্ভাগ্যবশত গুলিটি বাঘের মাথা ঘেঁষে চলে যায়। এতে বাঘটি আরো উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ফনিবাবুর সর্বনিকটে অবস্থানরত যতীনকেই আক্রমণ করে বসে ওই বাঘটি। যতীনও দমবার পাত্র নয়। সামান্য ভোজালি দিয়ে সেও বাঘটিকে আঘাত করতে থাকে।

উভয়ের মধ্যে মিনিট দশেক ধরে ধ্বস্তাধস্তি চলতে থাকে। চলে মরণপণ যুদ্ধ। বাঘের আঁচড়ে যতীনের সমগ্র শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যতীনের পা। যতীনও ভোজালি দিয়ে ক্রমাগত বাঘের মাথায় আঘাত করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত বাঘটিই পরাজিত হয়।
প্রায় ৩০০ স্থানে জখম হয় যতীনের। মামারা তাকে সুস্থ করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা চালান। তৎকালীন কলকাতার সেরা ডাক্তার সুরেশপ্রসাদ তার চিকিৎসার ভার গ্রহণ করলেও অবস্থার তেমন উন্নতি হয় না।  ধীরে ধীরে একটু উন্নতি হলেও দুটি পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা কেটে ফেলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তবে মামাদের অসামান্য সেবা-যত্নের বদৌলতে এক সময় সম্পূর্ণ সুস্থ হন যতীন। আর তার বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে সুরেশপ্রসাদ তার নাম দেন ‘বাঘা’ যতীন।

বাঙালি বিপ্লবী নেতা বাঘা যতীন। ছবি : সংগৃহীত

এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাস করার পর তিনি সাঁটলিপি ও টাইপ শেখেন এবং পরবর্তী সময়ে বেঙ্গল গভর্নমেন্টের স্টেনোগ্রাফার নিযুক্ত হন। যতীন ছিলেন শক্ত-সমর্থ ও নির্ভীকচিত্ত এক যুবক। অচিরেই তিনি একজন আন্তরিক, সৎ, অনুগত এবং পরিশ্রমী কর্মচারী হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন।  তার মধ্যে আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবোধ অত্যন্ত দৃঢ় ছিল। অরবিন্দ ঘোষের সংস্পর্শে এসে যতীন শরীর গঠন আখড়ায় গাছে চড়া, সাঁতার কাটা ও বন্দুক চালানোর প্রশিক্ষণ নেন।

বাঘা যতীন ছিলেন বাংলার প্রধান বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর দলের প্রধান নেতা। যুগান্তর দলে কাজ করার সময় নরেনের (মানবেন্দ্র নাথ রায়) সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং অচিরেই তারা একে অপরের আস্থাভাজন হন।

১৯০৮ সালে যতীনসহ কয়েকজন বিপ্লবীকে আলীপুর ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত করা হয়। এ মামলার বিচারে বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে যাবজ্জীবন নির্বাসন, অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে জেল এবং অনুশীলন সমিতিকে বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে যতীন এবং নরেনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তারা উভয়েই হাওড়া-শিবপুর এলাকায় আত্মগোপন করেন এবং অন্যান্য বিপ্লবীর সঙ্গে গুপ্তভাবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান।

যতীনকে পুনরায় হাওড়া-শিবপুর ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হয় এবং তার সঙ্গে অন্যান্য যারা গ্রেফতার হন তাদের ‘যতীন গ্যাং’ নামে অভিহিত করা হয়। অত্যাচারের শিকার হয়ে তাদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হয় এবং অপর কয়েকজন পাগল হয়ে যান। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে যতীন এ মামলা থেকে মুক্তি পেলেও তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

জেলে থাকা অবস্থায় যতীন এবং নরেন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেন। তারা দেশপ্রেমিক বিভিন্ন দলকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিকল্পনা করেন এবং এ উদ্দেশ্যে নরেন সন্ন্যাসিরূপে ব্যাপকভাবে সমস্ত ভারত ভ্রমণ করে বাংলাসহ বিভিন্ন এলাকার বিপ্লবীদের সংগঠিত করেন। বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ হুগলি এবং মেদিনীপুরের বন্যার ত্রাণকার্য উপলক্ষে একত্রিত হন। তারা যতীন মুখোপাধ্যায় এবং রাসবিহারী বসুকে যথাক্রমে বাংলা এবং উত্তর ভারতের নেতা মনোনীত করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপে অবস্থানরত ভারতীয় বিপ্লবীরা ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টি গঠনের উদ্দেশ্যে বার্লিনে সমবেত হন এবং তারা এতে জার্মানির সাহায্য কামনা করলে জার্মান সরকার সম্মত হয়। কলকাতাস্থ জার্মান কনসাল জেনারেলের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টি যতীন মুখোপাধ্যায়ের নিকট একজন দূত পাঠান। ইতোমধ্যে যতীনকে বিপ্লবী দলসমূহের কমান্ডার-ইন-চিফ করা হয়। যতীনকে বালেশ্বরে (উড়িষ্যা) গুপ্ত অবস্থায় রেখে নরেন বাটাভিয়া যান এবং সেখানে জার্মান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জাহাজে অস্ত্র প্রেরণ ও অর্থনৈতিক সাহায্য বিষয়ে আলোচনা করেন।

অবশ্য পুলিশ ধানক্ষেতে যতীনের গুপ্ত আশ্রয়ের সন্ধান পায়। ১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক গুলি বিনিময়ের পর দুজন বিপ্লবী আত্মসমর্পণ করেন। পুলিশ আহত অন্য দুজনের সঙ্গে যতীনের মৃতদেহ উদ্ধার করে। আহত দুজনের একজন ছিলেন মাদারিপুরের চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, যার কিছুক্ষণ পরেই মৃত্যু হয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!