কচুরিপানা থেকে পরিবেশবান্ধব শিল্প
আপনি নিশ্চয়ই কচুরিপানা দেখেছেন। কচুরিপানা থেকে যে পাপস, পাটি, ফুলদানি, মাদুর বানানো যায় - এই বিষয়ে কি আপনি জানতেন? হ্যাঁ, এক সময়ে অবহেলিত কচুরিপানা থেকে এখন পাবনায় তৈরী হচ্ছে হস্তশিল্পের নজরকাড়া ও পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন রকম পণ্য। সাশ্রয়ী দামে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে দেশ-বিদেশে।
বাংলাদেশের রাজবাড়ী, পাবনা, বরিশাল, যশোর, কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ বেশ কিছু জায়গায় কচুরিপানা নিয়ে হস্তশিল্পের কাজ শুরু হয়েছে। সঙ্গে বাড়ছে উদ্যোক্তার সংখ্যা। বাড়ছে কর্মসংস্থান। সমৃদ্ধ হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব গ্রামীণ অর্থনীতি। আসছে বৈদেশিক মুদ্রা।
কচুরিপানা থেকে উপহার সামগ্রী তৈরি করছে ‘প্রকৃতি’

বাংলাদেশের খালে-বিলে, পুকুরে, নদীতে প্রচুর কচুরিপানা দেখতে পাওয়া যায়৷ তবে বরিশালে গত প্রায় ২০ বছর ধরে কচুরিপানা থেকে প্রথমে কাগজ তৈরি করে পরে উপহার সামগ্রী সহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছেন নারীরা৷ ‘প্রকৃতি’ নামে একটি সংস্থার অধীনে কাজ করছেন মহিলারা৷ কচুরিপানার কাগজ দিয়ে তাঁরা ছবির অ্যালবাম, নোটবুক, গহনা, ঝুড়ি, গিফট বক্স, গ্রিটিংস কার্ড, মালা ইত্যাদি তৈরি করেন৷ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ সহ বিশ্বের প্রায় বিশটি দেশে এসব পণ্য রপ্তানি করা হচ্ছে বলে ডয়চে ভেলেকে জানান প্রকৃতির ডিজাইনার সুরাইয়া চৌধুরী৷
-
প্রকৃতি-র হয়ে যেসব নারী কাজ করেন তাঁরা মাসে গড়ে প্রায় ৬-৭ হাজার টাকা আয় করেন৷ এছাড়া বছর শেষে তাঁরা লাভের অংশও পেয়ে থাকেন৷
-
প্রকৃতি-র হয়ে বরিশালের কয়েকটি অঞ্চলের এক হাজারেরও বেশি নারী কাজ করছেন৷
- কচুরিপানা দিয়ে পণ্য তৈরি করায় বরিশাল অঞ্চলের জলাশয় এখন অনেকটা কচুরিপানামুক্ত রাখা যাচ্ছে৷ এর ফলে পোকামাকড়ের আবাস ধ্বংস করা সম্ভব হচ্ছে৷
মধুখালিতে পাট-হোগলাপাত-কচুরিপানার হস্তশিল্প এখন বিদেশে রফতানি হচ্ছে

ব্যাপক চাহিদা থাকায় এসব পণ্য বায়ারদের মাধ্যমে রফতানি হচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। প্রতি মাসে ‘লাম ক্রিয়েশন’ কারখানা থেকে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকার পণ্য বিদেশে রফতানি হচ্ছে। সব মিলিয়ে গ্রামীণ অথনীতিতে ভালো প্রভাব পড়ছে এসব শিল্প গড়ে ওঠায়।
মধুখালিতে পাট-হোগলাপাত-কচুরিপানার হস্তশিল্প এখন বিদেশে রফতানি হচ্ছে। এসব বিক্রি করে এলাকার মিতু নামে একজন নারী উদ্যোক্তা স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানে এখন ৩০০ বেকার নারী তারা পেয়েছেন কর্ম করে বেঁচে থাকার জায়গা। ফেলে দেয়া আসবাবপত্র দিয়ে ফরিদপুর-মধুখালিতে পাট-হোগলাপাতা-কচুরিপানা দিয়ে তৈরি করা হস্তশিল্প রফতানি হচ্ছে বিদেশে।
উপজেলার ব্যাসদি গ্রামের নারী উদ্যোক্তা সাবেকুন্নাহার মিতু পরিচালিত ‘লাম ক্রিয়েশন’ নামের একটি হস্তশিল্প কারখানায় পাট, হোগলাপাতা, ছন ও কচুরিপানা দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন রকমের পরিবেশবান্ধব রফতানিকারক পণ্য। এসব পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করা হচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। উদ্যোক্তা মিতু সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তা সম্মাননা পেয়েছেন।
জানা যায়, ২০২০ সালে ফরিদপুর শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার অদূরে মধুখালী উপজেলার কামালদিয়া ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের নারী উদ্যোক্তা সাবেকুন্নাহার মিতু পড়ালেখা শেষ করে বেকার জীবনযাপন করছিলেন। ২০২০ সালে চলছিল করোনা মহামারি। ছোট ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছিলেন। আর সেই সময় নিজে স্বাবলম্বী হতে এবং এলাকার বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান তৈরির চিন্তা থেকেই ‘লাম ক্রিয়েশন’ নামে একটি হস্তশিল্প কারখানা গড়ে তোলেন। নিজের গ্রাম শ্রীপুর সংলগ্ন ব্যসদী বাজারে নিজের কাছে জমানো কিছু টাকা ও স্বর্ণলঙ্কার বিক্রি করে ৫ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে ১২টি মেশিন কিনে ১৫ জন নারী শ্রমিক নিয়ে শুরু করেন হস্তশিল্পের কাজ তিনি। বর্তমানে নারী উদ্যোক্তা সাবেকুন্নাহার মিতুর দুইটি কারখানায় দুইশো শ্রমিক কাজ করছেন।
কচুরিপানা দিয়ে জুতার অনুষঙ্গ তৈরি করেছেন বুটেক্সের ৪ শিক্ষার্থী

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) শিক্ষার্থী অন্বয় দেবনাথ, অর্ণব হালদার, ফারদীন বিন মনির ও তাশফিক হোসাইন কচুরিপানা দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে জুতার ইনসোল (ভেতরের সোল) ও বাইরের সোল তৈরি করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মার্জিয়া দুলালের তত্ত্বাবধানে কচুরিপানা ও ফেলে দেওয়া ডেনিমের সমন্বয়ে পরিবেশবান্ধব এসব অনুষঙ্গ তৈরি করেছেন তাঁরা। বুটেক্সের এই শিক্ষার্থীরা ল্যাব কোর্সের অংশ হিসেবে প্রথমে গন্ধহীন মোজা তৈরির কাজ হাতে নেন। শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ করে কচুরিপানা দিয়ে জুতার অনুষঙ্গ তৈরি করার কাজ শুরু করেন। এরপর দীর্ঘ গবেষণা শেষে জুতার ইনসোল ও বাইরের সোল কচুরিপানা থেকে তৈরির পাশাপাশি ফেলে দেওয়া ডেনিম কাজে লাগিয়ে জুতার ওপরের বহিরাবরণ তৈরি করেন তাঁরা।
ইকো-স্টেপের ইনসোল ও সাজসজ্জায় ব্যবহৃত হয়েছে কচুরিপানা। ভেজা কচুরিপানার কাণ্ড শুকিয়ে হাতে ব্রেইডিং করে লম্বা স্ট্র্যান্ড তৈরি করা হয়। এই স্ট্র্যান্ড পেঁচিয়ে সেলাইয়ের মাধ্যমে ইনসোলের আকৃতি দেওয়া হয়। এই ব্রেইডেড স্ট্র্যান্ড জুতার চারপাশে ডেকোরেটিভ লেইস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে, যা জুতায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও হস্তশিল্পের ছোঁয়া যোগ করেছে। জুতার বাইরের আবরণ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে পুনর্ব্যবহৃত ডেনিম কাপড়।
ঢাকার বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলসের (বুটেক্স) চার তরুণ শিক্ষার্থী এক অভূতপূর্ব উদ্ভাবনের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণের পথে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কচুরিপানা ও পুনর্ব্যবহৃত জিনসের সমন্বয়ে তৈরি তাদের পরিবেশবান্ধব জুতা ‘ইকো-স্টেপ’ শুধু টেকসই নয়, আরামদায়ক এবং সাশ্রয়ীও। গত মঙ্গলবার বুটেক্সের প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ল্যাবে এই জুতা প্রকাশ্যে আনার পর তা ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বুটেক্সের এই উদ্ভাবন পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের মতে, স্থানীয় সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় কচুরিপানা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আয়ের পথ তৈরি করতে পারে। বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে ‘ইকো-স্টেপ’দেশের টেক্সটাইল শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

যশোরের ঝিকরগাছার গঙ্গানন্দপুর গ্রামের তরুণ আব্দুল্লাহ আল সাঈদ। তিনি এ নিয়ে কাজ করছেন ২০১২ সাল থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ওই বছরই কচুরিপানা নিয়ে কাজ করার চিন্তা শুরু করেন তিনি। গ্রামে ফিরে জানান দেন, ‘এই কচুরিপানা একসময় টাকা দিয়ে কিনতে হবে।’ বিষয়টিকে গ্রামের লোকজন বাতুলতা মনে করলেও সাঈদের ছিল আকুলতা। তিনি ২০১৮ সালে পল্লী উন্নয়ন ও প্রায়োগিক গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য জাতীয় পল্লী উন্নয়ন স্বর্ণপদক পান। ২০১৯ সালে এটুআই থেকে দেশসেরা তরুণ উদ্ভাবক নির্বাচিত হন।
কচুরিপানা থেকে তৈরি সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে– ঝুড়ি, ফুলের টব, ব্যাগ, ট্রে, পাপোশ, মোড়া, টুপি, স্যান্ডেল, দড়ি, টিস্যু বক্স, শোপিস, ন্যাপকিন ইত্যাদি। এ ছাড়া নানা ধরনের আসবাব তৈরি করা যায়। পর্যাপ্ত গবেষণার মাধ্যমে এর ফাইবার থেকে বায়োফুয়েল এমনকি কাপড় উৎপাদন করাও সম্ভব বলে জানান সাঈদ।
কচুরিপানা থেকে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির পাশাপাশি অনেক কর্মসংস্থান তৈরিতেও সহায়তা করে যাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তা জয়তুন"
কচুরিপানা এখন জোগান দিচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। কচুরিপানা থেকে তৈরি পণ্য রপ্তানি করে বছরে আসছে কোটি টাকা। পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ক্ষেতুপাড়া ইউনিয়নের নিভৃত গ্রাম রসুলপুরে তৈরি হচ্ছে নজরকাড়া এসব পণ্য। পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এসব পণ্যের চাহিদা বিদেশের বাজারেই বেশি। ইউরোপ ও আমেরিকার অন্তত আটটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে এসব পণ্য। যার মাধ্যমে বছরে আয় হয় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা।
পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলাস্থ বনগ্রাম বাজার রসুলগ্রামের মোছাঃ জয়তুন খাতুন আকর্ষণীয় এবং উদ্ভাবনী কাজ করে বর্তমানে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বেশ সুপরিচিত হয়ে উঠেছেন। ২০১৯ সাল থেকে তিনি তার এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি বিসিকের ঋণ সহায়তা কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হয়েছেন!
তিনি মূলত প্রথমে তার শ্বশুরের কাছ থেকে বেত দিয়ে নানা ধরণের আসবাবপত্র তৈরি করার দক্ষতা অর্জন করেন । এরপর তিনি বেত ও কচুরিপানা দিয়ে বেশ কিছু সৌখিন জিনিসপত্র তৈরি করতে থাকেন। বর্তমানে তিনি আসবাবপত্র তৈরি করার সাথে এই ঘরের সাজসজ্জার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে থাকেন।
প্রথমে তিনি স্থানীয় ৩৫ জন নারী ও পুরুষ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে বর্তমানে তার কেবল নারী কর্মীই রয়েছে প্রায় দেড়শর মতো!
এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত কর্মীরা দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং মাসিক - এই তিন উপায়ে কাজ করে থাকেন। তাদের বেতন দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা হয়ে থাকে। তার স্থানীয় বাজার থেকে কেনা কচুরিপানার দাম মণপ্রতি কাচার ক্ষেত্রে ৪০-৪৫ টাকা এবং শুকনোর ক্ষেত্রে ২০০-২৫০টাকা হয়ে থাকে।
প্রতি কেজি শুকনো কচুরিপানার দাম পড়ে ৫০ টাকা। আকার-আকৃতি ও মানভেদে তৈরীকৃত পণ্যের দাম ১০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ভালো পরিচর্যা ও যত্নসহকারে ব্যবহার করলে এসব পণ্য ১০ বছর পর্যন্ত টেকসই হতে পারে। পচনশীল হওয়ায় কচুরিপানা থেকে উৎপাদিত পণ্য পরিবেশবান্ধব। এ ছাড়া কচুরিপানায় তৈরি পণ্য মৃদু সুবাসও ছড়ায়।
কচুরিপানা থেকে পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক!
কচুরিপানা থেকে তৈরি করে ফেলেছেন পরিবেশবান্ধব পলিথিন/প্লাস্টিক ব্যাগ। এই ব্যাগে মাছ-মাংস থেকে শুরু করে সবকিছু যেমন বহন করা যাবে, তেমনি বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী মোড়কজাতও করা যাবে। মাটিতে ফেলে দিলে ছয় মাসে পচে সারে পরিণত হবে। এতে দূষণের পরিবর্তে উর্বর হবে মাটি। নিয়ন্ত্রণ করা যাবে জলজ জীবনের হুমকি কচুরিপানা। তবে তহবিল সংকটে এখন পর্যন্ত তারা বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য গবেষণাটিকে পরবর্তী ধাপে নিতে পারেননি।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. নিয়াজ আল হাসান ও মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) বায়োমেডিকেল প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক উশামা শাফোয়াতের তত্ত্বাবধানে গবেষণাটি করেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ও মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ নিশান, কৃষি বিভাগের শিক্ষার্থী খাদেমুল সেকত ও অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী বিপ্রদেব মজুমদার।