ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

[ স্বাস্থ্যকথা ]

ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ কেন বেশি

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৫৮, ৫ নভেম্বর ২০২৬
ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ কেন বেশি
দেশে ক্যানসার চিকিৎসার খরচ কমানোর সহজ কোনো উপায় নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ নিলে ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব হতে পারে।

ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসার খরচ কীভাবে বেড়ে যায়? এই প্রশ্ন অনেকের মনে আসে। মনে রাখতে হবে, ক্যান্সার শুধু একটি রোগ নয়, অনেক পরিবারের জন্য এটি একটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ।

প্রথমত, ক্যান্সার নির্ণয় নিজেই ব্যয়বহুল। বায়োপসি, প্যাথলজি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, পিইটি স্ক্যান, রক্ত পরীক্ষা, হরমোন রিসেপ্টর বা মলিকিউলার টেস্ট-এসবের প্রতিটি ধাপ রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য জরুরি। কিন্তু একজন সাধারণ রোগীর জন্য এই পরীক্ষাগুলোর খরচ অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসায় সাধারণভাবে তিনটি চিকিৎসা পন্থা অবলম্বন করা হয়: অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি। ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা গবেষকদের বলেছেন, সব সরকারি হাসপাতালে একবার রেডিওথেরাপির জন্য ২৫ হাজার, একবার কেমোথেরাপির জন্য ২০ হাজার এবং অস্ত্রোপচারে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ৫০ শতাংশ ক্যানসার রোগীর অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি—এই তিনটি পদ্ধতিরই দরকার হয়। ২০ শতাংশের দুটি পদ্ধতির দরকার হয়। বাকি ৩০ শতাংশের দরকার হয় অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির যেকোনো একটি পদ্ধতির। তবে এসব চিকিৎসা যদি বেসরকারি হাসপাতালে হয়, তা হলে খরচ আরও অনেক বেশি।

ক্যান্সার কেবল একটি সাধারণ রোগ নয়। অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সার্জারি (অস্ত্রোপচার), রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোনাল থেরাপি কিংবা টার্গেটেড থেরাপির মতো একাধিক পদ্ধতির প্রয়োজন পড়তে পারে।

অনেকেই মনে করেন, ক্যান্সারের চিকিৎসার খরচ বলতে শুধু কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি বা অপারেশনের খরচকেই বোঝায়। বাস্তবে চিকিৎসার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ বাড়তে থাকে।

আধুনিক চিকিৎসা যেমন— টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy) এবং ইমিউনোথেরাপির (Immunotherapy) কিছু ওষুধের দাম অত্যন্ত বেশি। রোগের ধরন ও জিনগত পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে এসব ওষুধ দীর্ঘসময় চালিয়ে নিতে হয়।

বিশেষ করে ঢাকার বাইরে বা মফস্বল থেকে রোগীদের নিয়মিত বড় হাসপাতালে যাতায়াত করতে হয়। দীর্ঘদিন ঢাকায় অবস্থান করা, থাকা এবং রোগীর বিশেষ খাদ্যাভ্যাস ও পথ্যের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়।

সরকারি হাসপাতালে খরচ কিছুটা কম হলেও, আসন সংকট ও সুযোগের অভাবের কারণে অনেক সময় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হতে হয়, যেখানে সেবার খরচ বহুগুণ বেশি।

চিকিৎসক দেখানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, ওষুধ—প্রতিটি ক্ষেত্রে অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হয়। মধ্যবিত্তরাই এই খরচ চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। দরিদ্ররা খরচের ভয়ে এই চিকিৎসা নেওয়া থেকে দূরে থাকে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত একজন রোগীর চিকিৎসায় গড়ে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮৪০ টাকা খরচ হয়। এই খরচ সর্বনিম্ন ৮১ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় ওষুধপত্রের জন্য। ক্যানসারের প্রথম স্তরে গড়ে চিকিৎসা খরচ প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা।

দ্বিতীয় স্তরে এই খরচ বেড়ে প্রায় ৭ লাখ টাকায় পৌঁছায়। এই ব্যয় মেটাতে প্রায় ৭৮ শতাংশ পরিবারকে ঋণ করতে হয়। ৬৫ শতাংশ পরিবার নিয়মিত আয় থেকে খরচ বহন করে। ৫৬ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় ভাঙে। ৪০ শতাংশ পরিবার সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়।

ক্যান্সার চিকিৎসায় আরেকটি নির্মম বাস্তবতা হলো, অনেক পরিবার চিকিৎসা শুরুর আগেই নিঃস্ব হয়ে যায়। রোগ নির্ণয়ের নামে একের পর এক পরীক্ষা, স্ক্যান, বায়োপসি, রিপোর্ট যাচাই, শহরে যাতায়াত ও থাকার খরচ-এসব মিলিয়ে রোগী যখন অবশেষে চিকিৎসকের টেবিলে চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য বসেন, তখন তার পরিবারের হাতে আর চিকিৎসার অর্থ থাকে না। অথচ রোগ নির্ণয়ের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত চিকিৎসার পথ খুলে দেওয়া, চিকিৎসার আগেই রোগীকে অর্থহীন করে ফেলা নয়। 

বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার শনাক্ত হয় রোগের তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে। যে কারণে রোগীদের সুস্থ হওয়ার হারও কম হয়। অন্য ক্যানসারগুলোর ক্ষেত্রেও শনাক্ত হওয়ার পর্যায় একই রকম হয়ে থাকে। খুব কম ক্ষেত্রেই একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত হয়। এর বড় কারণ অসচেতনতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানোর প্রবণতা। 

১. দেরিতে রোগ নির্ণয়
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত না হলে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা জটিল, দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

২. রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা
Biopsy, Histopathology, IHC, CT Scan, MRI, PET-CT ও Molecular testing-এর খরচ যুক্ত হয়।

৩. দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা
একাধিক Chemotherapy cycle, Radiotherapy, Surgery, Hormonal therapy বা Targeted therapy প্রয়োজন হতে পারে।

৪. ব্যয়বহুল ওষুধ
বিশেষ করে Targeted therapy ও Immunotherapy-এর কিছু ওষুধের মূল্য অনেক বেশি।

৫. চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
Infection, Neutropenia, Anemia, বমি, অপুষ্টি বা অন্যান্য জটিলতার চিকিৎসায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হতে পারে।

৬. বারবার হাসপাতালে যাতায়াত
দূরবর্তী স্থান থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের যাতায়াত, থাকা ও খাবারের খরচও অনেক বেড়ে যায়।

৭. পরিবারের আয় কমে যাওয়া
দীর্ঘদিন চিকিৎসার কারণে রোগী বা পরিবারের উপার্জন কমে যেতে পারে। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

৮. চিকিৎসার পরও দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ
Follow-up consultation, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের খরচ দীর্ঘদিন চলতে পারে।

 ক্যান্সারের চিকিৎসার খরচ কমাতে কী করা যায়?
- রোগের লক্ষণ অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
- সঠিক রোগ নির্ণয় ও Stage নির্ধারণ
- Evidence-based চিকিৎসা গ্রহণ
- অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ওষুধ এড়িয়ে চলা
- চিকিৎসকের সঙ্গে শুরুতেই সম্ভাব্য খরচ নিয়ে আলোচনা
- সরকারি ও স্বল্পমূল্যের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া

মনে রাখবেন:
ক্যান্সারের চিকিৎসায় সবচেয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসাই সবসময় সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা নয়।

রোগের ধরন, Stage, Biomarker, রোগীর শারীরিক অবস্থা ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে সঠিক চিকিৎসা নির্বাচন করাই গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং পরিকল্পিত চিকিৎসা রোগীর চিকিৎসার ফলাফল উন্নত করতে ও অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

দেশে ক্যানসার চিকিৎসার খরচ কমানোর সহজ কোনো উপায় নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ নিলে ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব হতে পারে।

গবেষকেরা ক্যানসার চিকিৎসাকে বিমা ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রস্তাব করেছেন। তাঁরা বিভিন্ন উৎস থেকে টাকা কীভাবে আসবে, তারও উদাহরণ দিয়েছেন।


লেখক : ডাঃ মোঃ তৌছিফুর রহমান
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ), এমডি (অনকোলজি), মেডিকেল ও রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, টিএমএসএস ক্যান্সার সেন্টার, বগুড়া

চেম্বার ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট

চেম্বার–১ | ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টার, কানছগাড়ী, শেরপুর রোড, বগুড়া
সিরিয়ালের জন্য: ০১৭০১৫৬০০১২, ডাক্তার সহকারী: ০১৯৭২১৩০৩৭৪

চেম্বার–২ | সনো কনসালটেশন সেন্টার (সনো টাওয়ার–২)
কলেজ মোড়, কোর্টপাড়া, কুষ্টিয়া, সিরিয়ালের জন্য: ০১৭৭০৯৯৭৩৫২, ডাক্তার সহকারী: ০১৯৭২-১৩০৩৭৩

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!