ঢাকা,  শনিবার   ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

[ স্বাস্থ্যকথা ]

ক্যানসার প্রতিরোধ করা কি সম্ভব?

জীবনযাত্রা পরিবর্তনে ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব
ডাঃ তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী
প্রকাশিত: ১১:২৬, ৭ নভেম্বর ২০২৬
ক্যানসার প্রতিরোধ করা কি সম্ভব?
প্রাথমিক অবস্থায় সচেতন হলে এবং এই পুষ্টিকর খাবারগুলো নিয়মিত ডায়েটে রাখলে জীবন জয় করা সম্ভব। নিজের ও প্রিয়জনদের সুরক্ষায় আজই প্লেটে আনুন পরিবর্তনের ছোঁয়া!

খবরটা শুনে প্রথমে হয়তো বিশ্বাস হতে চায় না! কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, সঠিক জীবনযাপন আর কিছু জাদুকরী খাবার প্লেটে রাখলেই মরণব্যাধি ক্যানসারের মতো ঝুঁকি অনেকটাই দূরে রাখা সম্ভব। সমস্যা হওয়ার পর লড়াই করার চেয়ে, আগে থেকেই শরীরকে দুর্ভেদ্য করে তোলা কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় প্রতি পাঁচ জনে এক জন ক্যান্সারে আক্রান্ত। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে নতুন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৩ কোটিতে পৌঁছতে পারে, যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের প্রকোপ যেমন সবচেয়ে বেশি, তেমনই পুরুষরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ওরাল ক্যান্সারে। এক সময়, বিজ্ঞানীদের কাছে স্পষ্ট ছিল না ক্যান্সারের কারণ। কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ চিকিৎসকই মনে করেন, ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের পিছনেও দায়ী লাইফস্টাইল। জিনগত ও পরিবেশ সংক্রান্ত কারণ ছাড়াও অনিয়ন্ত্রিত লাইফস্টাইল ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

ক্যান্সার যে কোনো বয়সেই হতে পারে। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন আর ক্যান্সার মানেই অবধারিত মৃত্যু নয়। একটু সচেতন হলেই ক্যান্সারকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। যদি ক্যান্সার হয়েও যায় তবুও শুরুতেই দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে তার ভালো চিকিৎসা করা যায়, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভও সম্ভব। 

অ্যামেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির নতুন এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, অ্যামেরিকায় ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে ক্যান্সার সৃষ্টির ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমে ক্যান্সারে মৃত্যু প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে ৭০০ হাজারের বেশি নতুন রোগী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬২ হাজারেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

খাবারের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমরা প্রতিদিন খাই এবং বছরের পর বছর ধরে খাই। ফলে কোনো খাবারের সঙ্গে যদি দীর্ঘমেয়াদি ক্যানসার ঝুঁকির সম্পর্ক থাকে, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা উচিত। কেননা ক্যানসার ফিরে আসার পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই একই খাদ্যাভ্যাস দায়ী থাকে।

ক্যান্সার এমন একটি রোগ যেখানে আপনার শরীর প্রতিদিন লড়াই করে আপনার দেহের কোষ বিভাজিত হওয়ার সময়। আপনি প্রতিদিন এই ঝুঁকির সম্মুখীন হন। তাই এই ঝুঁকি কমাতে পারলে আপনি প্রতিদিন উপকৃত হবেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যামেরিকায় ক্যান্সারের প্রারম্ভিক হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরি করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী জীবনে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে একটি গভীর পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

ক্যানসার কোনো একক কারণের রোগ নয়। বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, ধূমপান, অ্যালকোহল, শরীরের অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, সংক্রমণ, পরিবেশ এবং খাদ্যাভ্যাস—সব মিলিয়ে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়।

চলুন, আজই জেনে নেওয়া যাক এমন কিছু খাবারের কথা, যা আমাদের প্রাকৃতিকভাবেই সুরক্ষা দেয়।

১. সবুজ শাক লতাপাতার ভেল্কি:
পালং শাক  কিংবা দেশীয় সবুজ শাক-পাতায় ভরপুর আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও বিশেষ কিছু এনজাইম। এগুলো শরীরে টিউমার তৈরি হতে বাধা দেয় এবং ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে দারুণ কার্যকরী। তাই রোজকার পাতে একটুখানি সবুজ শাক রাখা মানেই শরীরের ভেতর একটা শক্তিশালী বর্ম তৈরি করা।

২. রান্নাঘরের জাদুকরী মশলা: হলুদ:
আমাদের পরিচিত হলুদ কেবল রান্নার রঙই বাড়ায় না, এর ভেতরে থাকা 'কারকিউমিন' নামক উপাদানটি ভেতর থেকে শরীরকে ক্যানসার প্রতিরোধী করে তোলে। কাঁচা হলুদ চিবিয়ে খাওয়া বা তরকারিতে নিয়মিত ব্যবহার—আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

৩. টক দই ও স্বাস্থ্যকর দুগ্ধজাত খাবার:
টক দইয়ের মতো প্রোবায়োটিক খাবার আমাদের অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে। এছাড়া দুধে থাকা ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি কোলন এবং ব্রেস্ট ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকদের কাছেও বেশ প্রশংসিত।

৪. সামুদ্রিক বা তৈলাক্ত মাছ:
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন? তৈলাক্ত মাছে ভরপুর এই উপাদানটি শুধু হার্ট ভালো রাখে না, এটি দারুণ এক অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং ক্যানসাররোধী উপাদান হিসেবেও কাজ করে। এমনকি কেমোথেরাপির ধকল সামলাতেও এটি বেশ উপকারী।

৫. এক কাপ গ্রিন টি-র যাদু:
ক্লান্তিমুক্তির পাশাপাশি এক কাপ গরম গ্রিন টি হতে পারে আপনার রক্ষাকবচ। এতে থাকা পলিফেনল ও ক্যাটেচিন ক্যানসারের কোষগুলোকে ছড়িয়ে পড়তে (মেটাস্ট্যাসিস) বাধা দেয়। অভ্যাসটা যদি আজ থেকেই শুরু করা যায়, তবে মন্দ কি?

৬. মাশরুম, বাদাম ও এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল:
সকালের নাস্তায় এক মুঠো চিনাবাদাম, সালাদে একটু এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল কিংবা পুষ্টিকর মাশরুম—এই ছোট্ট ছোট্ট অভ্যাসগুলোই আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। জলপাই তেলে থাকা ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস প্রদাহ কমিয়ে শরীরকে রাখে চনমনে।

মনে রাখবেন:
ক্যানসার মানেই শেষ নয়। প্রাথমিক অবস্থায় সচেতন হলে এবং এই পুষ্টিকর খাবারগুলো নিয়মিত ডায়েটে রাখলে জীবন জয় করা সম্ভব। নিজের ও প্রিয়জনদের সুরক্ষায় আজই প্লেটে আনুন পরিবর্তনের ছোঁয়া! 

লেখক : ডাঃ তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী 
সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!