গত মাসে হিজবুল্লাহ কমান্ডার ফুয়াদ হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল গোষ্ঠীটি। এরপর গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই এই অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। একদিকে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। অপরদিকে পাল্টা জবাব হিসেবে হিজবুল্লাহও দফায় দফায় রকেট ছুড়ছে। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, প্রায় ১০০টি যুদ্ধবিমান রোববার সকালে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে আগেভাগে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে। তারপর উত্তর ইসরায়েলে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে হিজবুল্লাহ। যদি ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সংখ্যাটি সঠিক হয় তাহলে ২০০৬ সালে দু’পক্ষের সর্বাত্মক যুদ্ধের পর এবারই তেল আবিবের তরফ থেকে লেবাননে সবচেয়ে বড় হামলা হলো।
.png)

স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ইসরায়েল এ হামলা করেছে। তাদের দাবি, আধা ঘণ্টা পর ভোর ৫টার দিকে হিজবুল্লাহ বড় আকারের হামলার পরিকল্পনা করেছিল।
হামলার বিষয়ে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ফুয়াদ শুকর হত্যার প্রতিশোধের প্রথম পর্ব শেষ করেছে তারা। তবে ইসরায়েলে এই হামলায় তুলনামূলক ‘সামান্য’ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উভয় পক্ষে হতাহতের ঘটনাও কম। ইসরায়েলের দাবি, তারা হিজবুল্লাহর একটি বড় হামলা সফলভাবে ঠেকিয়ে দিতে পেরেছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, গত অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যে পাল্টাপাল্টি হামলা করে আসছে, সেটি কি আরো নিয়মিত হয়ে উঠবে নাকি রোববারের ঘটনা আরো বিপজ্জনক কিছুর দিকে নিয়ে যাবে।
এরইমধ্যে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ নেতারা বলছেন, তারা আরেকটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চান না। তবে মুখে এমনটা বললেও যুদ্ধের জন্য দু’পক্ষই প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। এমনটা হলে হিজবুল্লাহকে ঠেকানো ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের জন্য মোটেই সহজ হবে না। কারণ, হামাসের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হিজবুল্লাহ। তাদের কাছে দেড় লাখের মতো রকেট আছে। সেই সঙ্গে তাদের কাছে সমগ্র ইসরায়েলে তাণ্ডব চালাতে পারে এমন অস্ত্রও আছে। তাছাড়া এই প্রতিরোধ যোদ্ধারা হামাসের চেয়ে ভালো প্রশিক্ষিত ও সজ্জিত। তাদের কেউ কেউ সিরিয়ার যুদ্ধে পর্যন্ত লড়েছে।
স্ট্র্যাটেজিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসেব অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর কাছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র আছে। তাদের এই অস্ত্রভাণ্ডারের বেশির ভাগই ছোট আকারের আনগাইডেড ভূমি-থেকে-ভূমি আর্টিলারি রকেট।
তবে হিজবুল্লাহর বিমান ও রণতরী-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র আছে বলেও ধারণা করা হয়। তাছাড়া তাদের বেশ কিছু ‘গাইডেড’ ক্ষেপণাস্ত্রও আছে যেগুলো ইসরায়েলের অনেক ভেতরে গিয়েও আঘাত হানতে সক্ষম।
গাজা ভূখণ্ডে হামাসের হাতে যে ধরনের অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে তার তুলনায় হিজবুল্লাহর এই অস্ত্রভাণ্ডার অনেক বেশি আধুনিক ও বিধ্বংসী।
প্রসঙ্গত, গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের সীমান্তে প্রবেশ করে আকস্মিক হামলা চালায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এরপরেই গাজায় পাল্টা আক্রমণ চালায় ইসরায়েল। সে সময় থেকেই হামাসের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দেখিয়ে ইসরায়েলে হামলা চালানো শুরু করে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ফলে সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তেও।

হিজবুল্লাহ অর্থ সৃষ্টিকর্তার দল। আশির দশকের শুরুর দিকে হিজবুল্লাহ গঠন করেছিল ইরানের রেভ্যুলশনারি গার্ডস। উদ্দেশ্য ছিল লেবাননে ইসলামিক আন্দোলনের প্রসার ও সেখানে হামলা করা ইসরায়েলিদের সঙ্গে লড়াই করা। মূলত শিয়া মুসলিমদের নিয়ে গঠিত হয় হিজবুল্লাহ।
হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে সবচেয়ে বড় আকারের যুদ্ধ করেছে ২০০৬ সালে। ইসরায়েলের সাথে ৩৪ দিনের ওই যুদ্ধে লেবাননের এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় যাদের বেশির ভাগই ছিল সাধারণ নাগরিক। বিপরীতে ইসরায়েলে মৃত্যু হয়েছিল ১৬৪ জনের যাদের বেশির ভাগই ছিল সেনা। এরপর থেকে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করে গেছে গোষ্ঠীটি।
২০১২ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সুন্নি বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় হিজবুল্লাহকে নিয়োগের পর থেকে তাদের সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম রয়টার্স। ইসরায়েলসহ বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশে হিজবুল্লাহকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।